২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সব জঙ্গী গ্রুপ এক কাতারে আনার গোপন মিশন

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ দেশে বর্তমানে নিষিদ্ধ হয়নি এমন জঙ্গী সংগঠনগুলোকে এককাতারে নিয়ে আসার মিশন শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামে জঙ্গী তৎপরতার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের যেসব সদস্য কাজ করছেন তাদের কাছে এ ধরনের তথ্য মিলেছে। শুধু তাই নয়, এরা নতুন করে আবার হিটলিস্ট করেছে। এ লিস্টে পুলিশ, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরাই বেশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে একাধিক জঙ্গী সংগঠন নেপথ্য যোগাযোগের মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে এবং এর পাশাপাশি ইসলাম রক্ষা ও ইসলামী আইন অনুশাসন কায়েমের বিষয়টি ব্যানারে এনে সংগঠিত হওয়ার তৎপরতা শুরু করেছে। এখনও পর্যন্ত আইএস এদেশে সরাসরি কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা জঙ্গী সংগঠনগুলোকে এক করে আইএসের কাতারে আনার প্রয়াস চলছে।

চট্টগ্রামে ফারদিন (ছদ্মনাম) নামের একজন বর্তমানে এসব জঙ্গী সংগঠনগুলোকে এক করার তৎপরতায় লিপ্ত। পুলিশ তার নাম পেলেও আসল পরিচয় এখনও উদঘাটন করতে পারেনি। তবে চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে গত ৬ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জেএমবির বিস্ফোরক শাখার প্রধান তৌহিদুল ইসলাম জাবেদ ওরফে রানা নিজেদের গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত হওয়ার ঘটনার পর চমকপ্রদ আরও একটি তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এ তৎপরতায় তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে এরা কাজ করছে। প্রথমত রয়েছে একটি দাওয়াতী গ্রুপ। দ্বিতীয়ত, অপারেশন গ্রুপ এবং তৃতীয়টি হচ্ছে বিস্ফোরক তৈরিতে বিশেষজ্ঞ। ঢাকায় অজ্ঞাত বিভিন্ন স্থানে এদের তিন থেকে চার মাস করে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতার জন্য দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।

পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে এদের কাছে বিপুল পরিমাণ ভারী অস্ত্রের মজুদ হয়েছে। যার মধ্যে একে-৪৭, একে-২২, এসএমজি, রাইফেল, পিস্তল ও বিভিন্ন জাতের গোলাবারুদ। গত ৬ অক্টোবর জেএমবি সামরিক প্রধান জাবেদসহ সুইসাইড স্কোয়াডের আরও ৪ সদস্যকে গ্রেফতারের পর যে অস্ত্রশস্ত্র ও গ্রেনেড উদ্ধার হয়েছে তা একেবারেই সামান্য। এ ধরনের প্রচুর পরিমাণ গ্রেনেড এসব জঙ্গী সংগঠনের কাছে সংরক্ষিত আছে এবং সবগুলো গ্রেনেডের আকার এবং ধরন একই। পুলিশের বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলো বলছে, একইস্থান থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্তরা একই কায়দায় এসব বিস্ফোরক ও গ্রেনেড তৈরিতে লিপ্ত।

চট্টগ্রামে পুলিশ জেএমবির সামরিক কমান্ডার জাবেদসহ ৫ জনকে গ্রেফতারের পর আরও ৩০ জনের একটি তালিকা পেয়েছে। যারা প্রত্যেকেই সামরিক প্রশিক্ষিত। বর্তমানে এদের সবাই গা ঢাকা দিয়েছে। চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে যে তিনটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকা- হয়েছে এগুলোর সঙ্গে এ গ্রুপটি জড়িত। তার মধ্যে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেম হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, এ সংগঠনগুলো এককাতারে নিয়ে আসতে বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন হচ্ছে। তবে এ অর্থায়ন কোন পথে এবং কারা এর যোগানদাতা সে তথ্য এখনও বের করা যায়নি। তবে চট্টগ্রামের বাইরের এলাকার জঙ্গী সদস্যদের অবস্থান বেশি। জঙ্গী তৎপরতার সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য ও এদের আইনের আওতায় আনতে কর্মে জড়িত পুলিশ টিমের সদস্যদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত ৬ অক্টোবর যখন জাবেদসহ সুইসাইডাল স্কোয়াডের ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয় তখন তাদের হিংস্রতা এমন ছিল যে যা না দেখলে কল্পনা করা যায় না। ওইদিন জাবেদ হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় যে গ্রেনেড বিস্ফোরণের চেষ্টা চালিয়েছিল তা যদি সফল হতো তাহলে ওইদিন অভিযানে থাকা পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তাসহ কাউকে আর হয়ত প্রাণে বাঁচানো যেত না। তবে শেষ পর্যন্ত নিজের গ্রেনেড বিস্ফোরণে জাবেদ নিজেই প্রাণ হারায়। আহত হয় তিন পুলিশ সদস্য।

