২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খিজির খানের হত্যাকারী চিহ্নিতকরণ এখনও খোঁজখবর পর্যায়ে

গাফফার খান চৌধুরী ॥ গত সোমবার রাতে নিজ বাসায় হত্যাকা-ের শিকার হওয়া বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা খিজির খানের সঙ্গে গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে আলাপকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি যারা টাকা নিয়ে খিজির খানের বাসায় গিয়েছিল তাদের সম্পর্কেও খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা সম্ভব হলে দ্রুত হত্যা রহস্য উদঘাটিত হবে। যদিও এখন পর্যন্ত গ্যারেজ ভাড়া সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খিজির খানের সঙ্গে আলোচনাকারীরা মিথ্যা পরিচয়ে আলাপ করেছে বলে তদন্তকারীরা অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে।

এদিকে হত্যাকা-ের ঘটনায় মঙ্গলবার গভীর রাতে বাড্ডা থানায় অজ্ঞাত ৬/৭ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন নিহতের ছোট ছেলে মুহম্মদ আশরাফুল ইসলাম। বুধবার রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত কেউ গ্রেফতার হয়নি। সোমবার রাত পৌনে ৮টায় রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন মধ্যবাড্ডার গুদারাঘাট এলাকার জ-ব্লকের ১০/১ নম্বর ৬ তলা নিজ বাড়ির তৃতীয় তলায় বাড়ির সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত খানকা শরীফে খিজির খানকে গলা কেঁটে হত্যা করা হয়। এ ব্যাপারে দায়েরকৃত মামলায় বলা হয়, সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে হত্যাকা- সংঘটিত হয়। ৬ হত্যাকারী হত্যাকা- সংঘটিত করে। প্রথমে ২ জন বাড়ির তৃতীয় তলায় খিজির খানের পরিবার যেখানে বসবাস করে সেই ফ্ল্যাটে যায়। এরপর আরও ৪ জন পেছন পেছন যায়। এ সময় খিজির খানের ছোট ছেলে ব্যক্তিগত কাজে বাড়ির বাইরে যাচ্ছিল।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তৃতীয় তলা ২ জনকে এবং বাকি ৪ জনকে সিঁড়ির মাঝে দেখেন। পিতার ভক্ত মুরিদ ভেবে তিনি ৬ জনের যাওয়াকে স্বাভাবিকভাবেই নেন। এরপর রাত প্রায় সাড়ে ৮টার দিকে ফোন পেয়ে পিতাকে বাড়ির দ্বিতীয় তলায় খানকা শরীফের অজুখানায় হাত-পা বাঁধা ও মুখে স্কচটেপ লাগানো গলা কেঁটে হত্যা করা অবস্থায় পায়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকারীরা তৃতীয় তলায় প্রথমেই খিজির খানের স্ত্রী, বড় ছেলের বউ, ছোট মেয়ে, বড় ভাইয়ের ছেলে মাহি ও মেয়ে সাফিয়া এবং চালক মোস্তফাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বেঁধে ফেলে। অনেকের মুখেই পর্দার কাপড় কেটে টুকরো টুকরো করে গুঁজে স্কচটেপ দিয়ে আটকিয়ে দেয়।

এরপর গ্যারেজের অগ্রিম ভাড়ার এক লাখ টাকা দ্বিতীয় তলায় থাকা খিজির খানকে দিতে যায়। সেখানে কথোপকথনের এক পর্যায়ে হত্যাকারীরা খিজির খানের মুখ চেপে ধরে। মুখে স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেয়। এসব দেখে সেখানে খানকা শরীফের মেঝে পরিষ্কার করা গৃহকর্মী আমেনা ও জমিলা চিৎকার দেয়। পরে তাদেরও মুখ স্কচটেপ দিয়ে আটকিয়ে দেয়। এমনকি আমেনার এক নাতনিকেও হাত-পা, মুখ বেঁধে রাখে। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে পর্দার কাপড় কেটে বাঁধা হয়। পরে খিজির খানকে জবাই করে অজুখানার ড্রেনে ফেলে রেখে চলে যায়।

এ ব্যাপারে মামলার বাদী খিজির খানের ছোট ছেলে বেসরকারী ডাঃ সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র মুহম্মদ আশরাফুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, ৬ হত্যাকা-ের কারণ সম্পর্কে তিনি জানেন না। এমনকি গ্যারেজ ভাড়ার বিষয়ে কার সঙ্গে আব্বার কথা হয়েছে, তা তার অজানা। ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে তার পিতাকে হত্যা করা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে আমি সন্দিহান। তবে তার পিতার সঙ্গে কারও পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কোন বিরোধ ছিল না।

জানা গেছে, ব্যক্তি জীবনে খিজির খান নকশেবন্দিয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকতের ‘রহমতীয়া খানকা শরীফ’ এর ইমাম ছিলেন। সারাদেশে তরিকাটির ২০টি খানকা শরীফ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ২টি। একটি তার বাসায় দ্বিতীয় তলায়। যেখানে তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনার সময় খিজির খানের বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী মোখলেছুর রহমান (৫০) ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানাধীন ফিলিপনগরে গ্রামের বাড়িতে যান।

মামলাটির তদন্ত করছে বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। ছায়া তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। বাড্ডা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দেলোয়ার হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, খিজির খানের সঙ্গে গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে আলোচনাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এমনটাই দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পূর্ব বিভাগের উপকমিশনার মাহবুব আলম। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, তাদের শনাক্ত করতে পারলেই হত্যা রহস্য দ্রুত উদঘাটন করা সম্ভব হবে। তবে মিথ্যা পরিচয়ে গ্যারেজ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খিজির খানের সঙ্গে কথা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে খিজির খানকে হত্যা করা হতে পারে বলে বাড্ডা থানা পুলিশ ও ডিবির পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি।

তদন্তকারীদের এমন ধারণার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন খিজির খানের ভক্ত মুরিদরাও। নিহতের ভাগ্নে শহীদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণেই হত্যাকা-ের ঘটনাটি ঘটে থাকার সম্ভাবনা বেশি। কারণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কোন বিরোধ নেই। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে রাত ১১টা সাড়ে ১১টা নাগাদ এবং প্রতি চন্দ্র মাসের ১১ তারিখে মাসিক মাহফিল বসত। মাহফিলে পবিত্র কুরআন, সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা, হালাল রোজগার করা, হালাল খাবার খাওয়াসহ ইসলামের নানা দিক নির্দেশনা সম্পর্কে বয়ান দিতেন খিজির খান। পুলিশের গুলশান জোনের উপ-কমিশনার এসএম মোস্তাক আহমেদ খানও ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণেই খিজির খান খুন হতে পারেন বলে জোর দেন। পাশাপাশি হত্যাকা-ের পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব আছে কিনা সে বিষয়েও তদন্ত চলছে বলে জানান।