২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সর্বনাশা ইটভাঁটি ॥ ঢাকায় বায়ু দূষণের বড় উৎস

সর্বনাশা ইটভাঁটি ॥ ঢাকায় বায়ু দূষণের বড় উৎস
  • ৫৮ শতাংশ বায়ু দূষণের জন্য দায়ী ইটভাঁটি থেকে নিঃসরিত পদার্থ;###;শুষ্ক মৌসুমে দূষণের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে

শাহীন রহমান ॥ ঢাকার বায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস ইটভাঁটি। শুধু ইটভাঁটির কারণেই রাজধানীর ৫৮ শতাংশ বায়ু দূষণের শিকার হচ্ছে। ইটভাঁটি থেকে নিঃসরিত দূষণের অন্যতম উপাদান হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড, অক্সাইড অব সালফার, বস্তুকণা ও উদ্বায়ী জৈব যৌগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন গ্রীন হাউস গ্যাস উৎপাদনেরও এই বড় উৎস ইটভাঁটি। এ ছাড়া রাজধানীর বাকি বায়ু দূষণ ঘটছে যানবাহনের জীবাশ্ম জ্বালানি দহন ও শিল্প-কারখানার দূষিত ধোঁয়ার মাধ্যমে।

পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ১১টি স্থানে স্থাপিত বায়ু দূষণের মান পরীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সর্বক্ষণিকভাবে বায়ুর মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে রাজধানীর ঢাকার বায়ু দূষণ শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে নবেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এ সময় বায়ু দূষণের অন্যতম উপাদান যেমন পার্টিক্যাল ম্যাটার বা বস্তুকণা-১০ ও বস্তুকণা ২.২৫ বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। আর এই দূষণ বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রাজধানীর ও এর আশপাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাঁটিগুলোকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়ে বায়ু দূষণের মূল কারণ হলো ইটভাঁটি চালু হওয়া, বৃষ্টিপাত কম হওয়া। এ ছাড়া বাতাসের গতিবেগ কম থাকার কারণে রাস্তাঘাটে বস্তুকণার উপস্থিতি প্রচুর পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়।

পরিবেশ অধিদফতর জানিয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহর ও নগরাঞ্চলের বায়ু দূষণের মান পরিবীক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে ১১টি সর্বক্ষণিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় স্থাপন করা হয়েছে তিনটি কেন্দ্র। এর বাইরে চট্টগ্রামে ২টি, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে ১টি করে এ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বায়ু দূষণকারী পদার্থের ক্ষতিকর দিক ও মাত্রা নিরূপণ করা হচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়ানো দূষণ পদার্থের মধ্যে রয়েছে পার্টিক্যাল ম্যাটার বা বস্তুকণা ২.৫, বস্তুকণা ১০, কার্বন মনোক্সাইড, ওজোন, সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেনের অক্সাইড। এ ছাড়াও এসব কেন্দ্রে আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত উপাত্তসমূহ যেমন বায়ুর গতি, বায়ুর দিক, আদ্রতা, তাপমাত্রা, উলম্ব বায়ুর গতি বায়ুর মানযন্ত্রের পরিবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সর্বক্ষণিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর এই পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে দেশে প্রধানত শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে শীত মৌসুমে বায়ু দূষণের মাত্রা বেড়ে অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এই সময়ে বায়ু দূষণের প্রধান উপাদান মূলত পার্টিক্যাল ম্যাটার বা বস্তুকণা। বিশেষ করে এ কণার পরিমাণ যখন ২.৫ এর মাত্রায় চলে আসে তখনই তা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বায়ু দূষণ।

পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের যানবাহনের জীবাশ্ম জ্বালানিও বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস। যানবাহনের জ্বালানি দহনের ফলে বস্তুকণা ছাড়াও অক্সসাইডস অব নাইট্রোজেন, অক্সাইড অব সালফার ও হাইড্রোজেন উৎপন্ন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যানবাহন থেকে নির্গত এসব দূষিত পদার্থ সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে ওজোনে পরিবর্তিত হয়। তাদের মতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শহর ও নগরগুলোর বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস পুরনো বাস, ট্রাক, হিউম্যান হলার। এ ছাড়াও বায়ু দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট, স্টিল ও রিরোলিং, গ্লাস সিরামিকস প্লাস্টিক কারখানা। এ ছাড়াও রয়েছে ফাউন্ড্রি, ব্যাটারি রিসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানা। যার সবগুলোর ঢাকা ও এর আশপাশে রয়েছে।

পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ১১টি বায়ুর মান যন্ত্রের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের জন্য স্থাপন করা হয়েছে একটি কেন্দ্রীয় উপাত্ত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। এখানে একটি কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে সব মনিটরিং কেন্দ্রের ডাটাবেজে প্রবেশ করে কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধমে সব মনিটরিং কেন্দ্রের উপাত্ত এক সঙ্গে অবলোকন করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সার্ভার কক্ষটি সর্বক্ষনিকভাবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে স্থাপিত বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে।

বায়ু দূষণের কারণে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপে বার বারই উঠে আসছে ঢাকা শহরের নাম। এ জরিপে বার বার তালিকার সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকছে রাজধানী ঢাকা। পরিবেশ দূষণ ও জীবনমানের সম্ভাব্য প্রতিটি ক্ষেত্রে তার প্রভাব বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গত বছরও একটি বৈশ্বিক সূচক প্রকাশ করেন। যার নাম গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল পারফরমেন্স এ্যান্ড ইনডেক্স। ২০১৪ সালের এ গবেষণায় মোট ১৭৮টি দেশের সার্বিক পরিবেশগত পরিস্থিতি ও জীবনমানে তার প্রভাব উঠে এসেছে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, সার্বিক জীবনমানের ভিত্তিতে পরিবেশগতভাবে সুরক্ষিত দেশগুলোর তালিকায় ১৭৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৯তম। শুধু বিশুদ্ধ বাতাসের নিরিখে করা পৃথক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৮তম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেতিবাচক অর্থে বায়ু দূষণের ক্ষেত্রে সব সময় চ্যাম্পিয়ন অবস্থানে রয়েছি।