এদিকে এ ঘটনা সিএমপিসহ পুলিশ সদর দফতরকেও ভাবিয়ে তুলেছে। বিভিন্ন সূত্রে তাদের ধারণা এসেছে, দেশে এখনও আইএস তৎপরতা শুরু করা যায়নি। তবে চেষ্টা চলছে ব্যাপকভাবে। এর প্রাথমিক পর্যায়ে জেএমবি, হিযবুত তাহরীরসহ অন্যান্য যেসব জঙ্গী সংগঠন রয়েছে সবাইকে এক করার তৎপরতা চলছে। তবে বিস্ময়ের ব্যাপা হচ্ছে, এদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলোতে গ্রুপভিত্তিক নম্বর ছাড়া একাধিক কোন নম্বর থাকে না। ৬ অক্টোবরের অভিযানে যারা ধরা পড়েছে এদের প্রত্যেকের মোবাইলে চারজনের বেশি কারও নম্বর মেলেনি। অর্থাৎ চারজনে মিলেই তাদের তৎপরতা চালানোর দায়িত্ব পালন করত। অপরদিকে এর বাইরে চূড়ান্ত নির্দেশ কোত্থেকে আসছে, কারা দিচ্ছে এরা অবহিত থাকে না, জানতে দেয়া হয় না। এরা একটাই দীক্ষা পেয়েছে, ধর্মের জন্য প্রাণ গেলেও শহীদের স্থান পাওয়া যায়। এ আদর্শে তারা দীক্ষিত এবং এ ধরনের ধর্মমনা যুবকদেরই সংগঠনের পতাকাতলে নিয়ে আসে। এসব সংগঠন সদস্যদের মধ্যে শিক্ষিত যুবকদের আধিক্য রয়েছে। বিশেষ করে প্রকৌশল শিক্ষায় শিক্ষিতদের সংখ্যাও খুব একটা কম নয়।

সূত্র জানায়, ঢাকা এবং চট্টগ্রামে এদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। এ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী তারা তাদের বিরুদ্ধে যেসব পুলিশের তৎপরতা রয়েছে তাদের নাম, পরিচয় ও প্রদত্ত বক্তব্য ভিডিও করে রাখছে। পাশাপাশি গণমাধ্যমে যারা জঙ্গীবিরোধী সংবাদ প্রচার করে তাদেরও লিস্ট তৈরি করা হচ্ছে। কিছু বুদ্ধিজীবীও এ তালিকায় রয়েছেন। সম্প্রতি দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার নেপথ্য ঘটনা এখনও অনুদঘাটিত। তবে এ ঘটনা যে, জঙ্গী সংগঠনের সদস্যরা ঘটায়নি তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুলিশ সূত্রে আরও জানানো হয়েছে, ধর্মীয় মনোভাবার হলেও এদের চলাফেলা ও বেশভুষাতে তা মেলে না। কারণ এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সন্দেহ বেশি করে বলে তারা তাদের চাল চলনে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। চট্টগ্রামে ফারদিন নামের যে জঙ্গী প্রধান রয়েছে তিনি চট্টগ্রামের না অন্য জেলার তা এখনও পরিষ্কার হওয়া যায়নি। যেসব তথ্য তার ব্যাপারে এসেছে তা নিয়ে গোয়েন্দারা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে, জঙ্গী তৎপরতা বিরোধী কর্মে পুলিশ সদস্যদের এককভাবে এ কাজে সম্পৃক্ত রাখা গেলে অনেক কিছুই উদঘাটিত হবে। কিন্তু প্রশাসনিক বিভিন্ন নিয়মের কারণে মাঝপথে কর্মকর্তাদের রদবদল হয়ে যায় বলে জঙ্গী তৎপরতার ঘটনা শেষ পরিণতি মেলে না। এতে করে আগামীতে একটি শঙ্কা দিন দিন বেড়েইে চলেছে। এর থেকে পরিত্রাণে জঙ্গী কার্যক্রমের তদন্তে যারা অভিজ্ঞ তাদের দিয়ে বিশেষ টিম গঠন করে এ কাজে লিপ্ত রাখার মতও ব্যক্ত করা হয়েছে।