২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আন্দোলন ছেড়ে বিএনপি এবার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে

  • শামিল হয়েছেন ড. ইউনূস, জাফরুল্লাহ চৌধুরী আর ফরহাদ মজ্হাররা

শরীফুল ইসলাম ॥ আন্দোলনে সাফল্য অর্জনের সম্ভাবনা না দেখে আবার কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডনে তার ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তাদের পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনার পর কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে দেশে-বিদেশে দলের কিছু নেতা অধিক সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তারা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

১৬ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডন সফরে যান। লন্ডনে অবস্থানকালে ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দলের ভবিষ্যত করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় তারা আপাতত আন্দোলনের পরিবর্তে আবার কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেন। এর পরই বিএনপির কিছু নেতা দেশে-বিদেশে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারে অধিক সক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

বর্তমানে দেশে অবস্থান করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান মোর্শেদ খান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান ও সাবিহউদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। আগে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলেও অসুস্থতার কারণে এখন পাড়ছেন না বলে জানা গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক বিদেশী কূটনীতিক ও বিভিন্ন দেশের সরকারী-বেসরকারী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে দলের জন্য সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. ইউনূস, বেসরকারী সংস্থা গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী ও উবিনিগের ফরহাদ মজহারসহ দেশের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিও বিএনপির পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদিআরব, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিএনপির কমিটিতে যারা আছেন তারাও প্রভাবশালী বিদেশী প্রতিনিধিদের সঙ্গে লবিং করে বিএনপির জন্য সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ কাজে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা যখন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করতে যান তখন তিনি নিজেই তাদের কাছে দলের ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই বিএনপি নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে শুরু করে। এতে তখন কিছুটা সফলও হয় দলটি। আর এ কারণেই কিছু প্রভাবশালী দেশ বিএনপির দাবি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে কথা বলে। একপর্যায়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকিয়ে দেবে বলে বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের কূটনীতিকদের আশ্বাসে নির্বাচন বর্জন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশল জোরদার করে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে রাখতে সক্ষম হয়।

নির্বাচন বর্জনের পর রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়ে আবারও কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে বিএনপির শীর্ষ নেতারা। কিন্তু কূটনীতিকরা বিএনপিকে আশার বাণী শোনানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। প্রতিটি দেশের কূটনীতিকই বিএনপিকে বলছেন সরকারী দলের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে সংলাপের চেষ্টা করা হলেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ৫ বছর মেয়াদ শেষে পরবর্তী যে নির্বাচন হবে তা নিয়ে সংলাপ হতে পারে। বার বার চেষ্টা করেও সরকারী দলের কাছ থেকে এ কথা শুনে বিএনপি আর এ পথে অগ্রসর হয়নি। আর জোটে জামায়াত থাকাসহ বিভিন্ন কারণ সে যাত্রায় বিএনপির কূটনৈতিক মিশনও ব্যর্থ হয়।

এ বছর ৬ জানুয়ারি থেকে বিএনপি আবার কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের কৌশল নেয়। কিন্তু দেশব্যাপী টানা ৯২ দিন অবরোধ, দফায় দফায় হরতাল এবং ব্যাপক নাশকতামূলক কর্মকা- চালিয়েও আন্দোলনে সফলতা অর্জন করতে পারেনি বিএনপি। এর পর সরকার বিএনপিকে কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণের কৌশল নেয়। রাজপথে কর্মসূচী পালনের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে বিএনপির প্রতি কঠোর নজরদারি রাখা হয়। এ পরিস্থিতিতে ৩ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েও ভোটের দিন দুপুরে নির্বাচন বর্জন করে তারা। এতে দলের অবস্থা আরও নাজুক হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীরা সরকারী দলে যোগদান করতে শুরু করে।

দলের নেতাকর্মীদের ধরে রাখতে সারাদেশে সর্বস্তরের কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন বিএনপি হাইকমান্ড। ৯ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্দেশে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ৭৫ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের চিঠি দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের সকল কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে পুনর্গঠনের কথা বলা হয়। তাই আন্দোলনের দিকে না গিয়ে বিএনপি এখন সাংগঠনিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে।

প্রসঙ্গত: এর আগে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পরও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ায় বিএনপি। সেইসঙ্গে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তৃণমূল পর্যায়ে দলের কমিটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কিন্তু দল গোছাতে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সারাদেশে জেলা-উপজেলাসহ বিভিন্ন স্তরের তৃণমূল কমিটি গঠন নিয়ে নেতাকর্মীরা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে। পরে ওই বছর জুন মাসে কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন জেলার আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেন দলের হাইকমান্ড। কিন্তু এসব কমিটিকে কেন্দ্র করে দলে মতবিরোধ বেড়ে যাওয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করতে পারেনি দলটি। তখন কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েও সুবিধা করতে পারেনি বিএনপি।

এদিকে শত চেষ্টা করেও প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে না পেরে নতুন উদ্যমে আবার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। লন্ডন থেকে তারেক রহমান এবং দেশে অবস্থানরত কিছু সিনিয়র নেতা এ তৎপরতায় জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে অগ্রগতি হলে খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরে গিয়ে সরকারী ও বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করতে চান। কিন্তু জামায়াতকে জোটে রাখায় এখন পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কোন সুযোগ পাচ্ছে না বিএনপি। এর আগে ২০১২ সালে (২৮ অক্টোবর থেকে ৩ নবেম্বর) ভারত সফরে গেলে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার কথা বলা হয়। কিন্তু খালেদা জিয়া সে পরামর্শ গ্রহণ না করায় তার প্রতি ভারতের বিভিন্ন মহল নাখোশ হয় বলে অভিজ্ঞমহল মনে করছেন। এ ছাড়া বিএনপির সঙ্গে জামায়াত থাকায় আরও ক’টি প্রভাবশালী দেশও নাখোশ হয়েছে। তাদের ধারণা বিএনপির সঙ্গে জামায়াত থাকাতেই আন্দোলনে বেশি নাশকতা হয়েছে।

জানা যায়, দেশে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকা-ের পর বিএনপির কিছু নেতা প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করছেন। বিএনপি নেতাদের ধারণা এ ২ হত্যাকা-ের কারণে বিদেশীরা সরকারের প্রতি নাখোশ হলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে। দলের সাধারণ নেতাকর্মীরাও এখন কূটনীতিকদের তৎপরতার দিকে নজর রাখছেন।

জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের দল বেশ ক’বার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। তখন বিদেশীদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হয়েছে। তাই দলের নেতারা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেই পারেন। আর দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে কূটনীতিকদের তৎপরতার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে বিদেশী কূটনীতিকরা যদি কোন পরামর্শ দেন তাতে দোষের কিছু নেই। কারণ, বিভিন্নভাবে আমাদের দেশ বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। তাই দেশের স্বার্থে বিদেশীদের পরামর্শ নেয়া যেতেই পারে।