২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

আমার আব্বা-আম্মা

(৭ অক্টোবরের পর)

আমার আব্বা তার বিয়ের বিষয়ে দুটি আপত্তি তোলেন এবং তার দুলাভাইকে চিঠির মারফত তা জানিয়ে দেন। সেই চিঠিগুলো পড়ার সুযোগ আমার হয় পঞ্চাশের দশকে। তার আপত্তি ছিল যে, আমার আম্মার বয়স খুব কম, তার বিয়ে ঠিক হয় মাত্র ১৩ বছর বয়সে। তার দ্বিতীয় আপত্তি ছিল গ্রামের অশিক্ষিত মেয়ে কি করে আমার আব্বার শিক্ষিত শহুরে পরিবারে খাপ খাওয়াবেন। তার দুটি আপত্তিই যে বাস্তবে টিকেনি তার প্রমাণ হলো আমার আম্মা ছিলেন আব্বার বিশাল পরিবারে সকলের প্রিয় ভাবি এবং একটি সফল বৃহৎ পরিবারের কা-ারি। তিনি লৌকিক পড়াশোনা মোটেই করেননি ঠিক; কিন্তু সিলেট ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’ ও ‘সাহিত্য পরিষদের’ গ্রন্থাগারের একজন উদগ্রীব পাঠক ছিলেন। আব্বা-আম্মা সুদীর্ঘ পঞ্চান্ন বছরের দাম্পত্য জীবনে খুবই সুখী ছিলেন বলে আমি ধারণা করি। এবং তারা ছিলেন চৌদ্দজন ছেলেমেয়ের গর্বিত পিতা-মাতা (তালিকা সংযোজনীতে দেখা যাবে)। শুধু একটি ভাই-ই জন্মের এক মাসের মধ্যে মারা যায়। বাকি সকলেই সুখী জীবনযাপন করেন ও করছেন। ঐ ভাইটি ছাড়া আমার বড় ভাই আবু আহমদ আবদুল মুহসি ৭৬ বছর বয়সে ও ছোট বোন ফাওজিয়া খাতুন ৩২ বছর বয়সে ইহধাম ত্যাগ করেন। বড় ভাইয়ের একটি মেয়ে ও একটি ছেলে আছে আর বোনের একটি ছেলে আছে।

আমার আম্মার পূর্ব পুরুষ সৈয়দ শাহ আলাউদ্দিন বাগদাদী হজরত শাহজালালের সঙ্গে সিলেটে আসেন ১৩০৩ সালে এবং তার সঙ্গে ছিলেন তার চার ছেলে। তাদের একজন সৈয়দ শামসুদ্দিন সৈয়দপুরে বসতি স্থাপন করেন। এই বংশের সৈয়দ আমিন ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে আতয়াজান তালুকের জমিদার হন। তার নাতি সৈয়দ আজমল আলী জমিদার হন ১৮৪২ সালে। তিনি খুব শৌখিন লোক ছিলেন এবং তিনি সারা ভারতবর্ষ ঘুরে বেড়াতেন। সিলেটের কাজীরবাজার ছিল তার এলাকা এবং সেখানে তার কুঠিও ছিল। তারই পৃষ্ঠপোষকতায় মুন্সিফ নাসিরউদ্দিন হায়দর ১৮৫৯ সালে ‘সুহেলে ইয়েমেন’ প্রকাশ করেন। তিনি সৈয়দপুরের শামসিয়া মাদ্রাসার প্রভূত উন্নতি সাধন করেন এবং তখন এটি তারই সম্পত্তি মিয়াবাজার এলাকায় অবস্থিত ছিল। ১৯১৪ সালে মাদ্রাসাটি তার বর্তমান ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়। দেওয়ান আজমল আলী সারা ভারত থেকে দুর্মূল্য সামগ্রী এনে চৌধুরীবাড়ি সাজান, যার মধ্যে ছিল একটি সোনার কলার ছড়ি এবং সোনার কলসি। সৈয়দ আজমল আলী চৌধুরী ১৮৮১ সালে নিঃসন্তান মৃত্যুবরণ করেন। তার ভ্রাতুষ্পুত্র সৈয়দ আশহর আলী চৌধুরী ছিলেন তার উত্তরাধিকারী এবং তিনি ছিলেন আমার নানার আব্বা। তিনিও শৌখিন ব্যক্তি ছিলেন এবং শিকারে ছিলেন সবিশেষ আগ্রহী। তার নিশানা ছিল খুব ভাল। তিনি বাজি রেখে আয়নায় তার টার্গেট ঠিক করে হাত পেছনে নিয়ে গুলেলবাঁশ ছুড়ে একজন মানুষ হত্যা করেন। সেই অপরাধে তার একনলা বন্দুক বাজেয়াপ্ত হয়। এই বন্দুকটি তিনি তার হবু নাতজামাইকে দান করেন তার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ১৯২৭ সালে। তার এই বন্দুকটি এখনও আমাদের পরিবারে সংরক্ষিত। আমার ভাই ড. মুবিন এটি দেখভাল করে। আশহর আলী সাহেবের মৃত্যুর কারণে আমার আম্মার বিয়ে এক বছর পিছিয়ে যায়।

আমার আম্মা সিলেট মহিলা মুসলিম লীগের প্রথম দিকের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং ১৯৪৫-৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তখন সভাপতি ছিলেন সিলেটের প্রখ্যাত মহিলা নেত্রী বেগম জোবেদা রহিম চৌধুরী। সিলেটের গণভোটের সময় আম্মা ও তার সহযোগীরা ঘরে ঘরে গিয়ে মুসলমান মহিলাদের সংগঠিত করেন। কংগ্রেসের সহযোগী সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্ররোচনা মোকাবেলার জন্য তখন মৌলানা সহুল আহমদ উসমানীর ফতোয়া মোকাবেলা করে তাকে কাজ করতে হয়েছে। সিলেটে নারী শিক্ষার প্রসারে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি সিলেট মহিলা কলেজের প্রথম দশকের শেষ ভাগ থেকে সারাজীবন কলেজটির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে যখন কলেজটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় তখন কলেজটির অস্তিত্ব রক্ষায় তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। কলেজের ছাত্রী সংগ্রহে তিনি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ান এবং ম্যাট্রিক পাস মুসলমান মেয়েদের কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। চালিবন্দর বালিকা বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তিনি দীর্ঘকাল জড়িত ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি সিলেট মহিলা সমিতির সভাপতি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু করে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রতিবাদে জোবেদা রহিম চৌধুরীসহ অন্যান্য মহিলার সঙ্গে তিনি আবদুর রব নিশতারের কাছে প্রতিবাদলিপি পেশ করেন। মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে তার বার্তা প্রেরণ করেন।