২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাপা এখন নাম সর্বস্ব এক বিরোধী দল! ॥ বড় একা হয়ে যাচ্ছেন এরশাদ

  • কোন্দল দলের সর্বস্তরেই;###;ক্রমেই কমছে জনসম্পৃক্ততা;###;বেশিরভাগ এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতা দলীয় প্রধানের পাশে নেই

রাজন ভট্টাচার্য ॥ রাজনৈতিকভাবে একা হচ্ছেন এক সময়ের দুর্দ- প্রতাপশালী সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দলীয় কোন্দলে এখন প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে তেমন কেউ তার পাশে নেই। বিরোধীদলের নেতা ও স্ত্রী রওশনই এরশাদকে পছন্দ করেন না। তিনি নিজেই দলের প্রভাবশালী গ্রুপের এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভাই জি এম কাদেরের সঙ্গেও সুসম্পর্ক নেই। ৪০ সাংসদের মধ্যে হাতেগনা তিন থেকে চারজন ছাড়া কেউ এরশাদের কাছে আসেন না। প্রায় দেড় বছরের মধ্যে দলের প্রেসিডিয়ামের কোন বৈঠক হয়নি। সাংগঠনিক অবস্থাও নাজুক। ৭৬টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ১৭টি সম্মেলন হয়েছে। বাকিগুলো বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ। সেই সঙ্গে জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে দলীয় কোন্দল তো আছেই। অনেক জেলায় দলীয় কার্যক্রম পরিচালনারও লোক নেই।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ গেছে প্রায় দুই বছর। একাধিকবার কেন্দ্রীয় সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নিয়েও দল গোছানো না হওয়ায় তা বাতিল করা হয়েছে। দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো একেবারেই নাম সর্বস্ব। জেলা উপজেলা পর্যায়ে দিন দিন কমছে জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা। ভোট। খোদ দলের নেতারাই বলছেন, এককভাবে নির্বাচন করলে জাপার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর থেকেই হয়ত এরশাদ জাতীয় নির্বাচনে পাস করতে পারবেন না। এই প্রেক্ষাপটে সারাদেশে পার্টির অবস্থান সহজেই অনুমান করা সম্ভব।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এরশাদকে পরিচালনা করেন দলের তিনজন প্রভাবশালী নেতা। এই তিনজনের মধ্যে আছেন, জাতীয় পার্টির কোষাধ্যক্ষ ও এরশাদের ভাগ্নে মেজর (অব) খালেদ আখতার, বর্তমান মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ও যুগ্ম-মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া। মূলত তাদের কাছেই নানা কারণে জিম্মি সাবেক এই রাষ্ট্রপতির দল। এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের ক্ষোভের শেষ নেই।

সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে রওশনের সঙ্গে এরশাদের বিরোধ প্রকাশ্য হয়। নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা ও মনোনয়ন প্রত্যাহারে দলীয় প্রধানের নির্দেশ অমান্য করে রওশনের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্ত্রী সরে গেলেও এরশাদের পাশে ছিলেন ভাই জিএম কাদের। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে তাকেও দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে। জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে জিএম কাদেরের প্রকাশ্য বিরোধ। বিরোধ মেটাতে দলীয় প্রধান হিসেবে উদ্যোগ নেননি এমপি এরশাদ। নানা কারণে মনকষ্টে অনেকটা দূরে সরে আছেন জাপায় পরিচ্ছন্ন মানুষ হিসেবে পরিচিত সাবেক মন্ত্রী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের।

নির্বাচনের পরেই এরশাদের কথা শোনেন না বেশিরভাগ সাংসদ। বহুবার রওশনের বলয় ছেড়ে নিজের কাছে সবাইকে আসার আহ্বান জানিয়েও কাজ হয়নি। হুমকি-ধমকি দিয়েছেন কম নয়। সবাইকে বাগে আনতে চেষ্টার শেষ ছিল না তার। কিন্তু এ বিষয়ে ক্লান্ত এখন তিনি। বয়সও ৯০ ছুই ছুই। ক্লান্ত হওয়াটাও স্বাভাবিক। নিজ পরামর্শকদের কারণে স্ত্রীর সঙ্গেও এক হয়ে পথ চলতে পারেনি প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ দূত। নেতাকর্মীদের সঙ্গে আপোস আপোস খেলে টিকে আছেন তিনি। দলের অবাধ্য নেতাদের বহিষ্কার করার কিছুদিন পরেই আবারও ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন। হয়ত উপায় নেই। একা একা নিরুপায় তিনি। স্ত্রীকে বাগে আনতে না পারায় এমপিরাও তার পাশে নেই। মহাসচিব হিসেবে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু থাকেন সার্বক্ষণিক। আরেক বাধ্যগত এমপি এমএ হান্নানও পাশে ছিলেন। তিনি এখন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শ্রীঘরে। হায়রে কপাল। অন্ধের ষষ্ঠীও গেল। সামলা ইসলামসহ আরও দুই একজন এমপি যোগাযোগ রাখেন এরশাদের সঙ্গে। কিন্তু উভয় গ্রুপেই তাদের যাতায়াত রয়েছে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তিন থেকে চারজন কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়া কেউ আসেন না। মাঠ পর্যায়ে কোন্দলের কারণে তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে শীর্ষ নেতাদের।

দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ওয়ার্ড পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তৃত। তাতে কি। রাজধানীর ১০০টি ওয়ার্ডের ২০টিতেও কমিটি নেই। যাও আছে তাও নামসর্বস্ব। থানা কমিটির চিত্রও একই। কেন্দ্রীয় কমিটি ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টাম-লী আছে কাগজে কলমে। বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্যরাও বিচ্ছিন্ন। জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু মহাসচিব হওয়ার পর এখন পর্যন্ত একটি প্রেসিডিয়াম বৈঠক ডাকা হয়নি। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিও নিস্তেজ। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসমূহের মধ্যে যুব সংহতি, মহিলা পার্টি, স্বেচ্ছাসেবক পার্টি, জাতীয় মৎসজীবী পার্টি, জাতীয় কৃষক পার্টি, জাতীয় ছাত্র সমাজ, জাতীয় শ্রমিক পার্টি, প্রাক্তন সৈনিক পার্টি, জাতীয় তাঁতী পার্টিসহ আরও কয়েকটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো এখন নামমাত্র টিকে আছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এসব সংগঠনের কোন তৎপরতা নেই। নেই কমিটিও।

জাপার একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, সামনের দিনগুলোতে জাপার সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে। একদিকে কেন্দ্রীয় বিরোধ। কয়েক ধারায় বিভক্ত দলের নেতারা। অন্যদিকে সাংগঠনিকভাবেও দিন দিন দুর্বল হচ্ছে দলটি। অনেক নেতা অন্য দলে যোগ দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া নেতাদের মূল্যায়ন হয় না। একটি সিন্ডিকেটের আবর্তে রাজনীতি করছেন এরশাদ। তাদের কারণে দলীয় প্রধানের কাছে কেউ ভিড়তে পারছেন না। সাক্ষাত করাও কঠিন। সর্বোপরি কেন্দ্রীয়ভাবে কোন কর্মসূচী নেই। ক্ষমতা ও রাজনীতির মাঠে আপোস আপোস খেলায় বিরোধীদলের ভূমিকা থেকে দূরে সরে গেছে দলটি। এই প্রেক্ষাপটে জাপার সকল বিভক্তি দূর করে একসঙ্গে এগিয়ে চলার পরামর্শ তাদের।

নিজেদের পছন্দ মতো বিভিন্ন জেলায় কমিটি করতে গিয়ে তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতাদের। হচ্ছে পাল্টাপাল্টি কমিটি। সম্প্রতি রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মেজর (অব) খালেদ আখতারের কমিটিকে চ্যলেঞ্জ করে পাল্টা কমিটি গঠন করা হয়। এই ঘটনার জের ধরে এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের নেতাদের পাল্টাপাল্টি দল থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। অভিযোগ আছে, অর্থের বিনিময়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে কথিত প্রভাবশালীদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। সিলেটেও দলের স্থানীয় এমপিকে বাদ দিয়ে কমিটি করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা তোপের মুখে পড়েন। শীর্ষ নেতাদের সামনেই দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

দলের সার্বিক কর্মকা- সম্পর্কে জানতে চাইলে জাপার যুগ্ম-মহাসচিব এ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা সম্মিলিতভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় ১১ অক্টোবর রংপুর বিভাগ প্রতিনিধি সম্মেলন, ১৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা দক্ষিণ, ২৬ অক্টোবর টাঙ্গাইল জেলা, ৩ নবেম্বর নাটোর, ১২ নবেম্বর কুমিল্লা উত্তর, ১৪ নবেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তরের সম্মেলনের দিন ঠিক হয়েছে। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানান তিনি। গেল বছরের জুন মাসে কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় সম্মেলনের তারিখ ঠিক ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি দিয়েছি। বাস্তবতা হলো এর আগের বিভিন্ন জেলা সম্মেলনের তারিখ ঠিক করা হলেও সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি।