২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন, বিশ্বের জন্য এসডিজি গৃহীত

  • ড. আর এম দেবনাথ

নিবন্ধের শুরুতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। তিনি এক সঙ্গে দুই দুটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, নিজেকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছেন। এতে গৌরবান্বিত হয়েছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর নেতৃত্বের জন্য জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ-পুরস্কার ২০১৫’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পেয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে পেয়েছেন আরেকটি সম্মানজনক এ্যাওয়ার্ড- ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) আইসিটি সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট এ্যাওয়ার্ড-২০১৫। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক পুরস্কার, এ্যাওয়ার্ড, সম্মান ও উচ্চতম ডিগ্রীতে তিনি এ যাবত ভূষিত হয়েছেন মোট ২৮ বার। এটি একটি বিরল ঘটনা। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এত আন্তর্জাতিক পুরস্কার, পদক, এ্যাওয়ার্ড ও ডিগ্রীতে ভূষিত রাজনৈতিক নেতা বিশ্বে কতজন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবার জাতিসংঘে গেলেন শুধু পুরস্কার গ্রহণ করার জন্যই নয়, তিনি আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে অবদান রাখেন, আর সেটা হচ্ছে জাতিসংঘের ‘এসডিজি’ কর্মসূচীর সূচনা অধিবেশন। ‘এসডিজি’ মানে সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য। ২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ এটি গ্রহণ করে। এই বিরাট আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের নেতৃবৃন্দ। বলাবাহুল্য, ২০১৫ সাল হচ্ছে ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার’ শেষ বছর। নিশ্চয়ই সবার স্মরণে আছে আজ থেকে পনেরো বছর আগে জাতিসংঘ ‘এমডিজি’ (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল) নামে একটা বিশদ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। এবার করা হলো ‘এসডিজি’ যার মেয়াদ শেষ হবে ২০৩০ সালে। অর্থাৎ সারা বিশ্বের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা। ‘জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী’র (ইউএনডিপি) প্রশাসক হেলেন ক্লার্ক এই উপলক্ষে বলেছেন, বিশ্বের নেতৃবৃন্দ অভূতপূর্ব এক সুযোগ গ্রহণ করেছেন। তারা এ বছর বিশ্বের সকল মানুষের জন্য টেকসই ও ঝুঁকি মোকাবিলা সক্ষম একটা উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেন। আগেই বলেছি ‘এসডিজির’ প্রেক্ষাপট হচ্ছে ‘এমডিজি’। প্রথমটির বয়স ১৫ যা শেষ এ বছরেই। দ্বিতীয়টি এবার শুরু হয়ে শেষ হবে ২০৩০ সালে। আজ থেকে ১৫ বছর পূর্বে জাতিসংঘ সারা বিশ্বের জন্য যে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল তার কেন্দ্রে ছিল দারিদ্র্যবিমোচন। লক্ষ্য ছিল ক্ষুধামুক্তি, রোগমুক্তি ও লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ। ছিল নিরাপদ পানীয় জল প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা এবং পয়ঃব্যবস্থার নিশ্চয়তার লক্ষ্যমাত্রা। বাংলাদেশ এসব ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্বও সাফল্য কম পায়নি। তবে উল্লেখ করতেই হয় ‘এমডিজি’র কিছু লক্ষ্যমাত্রা অপূর্ণ রয়েই গেছে। এবার আশা করা হয়েছে সেইসব অপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রাও ‘এসডিজির’ মেয়াদকালে বাস্তবায়িত হবে।

