১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নজরুলের সাপুড়ে মঞ্চায়নে নীলাখ্যান

  • অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

সাপের বিষ সাপের দেহের অভ্যন্তরে মানানসই। কিন্তু সেই বিষ মানবদেহে প্রবেশ করলে বেমানানই শুধু নয়, বরং সময়মতো চিকিৎসা করাতে না পারলে মৃত্যু অনিবার্য। তথাপি কারও না কারও তো সাধ হতেই পারে, মানবদেহে বিষধর সাপের বিষ ধারণ কিংবা হজম করার। মায়ার মায়ায় ভুলে পালিত কন্যাকে এক সময় স্ত্রী রূপে পাবার অথবা দৈব সৌভাগ্য কিংবা অবধারিত নিয়তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তৃতীয় মাত্রার ঘটনা ঘটার। খানিকটা এ রকম ঘটনার ঘনঘটা নিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছোট গল্প ‘সাপুড়ে’। সাপুড়ে গল্প অবলম্বনে, নাট্যকার আনন জামানের নাট্যরূপে, নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্কের নির্দেশনায়, মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের ৩৬তম প্রযোজনায় নাটক ‘নীলাখ্যান’ মঞ্চস্থ হলো গল্প-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবের সমাপনী দিনে গত ১২ সেপ্টেম্বর শিল্পকলা একাডেমি এক্সপেরিমেন্টাল হলে। এক্সপেরিমেন্টাল হলে না, বরং চিড়িয়াখানায় গেলেই দেখতে পাওয়া যায় আরও অনেক পশু-পাখির ভিড়ে অজগর-গোখরা কিংবা কেউটের মতো বিষধর সাপ। এই সাপকে কেন্দ্র করেই বেহুলা-লখীন্দর-এর মতো কালজয়ী সাহিত্য আজও অনুরাগীদের হৃদয়ের মণিকোঠায়। হিন্দু মিথলজির অনুসারীরা যে বিয়ের পরের রাতকে কালরাত্রি মেনে স্বামী-স্ত্রী ভিন্ন স্থানে থাকে সেখানেও সাপ এবং সর্পদেবী মনসার মিথটাই বিবেচ্য। গল্প সাপুড়ে তথা নাটক নীলাখ্যানে দেবী মনসার দেববাণী শুনে বেদে সর্দার জহর সাধনায় নিমগ্ন। তার সাধনা, এক শ’ সাপের দংশিত বিষ দেহে ধারণ করে বিষক্ষয় শক্তি ধারণ করা। সাধনায় প্রেম থাকে, কামের স্থান সেখানে নেই। ফলে বঞ্চনায় আহত হয়ে, অভিমানে নীল হয়ে জলে ডুবে আত্মাহুতি দেয় জহরের স্ত্রী বিস্তী রানী। সেই জলাধার থেকে সাপে কাটা বালিকা চন্দনকে বাঁচিয়ে ঘরে তোলে জহর সন্তান জ্ঞানে। কিন্তু কচি লতার মতো চন্দনই যখন ভরা যুবতী তখন স্ত্রীরূপে চন্দনকে পেতে মরিয়া জহর। পিতা জ্ঞানে বেড়ে ওঠা জহরকে কিছুতেই স্বামী ভাবতে না পারা এবং জহর শিষ্য ঝুমরোকে ভালবেসে স্বামী হিসেবে পেতে মরিয়া চন্দন। একদিকে ভালবাসার অবমূল্যায়ন অপরদিকে শিষ্যের কারণে পরাজয়- সব মিলে-মিশে প্রেমকে মহত্ত্ব দিতে, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে সাপের ছোবলের মধ্যে দিয়ে জহরের আত্মাহুতির মধ্যে দিয়ে শেষ হয় নাটক নীলাখ্যান। অত্যন্ত পরিশালিত মেদহীন নাটকীয়তা, তুলনামূলক বর্ণনাকারীর বর্ণনাত্মক বিরক্তির স্বল্পতা এবং সংলাপের মতোই গানের কথা সৃজনে নাট্যরূপকার আনন জামান মার্জিত-প্রাণবন্ত এবং নান্দনিক। প্রমিত ভাষা আর উপভাষার ফিউশানের চক্কর থেকে কোন একদিকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে আনন জামান অনেকটাই এগিয়েছেন নীলাখ্যান নাটকে। নীলাখ্যান কেন নীলছোবল না তার ব্যাখ্যা স্পষ্ট নির্দেশক ইউসুফ হাসান