২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল

  • ড. মো. হুমায়ুন কবীর

মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো করে এবার সরকার একসঙ্গে সকলের জন্য ৮ম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করেছেন। ইতোমধ্যে যা গত ১ জুলাই থেকে কার্যকরও করা হয়েছে। অন্য যেকোন সময়ে বেসরকারী শিক্ষকদের পে স্কেল একইসঙ্গে কার্যকর না করে আরও কিছুদিন পরে দেয়া হতো। কিন্তু সরকার শিক্ষকদের জীবনযাপন ও সার্বিক শিক্ষার স্বার্থের কথা চিন্তা করেই হয়তো এবারে একইসঙ্গে বেসরকারী শিক্ষকদের জন্যও পে স্কেল কার্যকর করেছেন। এতে সকলেই খুশি হওয়ার কথা এবং হয়েছিলও তাই। কিন্তু বিপত্তি হয়ে যায় প্রচলিত ধারার টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করার কারণে। এক্ষেত্রে চাকরিজীবীদের জন্য আর্থিক লাভের বিষয়টির চেয়ে মর্যাদা লাভের বিষয়টি সামনে চলে আসে। পে স্কেলভুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে যাঁদের সামনে উচ্চতর পদ-পদবী শূন্য থাকে না এবং কোন প্রমোশনের সুযোগ থাকে না, তাঁদের আর্থিক লাভ ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করেই এতদিন নীতিমালায় ও পে স্কেলে সিলেকশনগ্রেড ও টাইমস্কেল চালু ছিল। টাইম স্কেলের বেশিরভাগ সুবিধাই পেতো তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর সরকারী কর্মচারী ও বেসরকারী শিক্ষকবৃন্দ। অপরদিকে সিলেকশন গ্রেডের সুবিধা ছিল সকল পর্যায়ের চাকরিজীবীদের জন্যই। এখন চাকরিতে যে ব্যক্তি যেই পদে ও গ্রেডে রয়েছেন এবং যাঁদের পদোন্নতির কোন সুযোগ নেই, তাঁকে তাঁর বাকি চাকরিজীবনে অবসরে যাওয়া অবধি একই পদে ও গ্রেডে থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রতিবছরের জুলাই মাস থেকে তার মূলবেতনের সঙ্গে একটি নির্ধারিত পারসেন্টেজ যোগ হয়ে বেতন টাকার অঙ্কে বেড়ে যাবে ঠিকই কিন্তু তাঁর পদমর্যাদা কিংবা গ্রেডের কোন পরিবর্তন আর কখনোই হওয়ার সুযোগ থাকবে না। এটা খুবই অমানবিক এবং অনৈতিকও বটে। কারণ অনেকে বেশি বেতনের বেসরকারী চাকরি ছেড়ে দিয়ে কম বেতনের সরকারী চাকরিতে এসে যোগদান করে শুধুমাত্র মর্যাদা পেয়ে মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার জন্য। এবারে সিলেকশনগ্রেড ও টাইমস্কেল বাতিল করার কারণে এ ধরনের সব লোকই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অথচ দীর্ঘদিন চলে আসা ২০টি গ্রেডের অধীনে ৪টি শ্রেণীতে (১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ) যে যাঁর যাঁর যোগ্যতা ও মর্যাদা অনুযায়ী আত্মতুষ্টি নিয়েই সবাই সচলে-বিচলে তাঁদের চাকরি করে যাচ্ছিল। কারোর মধ্য থেকে কোন ধরনের আন্দোলন-সংগ্রাম, দাবি-দাওয়া কোন কিছুই ছিল না। হঠাৎ করে এবারের বেতন কমিশন সকল চাকরিজীবীদের মধ্যে অভিন্ন মান-মর্যাদা সৃষ্টির লক্ষ্যে সম্পূর্ণ আনকোরা একটি পদ্ধতি চালু করলেন। এটি করে কিন্তু কারও কোন লাভ হয়নি। সরকারেরও বাঁচেনি কোন অতিরিক্ত অর্থ। পাছে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ দেশের ২১ লক্ষ সরকারী এবং প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারী।

বিশ্লেষণ ও জনমতে দেখা গেছে, এখানে যদি অন্য সবকিছু হুবহু ঠিক রেখে শুধু পে স্কেলের সুপারিশ অনুযায়ী বাতিল করা টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিষয়টি পুনর্বহাল করে দেয়া হয়, তাহলেই আপতত সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলের ধারণা। আগের বছরের পে স্কেলে ছিল এমন কিছুর মধ্যে অন্য সবকিছু হুবহু ঠিক রেখে বর্তমান পদ্ধতিটি চালু রাখলেও এতে সরকারের কোন আর্থিক ক্ষতি হবে না বলেই অর্থনীতিবিদরা ধারণা দিচ্ছেন। তাহলে এবারের বাজেটের আগে এ বিষয়ে বেতন কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সকল মহল থেকেই দফায় দফায় বিভিন্ন ফোরামের মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে ডেলিগেশন দিয়ে এর সুফল-কুফল সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কেন যেন এ বিষয়ে কর্ণপাত করা হয়নি এক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর যুক্তি ছিল যে তিনি বর্তমান বেতন কাঠামোয় প্রচলিত গ্রেড পদ্ধতি সুপারিশকৃত ২০টি ধাপের পরিবর্তে ১৬টি ধাপে নামিয়ে এনে তিনি চাকরিজীবীদের মধ্যে শ্রেণীবৈষম্য দূর করতে চান। কিন্তু বাস্তবে তা কীভাবে সম্ভব তার কিন্তু কোন গ্রহণযোগ্য দিক নির্দেশনা মেলেনি। এটি আসলে কোনদিনও সম্ভব নয়। চাকরিতে যে যাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে সে অনুযায়ী পদ-পদবী ও মর্যাদা নিয়ে চাকরি করে থাকেন। এখানে কাউকেই ছোট-বড় করার বিষয় একেবারেই নেই। সাম্প্রতিককালে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারী ইংলিশ স্কুলের ৭.৫% ভ্যাট তাদের আন্দোলনের মুখে সরকার বাতিল করেছে। কাজেই শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির প্রতি বর্তমান সদাশয় সরকার ধনাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করাটাই এখন স্বাভাবিক হিসেবে সবাই দেখতে চাইছে। কাজেই সিলেকশনগ্রেড রাখার বিষয়টি মেনে নিলে একদিকে যেমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদার বিষয়টির সুরাহা হয়ে যায়; অপরদিকে টাইমস্কেল বহাল রাখলেও সকল সরকারী চাকুরেদের কল্যাণ নিশ্চিত হয়। এতে প্রকৃত অর্থেই উইন-উইন সিচুয়েশন তৈরি করে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-ের যে স্রোতধারা তৈরি হয়েছে; এমনকি পূর্বে ৮০% এর স্থলে ৯০% পেনশন প্রাপ্তি, ২০% হারে নববর্ষ বোনাস প্রদানসহ আরও অনেক ভাল দিককে যেন বিনষ্ট করার কোন সুযোগ তৈরি হয় সেদিকে দৃষ্টি দিয়েই সিলেকশনগ্রেড ও টাইমস্কেল বহাল রাখতে হবে।

লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

এই মাত্রা পাওয়া