‘এসডিজির’ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ১৭টি ক্ষেত্রের জন্য। এগুলো হচ্ছে : শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য ক্ষুধার্ত, সুস্বাস্থ্য ও জনকল্যাণ, গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা, লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ, নিরাপদ পানীয় জল ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর কাজ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্প উদ্ভাবন এবং অবকাঠামো নির্মাণ, বৈষম্য হ্রাস, টেকসই শহর এবং নগরবাসী, প্রয়োজনীয় ভোগ ও উৎপাদন, জলবায়ু রক্ষায় পদক্ষেপ, জলের নিচে বসবাস, ভূমিতে বসবাস, শান্তি, সুবিচার এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পারস্পরিক সহযোগিতা। সর্বমোট এই ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার পরে আর কিছু বাকি থাকে কী? মনে হয় না। কিন্তু পরিষ্কার বোঝা যায় ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়াই আগামী ১৫ বছরের লক্ষ্য এবং তা সারা বিশ্বের।

উল্লেখ্য, দারিদ্র্যবিমোচনের কথা সারা বিশ্বেই শোনা যাচ্ছে অনেকদিন থেকে। এটা বিগত ১৫ বছরের বিষয় নয়। এর আগে থেকেই বলাবলি হচ্ছে। আমাদের দেশে ‘এনজিও’র প্রসার এই সেøøাগানকে সামনে রেখেই। বহুদিন আগে থেকেই বলা হচ্ছিল শুধু সরকারী কর্মকা- দিয়ে দারিদ্র্যবিমোচন সম্ভব নয়। দারিদ্র্যবিমোচন করতে হলে ঋণের দরকার, ক্রেডিটের দরকার। শিক্ষার কথা, অন্যান্য প্রয়োজনের কথা কিন্তু তখন সেভাবে বলা হতো না। এই ঋণের প্রাধান্য দিয়েই আমাদের দেশে শুরু হয় দারিদ্র্যবিমোচনের কাজ। দারিদ্র্যবিমোচন মানেই কিন্তু ভিন্নার্থে ক্ষুধামুক্তি। আমার মনে আছে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের সেøাগানের কথা- ‘গরিবী হটাও’। ভারতীয়রা একে রসিকতা করে বলত ‘গরিব হটাও’ হচ্ছে ইন্দিরা গান্ধীর নীতি। এসব বেশ আগের কথা। আমাদের দেশে এভাবে বলা না হলেও দারিদ্র্যবিমোচনের কথা উঠলেই অনেকেই এই সেøøাগানকে সন্দেহের চোখে দেখত- বিশেষ করে ‘এনজিওগুলোর’ কা-কারখানা থেকে। এ এক ভিন্ন প্রসঙ্গ। এক পর্যায়ে সরকার দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচীতে উদ্যোগী হয়। বাজেট প্রণয়নের উদ্দেশ্যই করা হয় দারিদ্র্যবিমোচনকে সামনে রেখে। প্রায় সমস্ত বাজেট বরাদ্দেরই মূল কথা ছিল দারিদ্র্যবিমোচন। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের এবং তার আগের সরকারের। ক্ষুধামুক্তি ও দারিদ্র্যবিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার করা হয় কৃষিকে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে করা হয় অন্যতম লক্ষ্য। এর সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টি ছিল জড়ানো। সার্বাত্মক প্রচেষ্টার পর আমরা দেখতে পাচ্ছি দারিদ্র্য নিরসন ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি অসাধারণ। যেখানে প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ লোক ছিল দারিদ্র্য সীমার নিচে, সেই স্থলে তা আজ ২৫-৩০ শতাংশ। অবশ্য এর মধ্যে অর্ধেকই অতি দারিদ্র্য (এক্সট্রিমলি পুওর)। শতাংশের হিসাবে বিষয়টি সেভাবে পরিষ্কার হয় না। আমরা যদি দারিদ্র্য সীমার নিচের লোকের সংখ্যা শতকরা ২৫ শতাংশও ধরে নিই, তাহলে ১৬ কোটির মধ্যে ৪ কোটি লোক হয় দারিদ্র্য সীমার নিচের লোক। এটা কিন্তু বিশাল সংখ্যা। ১৯৪৭ সালে চার সাড়ে চার কোটি লোক নিয়েই কিন্তু ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ (বর্তমান বাংলাদেশ) যাত্রা শুরু। তার মানে ১৯৪৭ সালের পর ৬৮ বছর কেটে গেছে, কিন্তু এখনও এক পূর্ব পাকিস্তানের সমান সংখ্যক লোক এখনও দারিদ্র্য সীমার নিচে।

এভাবে দেখলে বিষয়টি খুবই আক্ষেপের হয়। আর যদি দারিদ্র্য সীমার হিসাবের কথায় আসি তাহলে এই আলোচনার কোন সীমা থাকবে না। দৈনিক সোয়া ডলার আয়ই যদি এই সীমা নির্ধারণের মাপকাঠি হয়, তাহলে টাকায় তা দাঁড়ায় মাত্র ১০০ টাকায়। এই গড়ের হিসাব বড়ই উৎপাতের হিসাব, আর অঙ্ক বড় ভেজাল অঙ্ক। একশত টাকার নিচে দৈনিক আয় হলে দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থান করবে লোকটি। একশত পাঁচ টাকা হলে তিনি হবেন দারিদ্র্য সীমার ওপরের লোক। তাই নয় কী? যদি তাই হয়, তাহলে এ প্রশ্ন তো উঠতেই পারে একশত টাকা, আর একশত পাঁচ টাকা দৈনিক রোজগারের মধ্যে গুণগত পার্থক্য কী? অতএব ওইসব কূটতর্কে গেলাম না। আমাদের অঙ্কের চেয়ে বাস্তবের দিকে নজর দিতে হবে বেশি। আমার ধারণা বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ রয়েছে। অতএব একটা কথা আমি বলব, দারিদ্র্যবিমোচন, শূন্য দারিদ্র্য, ক্ষুধামুক্তি যে নামেই আমরা ডাকি না কেন, এর মূলে রয়েছে আয়, রোজগার ভিন্নার্থে কর্মসংস্থান, চাকরির সুযোগ। কর্মসংস্থান করতে না পারলে দৈনিক আয় আসবে কোত্থেকে? দৈনিক আয় না থাকলে খাবার আসবে কোত্থেকে? অন্যান্য চাহিদার কথা বাদই দিলাম। অতএব পরিশেষে আমি একটা বিষয়ের প্রতিই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করব, আর তা হচ্ছে কর্মসংস্থান বা ভিন্নার্থে বেকারত্ব। বেকারত্বের খবর আমাদের ভাল নয়। ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে অবস্থার কী উন্নতি হয়েছে? না, উন্নতি তো হয়নি, বরং খারাপ হয়েছে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে এক শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মোতাবেক ১৫ বছর থেকে ২৪ বছর বয়স্ক তরুণদের মধ্যে ২০১০ সালে বেকার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৩ সালে তা বৃদ্ধি পায় ৯ দশমিক ২ শতাংশে। এদিকে বিবিএসের তথ্য মোতাবেক সংখ্যায় ২০১০ সালে মোট শ্রমশক্তি ছিল ১ কোটি ৩২ লাখ। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা হতে পারে দেড় কোটির মতো। এদিকে একটি কাগজে দেখলাম আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে যেসব দেশে বেকারত্ব বাড়ছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচীও একই বলছে। তাদের হিসাবে ১৯৯০-৯৫ সালে তরুণ বেকারের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ, ২০০৫-২০১০ সালে এই সংখ্যা পাঁচগুণ বেড়েছে। অর্থাৎ সকল হিসাবেই দেখা যাচ্ছে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। দেড় শতাংশ হারে লোকসংখ্যা বাড়লে প্রতিবছর শ্রমশক্তিতে যোগদান করবে ২৪ লাখ মানুষ। অতএব বোঝা যাচ্ছে সমস্যাটি কত বড়। অথচ কে না জানে এই বেকারত্ব সমস্যার সমাধানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ক্ষুধামুক্ত ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক, ঢাবি

নির্বাচিত সংবাদ