অকের সৃজন কর্মে এবং সৃজনশীল নির্দেশকের কথায়। ইউরোপীয় রীতির চরিত্রাভিনয়ের বিপরীতে বর্ণনাত্মক চরিত্রাভিনয় তার আরাধ্য এবং বাস্তবায়নে নীলাখ্যানেও ঘটে তাই। নান্দনিক শ্রুতিময়তার মধ্যে দিয়েই আখ্যান পরিবেশিত হয়। নৃত্য আছে, গীত আছে, আছে আঙ্গিক কসরত। একজনের কাহিনী বয়ানের বিপরীতে সকল মিলে গল্প বলার চেষ্টা করে ঠিকই কিন্তু সকলের চেষ্টা সত্ত্বেও মনামী ইসলাম কনক তার প্রতিভা ও দক্ষতার জোরে প্রযোজনাকে সফলভাবে জিতিয়ে নেয়। নির্দেশক অর্কের বড় গুণ বর্ণনাত্মক পরিচিতির ত্রিমাত্রিক বিরক্তির হাত থেকে (উদাহরণ- আমি মীর জাহিদ হাসান একজন অভিনেতা, জহর আমার স্রোতের উর্মীমালা, বিন্তীর সুরভী কি এক অহম তমসায় চন্দনের গ্রীবা হয়ে আমায় নেশাপ্লুত করে যায় সেই ঘটনা বর্ণনা করি সঙ্গীতের সুরধারায়- হতে পারত বিবেচ্য) দর্শকদের রক্ষা করে শ্রুতিময়তার সুরধারায় দ্বিমাত্রিক (মঞ্চের ঘটনা-দর্শকদের উপলদ্ধি) রসাস্বাদন পাইয়ে দিতে পারা। নির্দেশক যথেষ্ট নাটকীয় ইমেজ তৈরি করেছেন (বন্দনা, শ্মশান যাত্রা, চন্দনাকে ঘিরে মৌটুসীর টানাপড়েন, ঘণ্টা বুড়োর ত্রিকালদর্শী, বেদেদের উৎসব, জহরের কাম-প্রেমের টানাপড়েন, ঝুমরোকে দংশনের হাত থেকে রক্ষা কিংবা দংশিত করা, জহরের মৃত্যুর দাম্ভিকতা, ঝুলপ্ত বাঁশের দোলায় দেবালোক মর্তালোকের সংযোগ, সাপের সর্পিল গতির প্রবাহমানতা প্রভৃতি বিবেচ্য) তথাপি গীতলের আদলে ইমেজ তৈরিতে নির্দেশকের বিশ্বাসের প্রশ্নে একটু বিবেচনা দাবি করে। ঢাকার মঞ্চে বর্তমান প্রজন্মের কজন অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন যাদের বিশ্বজনীন জ্ঞান তথা বোধ অর্জিত এবং আঙ্গিক-বাচিক সাত্ত্বিক অভিনয় নিয়ন্ত্রিত। তা যদি না থাকে তবে নির্দেশক অর্ক শব্দের চিত্রকল্প তৈরি করাবেন কাদের দিয়ে। নাট্যদলগুলো বর্তমানে যেখানে নাট্যনেতা-নির্দেশক এবং টার্গেট শিল্পী বানাতে যত্মশীল সেখানে উপেক্ষিত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্ক একা কতটা টানবেন। ইউসুফ হাসান অর্কের কৃতিত্ব বিশেষ কারণে যে, তিনি গীত প্রধান প্রযোজনা নামালেও এক ওড়না ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই চরিত্রে অসংখ্য অভিনেতা-অভিনেত্রী নামিয়ে জোড়াতালি দিয়ে নির্দেশনায় সফল হতে চাননি বলে। শেষ পর্যন্ত তিনি জহর চরিত্রে মীর জাহিদ হাসান, চন্দন চরিত্রে জেরিন তাহনীম এশা, ঝুমরোর চরিত্রে আমিনুল আশরাফ কিংবা ঘণ্টাবুড়ো চরিত্রে মো .শাহনেওয়াজকে চিনিয়ে দেন। নাটক থেকে নাটক ও অভিনয় বিলুপ্তির এই সঙ্কটকালে ইউসুফ হাসান অর্ক ও তাঁর নীলাখ্যান কিছুটা হলেও নীল দংশনের হাত থেকে বাঁচবার স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্ন নির্দেশকের কোমল ব্যক্তি সত্তার মতোই নদী বিধৌত উর্বর ভূমিতে সঙ্গীত আবহে ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন। যেমনিভাবে নীলাখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র জহর মৃত্যুর আলিঙ্গনে নশ্বর দেহ হারিয়েও প্রেমের সাম্রাজ্যে অমর সমাধি গড়ার স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নের বাস্তবায়ন নাটক নীলাখ্যান।