১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কেন এই অবমূল্যায়ন?

  • ড. ইকবাল হুসাইন

অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো প্রস্তাবাকারে উপস্থাপনের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে আসছেন। গত প্রায় চার মাস যাবত নমনীয় কর্মসূচীর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে তারা তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরছেন। কিন্তু কেউ কর্ণপাত করছেন না। ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা অষ্টম বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে। সেখানে শিক্ষকদের কোন দাবিরই প্রতিফলন ঘটেনি। উপরন্তু পরের দিন অর্থমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন তা অনভিপ্রেত। নিন্দুকেরাও অর্থমন্ত্রীর সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না। কিন্তু মাঝে মধ্যে তাঁর মন্তব্য তাকে সমালোচিত করে।

শিক্ষকরা মর্যাদার প্রশ্নে অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন করছেন। চলমান আন্দোলনে তারা সর্বোচ্চ পরিমিতি বোধেরও পরিচয় দিয়েছেন। মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, নীতিনির্ধারকদের (অর্থমন্ত্রীসহ) সঙ্গে সাক্ষাত, সপ্তাহে মাত্র তিন ঘণ্টার কর্মবিরতির (তবে পরীক্ষা চলেছে) মধ্যেই গত চার মাসের কর্মসূচী সীমাবদ্ধ ছিল। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। টক-শো’তেও অনেকে আলোচনা করেছেন। সবার প্রত্যাশা ছিল, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের আগে অসন্তুষ্টির ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু সচিব কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত বেতন কাঠামো প্রায় অবিকৃতভাবেই মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। এখানে শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া আমলে নেয়া হয়নি। বরং বোনাস হিসেবে পাওয়া গেছে অর্থমন্ত্রীর তীর্যক মন্তব্য।

এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষকরা কেন আন্দোলন করছেন? সহজ উত্তর, সপ্তম জাতীয় বেতন কাঠামোয় সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপকরা প্রথম গ্রেডে অবস্থান করছিলেন। আগে একজন সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতি পেয়ে অধ্যাপক হলে প্রথমে তৃতীয় গ্রেডে অবস্থান করতেন। পর্যায়ক্রমে তিনি দ্বিতীয় গ্রেডে এবং সিলেকশন গ্রেড প্রাপ্তির পর প্রথম গ্রেডে উন্নীত হতেন। কিন্তু সিলেকশন গ্রেড বাদ দেয়ায় অধ্যাপকরা এখন তৃতীয় গ্রেডেই আটকে যাবেন। অন্যদিকে, সপ্তম বেতন কাঠামোয় ‘সিনিয়র সচিব’ পদ বা গ্রেড ছিল না। কিন্তু অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোয় সিনিয়র সচিব পদ প্রযুক্ত করে তাকে মন্ত্রী পরিষদ/মুখ্যসচিব পদের সঙ্গে গ্রেডের বাইরে রাখা হয়েছে। সুপার গ্রেড বিবেচনায় নিলে অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোয় অধ্যাপকদের অবস্থান চার ধাপ নিচে নেমে গেছে। মর্যাদার এই অধগতির প্রতিবাদে আন্দোলন করতে খুব বেশি ‘জ্ঞানী’ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিনবদলের সনদ’-এর ১০.১ অনুচ্ছেদে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র উচ্চতর বেতন কাঠামো ও স্থায়ী বেতন কমিশন গঠনের অঙ্গীকার ছিল। উচ্চতর বেতন কাঠামো দূরের থাক, জাতীয় বেতন কাঠামোয় চার ধাপ অবনয়ন! বাংলাদেশ কিংবা বিশ্বে কি এর দ্বিতীয় নজির আছে? মাধ্যমিকের শিক্ষকদেরও গ্রেড উন্নীত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কেন এই অবমূল্যায়ন? অর্থমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পদোন্নতি প্রসঙ্গে দুঃখজনক মন্তব্য করেছেন। পদোন্নতি নয়, নিয়োগ প্রসঙ্গে বলতে চাই। বর্তমানে চারটি প্রথম বিভাগ/শ্রেণী না থাকলে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদের জন্য আবেদন করারই সুযোগ নেই। এর আগে উচ্চশিক্ষায় একটিসহ ন্যূনপক্ষে দু’টি প্রথম শ্রেণী, সঙ্গে এমফিল/পি-এইচ.ডি থাকতে হতো। কেবল ‘ফোর ফার্স্ট ক্লাস’ থাকলেই হবে না, অর্জিত ডিগ্রী প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হতে হবে। বাংলাদেশে আর কোন চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোর ফার্স্ট ক্লাসের এ বাধ্যবাধকতা নেই। এর পরে পদোন্নতি। উচ্চতর গবেষণা ও পর্যাপ্ত প্রকাশনা থাকলে অধ্যাপক হতে সর্বনি¤œ সময় লাগে ১২ বছর। ১৮Ñ২০ বছর শিক্ষকতা করেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক অধ্যাপক পদে উন্নীত হতে পারেন না। সিলেকশন গ্রেড পান বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট অধ্যাপকদের ২৫ শতাংশ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২৫ থেকে ৩০ বছর শিক্ষকতা শেষে কেউ কেউ সিলেকশন গ্রেড প্রাপ্ত হন। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকসহ অনেক অধ্যাপক আছেন, যাঁরা সিলেকশন গ্রেড প্রাপ্তির আগেই অবসরে চলে গেছেন। চুলপাকা প্রবীণ অধ্যাপকদের প্রথম গ্রেড দিতে অর্থমন্ত্রীর তীব্র আপত্তি! কিন্তু সচিবদের জন্য নতুন নতুন পদ ও ‘সুপার গ্রেড’ করতে কোন সমস্যা নেই।

