২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ মদিনার মর্যাদা

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

মদিনা শরীফ মক্কা মুকাররমা থেকে ২৯৬ মাইল উত্তরে অবস্থিত এক অতিপ্রাচীন নগরী। এটা অত্যন্ত পবিত্র নগরী। প্রাচীনকালে এর নাম ছিল ইয়াসরিব। টলেমীর ভূগোলে এই নগরীর উল্লেখ রয়েছে। ৬২২ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কা মুকাররমা থেকে হিজরত করে এখানে আসেন।

তাঁর আগমনে উল্লসিত ইয়াসরিববাসী তাঁদের নগরীর নামকরণ করেন মদিনাতুন নবী অর্থাৎ নবীর নগরী। আর তিনি এর নামকরণ করেন তায়বা ও তাবা। কুরআন মজীদে ইয়াসরিব ও মদিনার উল্লেখ রয়েছে। ঐতিহাসিক আস্ সামহূদী মদিনা শরীফের ৯৪টি নামের উল্লেখ করেছেনÑ যেমন তায়বা, তাবা, জাবিরা, মাহ্বুবা, মদিনাতুন্ নবী, মদিনাতুর রসুল, দারুল হিজরত।

মদিনা শরীফ আরব উপদ্বীপের হিজাজ প্রদেশের একটি ঐতিহাসিক জনপদ, সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ৬০০ মিটার উচ্চে অবস্থিত এই জনপদের উত্তরে রয়েছে উহূদ পর্বত এবং দক্ষিণে রয়েছে আয়ার পর্বত। আগে থেকেই এই জনপদের অধিবাসীগণ সহিষ্ণু, চরিত্রবান, অতিথিপরায়ণ এবং মিষ্টভাষী।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পরশে এসে মদিনা শ্রেষ্ঠত্বের মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। আমরা জানি ৬১০ খ্রিস্টাব্দে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম প্রথম ওহী লাভ করেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি ইসলাম প্রচার শুরু করেন। মক্কার কাফির-মুশরিক কুরাইশ নেতারা তাঁর এই প্রচারকার্যে বাধা সৃষ্টি করে। তবুও কিছু ভাগ্যবান ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। অত্যাচার ও নিপীড়নের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি নিজ জন্মভূমি ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। হজের মৌসুমে মক্কায় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হজ করতে বহু লোক আসতেন। তিনি অতিগোপনে তাঁদের নিকট ইসলামের দাওয়াত দিতেন। মদিনা থেকে আসা আওস ও খাজরাজ গোত্রের কিছু লোক অতিসঙ্গোপনে তাঁর সঙ্গে আকাবা নামক স্থানে মিলিত হলেন এবং তাঁর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং শপথ করলেন তিনি এবং তাঁর অনুসারীগণ তাঁদের দেশে গেলে তাঁরা তাঁকে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। ইতোমধ্যে মদিনায় হিজরত করার জন্য আল্লাহর নির্দেশ এলো। তিনি তাঁর অনুসারীগণকে একে একে মদিনায় হিজরত করতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহুকে সঙ্গে নিয়ে মদিনায় হিজরত করলেন। মূল শহরে প্রবেশের আগে তিনি মদিনার উপকণ্ঠে অবস্থিত কূবা নামক মহল্লায় অবস্থান করেন এবং এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা কূবা মসজিদ নামে পরিচিত। তিনি বলেছেন : এই মসজিদে দুই রাক’আত সালাত আদায় করলে একটা উমরার সওয়াব লাভ হবে।

তিনি মদিনায় হিজরত করেন ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার ২৪ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে। তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। মদিনায় এসে তিনি মসজিদুন নববী স্থাপন করেন। এই মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সব ধর্মের মানুষের সমন্বয়ে প্রণয়ন করেন মানব সভ্যতার ইতিহাসের প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র মদিনা সনদ। এই সনদে বলা হলো : মদিনা বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে সবাই মিলে তা প্রতিহত করবে, যার যার ধর্ম পালনে কোন বাধা থাকবে না, কেউ কারও ধর্ম বা জানমালে হস্তক্ষেপ করবে না, মদিনার সীমানার মধ্যে খুনোখুনী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হবে। ৪৭টি শর্তবিশিষ্ট সনদে মদিনাকে পবিত্র নগরী বলে ঘোষণা করা হয়।

মক্কার কাফির-মুশরিকরা ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য বার বার আক্রমণ করে। সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করা হয়, অতঃপর ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের রমাদান মাসে মক্কা জয় হয়। ঘোষিত হয় সত্য এসেছে, মিথ্যা দূর হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা দূর হয়। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ৯ জিলহজ বিদায় হজের ভাষণে তিনি বললেন : আজ আমার পায়ের তলায় আইয়ামে জাহিলিয়াতের সমস্ত শিরক, কুফর, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার দলিত-মথিত হলো। দীর্ঘ সেই ভাষণে তিনি বললেন : হে মানুষ! তোমাদের একের ধন-সম্পদ, মান-ইজ্জত এবং রক্ত অপরের নিকট আজকের এই দিনটির মতো, এই মাসটির মতো, এই জনপদের মতো অলঙ্ঘনীয় পবিত্র। তিনি বললেন : কোন অনারবের উপর কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন আরবের উপর কোন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন কালোর উপর কোনে সাদার শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোনো সাদার উপর কোনো কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সবাই আদম থেকে আর আদম মাটি থেকে। শ্রেষ্ঠত্বর মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া। এই ভাষণ শেষ হলে আল্লাহর ওহী নাযিল হয়। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : আজ তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং আমার নিয়ামত তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করলাম আর তোমাদের দীন ইসলামকে সানন্দে অনুমোদন দান করলাম (সূরা মায়িদা : আয়াত ৩)। তিনি হজ করে মদিনায় চলে এলেন। এর ৯০ দিন পর তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ বন্ধু আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। মসজিদুন্ নববীর পূর্ব পার্শ্বে লাগোয়া হযরত আয়িশা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হার হুজরা শরীফে তিনি শায়িত আছেন। তিনি হায়াতুন নবী। তিনি বলেছেন : যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করল তার জন্য আমার সুপারিশ করা ওয়াজিব হয়ে গেল। যে ব্যক্তি হজ করল অথচ আমার কবর যিয়ারত করল না সে আমাকে উপেক্ষা করল। যে ব্যক্তি আমার মউতের পর আমার কবর যিয়ারত করল সে যেন আমার জীবিতকালেই আমার যিয়ারত করল।

মদিনা শরীফ অতিশয় মর্যাদাপূর্ণ নগরী। এখানে রয়েছে মসজিদুন্ নববী। এই মসজিদে এক রাক’আত সালাত আদায় করলে ৫০ হাজার রাক’আত সালাতের সওয়াব পাওয়া যায়। এখানে রয়েছে জান্নাতুল বাকী, যেখানে রয়েছে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিবিগণের মাযার শরীফ। প্রায় ১০ হাজার সাহাবীর মাযার ও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের স্মৃতিধন্য অনেক নিদর্শন।

লেখক : পীরসাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা,

ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা), সাবেক পরিচালক,

ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