সম্প্রতি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে বায়ু দূষণের কারণে মস্তিষ্কের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মধ্য বয়সী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের বুদ্ধিমত্তার ওপর বায়ু দূষণ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিন এবং বেথ ইসরায়েল ডেকোনেস মেডিক্যাল সেন্টারের গবেষকরা যৌথভাবে ৯শ’ জনের ওপর একটি পরীক্ষা চালিয়ে এই তথ্য জানিয়েছেন। গবেষকরা দেখেছেন দীর্ঘ সময় ধরে বায়ু দূষণের সংস্পর্শে থাকলে মস্তিষ্কের সামগ্রিক আকৃতি সঙ্কুচিত হয়ে যায়। যানবাহন, কল-কারখানা, পাওয়ার প্ল্যান্ট, কাঠ পোড়া, অটোমোবাইল কারখানাজাত ক্ষতিকর যে সমস্ত পার্টিক্যাল বাতাসে মিশে তারা ফুসফুসের এবং মস্তিষ্কের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। ওই গবেষণায় স্কুল অব মেডিসিনের নিউরোলজির এক অধ্যাপক জানান, যারা রাস্তার কাছাকাছি থাকেন বা বেশিরভাগ সময়টা রাস্তাতেই কাটিয়ে দেন তাদের মস্তিষ্কে বায়ূ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সর্বাধিক। এটি ডিমনেশিয়া ও স্ট্রোকেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইটভাঁটি বায়ু দূষণের অন্যতম কারণে হলেও পরিবেশ দূষণ বিবেচনায় রেখেও সরকার অনেক আগেই এ বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন ও তার সংশোধনী পাস করে। কিন্তু কোন কিছুতেই বায়ু দূষণ রোধ করা সম্ভব হয়নি। পরিবেশ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে ইটভাঁটির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত বিরূপ প্রভারেব কারণে ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ সংশোধন আইন ২০০১ জারি করে ইটভাঁটিতে যে কোন উদ্ভিদজাত জ্বালানী ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে এক ইটভাঁটির সঙ্গে অন্য ইটভাঁটির দূরত্ব বিষয়ক বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়। কিন্তু এর পরও কোন লাভ হয়নি। সনাতন পদ্ধতি ইট পোড়ানো এখনও চলছে। এ ছাড়া ইটভাঁটি স্থাপনের পরিবেশ গত ছাড়পত্র বা লাইসেন্স নেয়া বাধ্যতামূলক থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। ফলে দেশে সঠিক ইটভাঁটির সংখ্যাও পরিবেশ অধিদফতরের কাছে না থাকায় এর বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।

পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মকবুল হোসেন বলেন, দেশের সব ইটভাঁটি পরিবেশ বান্ধব উন্নত প্রযুক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা চালানো হচ্ছে অধিদফতরের পক্ষ থেকে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তিতে রূপান্তরে সফলতা পাওয়া গেলেও ঢাকা ও চট্টগ্রামকে এখনও এ প্রযুক্তিতে আনা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, নগরবাসীকে নির্মল বায়ু উপহার দেয়ার জন্য কেস প্রকল্পের আওতায় বায়ুর মাণ পরিবীক্ষণে দেশের ১১টি স্থানে বায়ু মাণ পরীক্ষার যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। এ যন্ত্রের সাহায্যে বায়ুর মান পরীক্ষা করে দেখা গেছে বর্ষাকালে বায়ু মাণ সঠিক থাকলেও শীতের পর বস্তুকণার উপস্থিতি বেশি পাওয়া যাচ্ছে যা সীমা অতিক্রম করছে। তিনি বলেন, মহানগরের পাশে যত্রতত্র গড়ে ওঠা ইটভাঁটি ও যানবাহনের ধোঁয়া এর জন্য দায়ী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজের জন্য ইট একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। ফলে অধিকাংশ বড় শহরগুলোর চারপাশে প্রতিনিয়ত ইটভাঁটির সংখ্যা বাড়ছে। তাদের মতে দেশে এখনও ইট প্রস্তুতে পুরনো অদক্ষ পদ্ধতিতে ও জ্বালানি হিসেবে অধিক সালফারযুক্ত নিম্নমানের কয়লা ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই এসব ভাঁটি থেকে দূষণের মাত্রা বেশি হচ্ছে। তাদের মতে ইটভাঁটিতে পোড়ানো ইটের সঙ্গে আমরা বেশি পরিচিত হলেও গ্রীন হাউস গ্যাস নিঃসরণ ও বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস হওয়ার কারণে উন্নত বিশ্বে পোড়ানো ইটের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এর বাইরের সেসব দেশে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি চালু রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বালু-সিমেন্ট-টুকরা পাথরের মিশ্রন চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রস্তুত ব্লক, কাদা মাটির সঙ্গে রাসায়নিক দ্রব্য যোগ করে প্রস্তুত ইট ও ফোম কংক্রিট ব্লক ব্যবহার হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত ইট ওজনে হালকা এবং তাপ নিরোধক হয় বিধায় বিল্ডিংয়ের পার্টিশান হিসেবে এর ব্যবহার উপযোগী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে এটি বিকল্প হিসেবে দেশে ব্যবহার করা গেলে বায়ু দূষণের পরিমাণ কমানো সম্ভব হবে।