শিক্ষা জীবনে শ্রেষ্ঠ রেজাল্টধারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। কিন্তু তাদের ক’জন পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারেন? জীবনের শেষ ধাপে এসে পেনশনের টাকায় কেবল একটা ঠিকানা হয়ত তৈরি করা যায়। সম্প্রতি সাবেক একজন মুখ্যসচিব একটি টক-শো’তে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের সুযোগ-সুবিধা সচিবদের সমপর্যায়ের বলে মন্তব্য করেছেন। জেনে রাখা ভাল, উপাচার্যদের জন্য কোন ভাতা নেই।

তিনি বিদ্যমান স্কেলেই উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে উপাচার্যের দায়িত্ব পেলে তার চলমান মূল বেতনের ২০ শতাংশ ডেপুটেশন ভাতা পান। অন্যদিকে উপাচার্য পদটি আবাসিক হওয়ায় তিনি কোন বাড়িভাড়া পান না। আমার পরিচিত একজন উপাচার্য তার দায়িত্ব গ্রহণের পর আগের তুলনায় আরও আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন। বস্তুত দাফতরিক প্রয়োজনে গাড়ির সুবিধা ব্যতীত একজন উপাচার্যের জন্য আর কোন সুবিধাই বরাদ্দ নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে সচিব এবং উপাচার্যদের সম্পদের খোঁজ-খবর নিলে একটি তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যাবে।

রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আশা করে, সবচেয়ে মেধাবীরা এখানে যোগদান করবেন। কিন্তু তাদের জন্য কোন প্রণোদনা নেই। গবেষণা নিয়ে অনেকে হতাশা ব্যক্ত করেন। কিন্তু গবেষণার জন্য আর্থিক সুবিধা নেই বললেই চলে। একজন সরকারী কর্মকর্তা গাড়ি ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা পান। নিরাপত্তারক্ষী, পিওন-আর্দালি, বাবুর্চিসহ অনেক সহায়তা তার জন্য বরাদ্দ। কিন্তু একজন শিক্ষককে রীতিমতো ‘সাধকের জীবন’ যাপন করতে হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অপেক্ষা অন্য যে কোন পর্যায়ের শিক্ষকের অবস্থা আরও খারাপ। সঙ্গত কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহী হচ্ছে না। ‘শিক্ষক বাই-চয়েস’ নয়, ‘শিক্ষক বাই-চান্স’ এর সংখ্যাই দিন দিন বাড়ছে। ‘বাই-চান্স শিক্ষক’দের দিয়ে আর যাই হোক, দক্ষ ও সৃষ্টিশীল জাতি গঠন হবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি বিষয়টি একটু ভেবে দেখবেন?

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর