২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাজ ভাবনা ॥ শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশা

  • আমাদের শিক্ষা-গুরুদক্ষিণা;###;প্রফেসর ড. আনন্দ কুমার সাহা

দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছেন। গত মে মাস থেকে শিক্ষকরা সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কোন ইতিবাচক সাড়া এখনও মেলেনি। শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পঠন-পাঠনের যাতে অসুবিধা না হয়, সে কারণে মানববন্ধন, সাংবাদিক সম্মেলন, শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, ইউজিসি-র চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মহোদয়দের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন- স্মারকলিপি বা আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষকদের কথা কে গুরুত্ব দেয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভ্যাটের বিষয়ে আন্দোলন করে ঢাকাকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল এবং সরকার ভ্যাট প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষকরা ছাত্রদের মতো এ ধরনের আচরণ করতে পারে না- তাই সরকার একটু সুযোগ নিচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন জননেত্রী শেখ হাসিনা জেলখানায় ছিলেন- তখন কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সদস্যরা এক দিনের নৈমিত্তিক ছুটি নিয়েছিলেন, এটা এক ধরনের প্রতিবাদ ছিল। ঢাকায় ২১ আগস্ট নির্মম ঘটনার বিরুদ্ধে প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষকবৃন্দ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছিল এবং আহত বন্ধুদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্য প্রদান করেছিল। গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে শিক্ষকদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। যদিও প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে শিক্ষকরা ভূমিকা রাখেন, কিন্তু ৮ম জাতীয় পে-স্কেলে সেই শিক্ষকদের যখন অবনমন করা হয় তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করি।

ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রত্যেকটি প্রফেশনে আছে। শিক্ষকরা সব কিছুর উর্ধে, তা বলা যাবে না বা ঠিকও নয়। বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, রিজার্ভ ফান্ড, মাথা পিছু আয় জিডিপি প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যথেষ্ট অর্জন। কিন্তু মানসিকতার উন্নয়ন ঘটেনি, বরং কিছুটা উল্টো। মুক্তিযুদ্ধের আগে এদেশের মানুষের মধ্যে যে উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল, ’৭৫-র পরে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কারণে মানুষের মধ্যে সে অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর পূর্বের ন্যায় পরিলক্ষিত হয় না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকবৃন্দ প্রতিটি ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে যেভাবে এগিয়ে এসেছেন, বিপদে বন্ধুর মতো ভূমিকা রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধেই সরকারের সচিব মহোদয়রা এত বৈরী আচরণ করতে পারলেন? জনাব ফরাসউদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠিত হয়েছিল, তাঁরা যে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল সরকারের কাছে জমা দিয়েছিল, কিন্তু সচিব কমিটি সেই পে-স্কেলে হস্তক্ষেপ করে শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করেছেন। একজন প্রভাবশালী সচিব উল্লেখ করেছিলেন যে, শিক্ষকরা কিভাবে সচিবদের সম-মর্যাদা পায়, আমরা তা দেখে নেব এবং তারা তা দেখে নিয়েছেন। সম্ভবত ২০০৫ সাল থেকে মুখ্য-সচিব ও ক্যাবিনেট সচিবদ্বয়ের কোন জাতীয় স্কেল নেই। উনারা জাতীয় স্কেলের বাইরে। সরকারী চাকরি করে জাতীয় স্কেলের উর্ধে থাকবেন এটা কেমন কথা ? সুযোগ-সুবিধা বেশি পেতে পারেন, এমনকি পাজেরো গাড়ির পরিবর্তে হেলিকপ্টার পেতে পারেন, কিন্তু জাতীয় স্কেলের মধ্যে থাকলে ভাল হতো। ৮ম জাতীয় পে-স্কেলে সিনিয়র সচিব বলে নতুন আরও একটি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। ৮ম জাতীয় পে-স্কেলে তাদের কোন গ্রেডে রাখা হয়নি- তারাও গ্রেডের বাইরে। তারা কি ১ থেকে ২০ গ্রেডে যারা আছেন, তাদের সঙ্গে থাকলে কি তারা অসম্মানিত বোধ করতেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর কারা হন? অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে একজনও সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর নেই। এমন কি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যরাও সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর নন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক প্রতিভাবান-শিক্ষকম-লী রয়েছেন, তাঁরা কি সিনিয়র সচিব মর্যাদায় যেতে পারেন না। সিনিয়র সচিব হওয়ার জন্য তেমন কোন নীতিমালা আছে কি ? যদি থেকেও থাকে, সব চাইতে বড় নীতিমালা হচ্ছে তিনি কি সেই সরকারের মতাদর্শে বিশ্বাস করেন কি-না ? কিন্তু সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ বছর শিক্ষকতার পেশায় থাকতে হবে, প্রফেসর হিসেবে কমপক্ষে ৫ বছর, সর্বশেষ বেতন স্কেলে এক বছর স্থিতাবস্থায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট অধ্যাপকের ২৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেই কেবল এই পদ পাওয়ার যোগ্য হন। অর্থমন্ত্রী একজন বিজ্ঞ মানুষ। কিভাবে বলতে পারলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়াই প্রমোশন পান! মন্ত্রী মহোদয় এক সময় সচিব ছিলেন- এখনও প্রায় বেশিরভাগ সময় সচিবদের সঙ্গে কাটাতে হয়- সেকারণে তাদের কথায় বেশি শুনতে পান। এটা শুধু মন্ত্রী মহোদয় এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক উপাচার্যের সচিব-অনেক প্রফেসরের চাইতে ক্ষমতাবান বা সেই রকমের অপ্রত্যাশিত আচরণ করে থাকেন। এটা মনে হয় পদের কারণে হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিটি প্রমোশনের ক্ষেত্রে নীতিমালা রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ নীতিমালার শর্তাবলী পূরণ না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ আবেদন করতে পারবেন না। সেখানে চাকরির বয়স, বিভিন্ন জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ এবং স্বপদে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সার্ভিস দেয়া এবং চ্যান্সেলর কর্তৃক মনোনীত বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ শিক্ষক, সিন্ডিকেট কর্তৃক মনোনীত শিক্ষকবৃন্দ নিয়ে ৭ সদস্যের শক্তিশালী বোর্ড ফেস করে তাঁকে সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পদে উন্নীত হতে হয়। কিন্তু ক্যাডার সার্ভিসে প্রমোশনের নীতিমালা তুলনামূলক সহজ। বিশ্ববিদ্যালগুলোতে প্রমোশনের ক্ষেত্রে কোন দলীয় প্রভাব তেমন নেই বললেই চলে।

জাতীয় পে-স্কেলে শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করার মধ্যে কি কোন রাজনীতি আছে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে, বিরোধী দলগুলো রাজপথে নেই, তখন কেন শিক্ষকদের রাজপথে নামতে বাধ্য করা হচ্ছে? ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ তাদের মর্যাদার লড়াইয়ে একাট্টা। এখানে কোন বিভেদ নেই। জরুরি ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী সমস্যার সমাধান করবেন- এটাই শিক্ষক সমাজের চাওয়া।

লেখক : সভাপতি- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি