২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প চরম বিপর্যয়ে

  • সুতার দাম বৃদ্ধি, কারিগর ও মহাজনদের মধ্যে লভ্যাংশের অসম বণ্টন

নিজস্ব সংবাদদাতা, টাঙ্গাইল ॥ সুতার দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, কারিগর ও মহাজনদের মধ্যে লভ্যাংশের অসম বণ্টন আর কারিগরের অভাবে তাঁত শিল্পের আগামী দিনগুলো নিয়ে চরম সংশয় দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছরে সুতার দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যসীমা হাতের নাগালের বাইরে চলে আসাতে চরম বিপর্যয়ে পড়েছে টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প। সুতার দাম কমার লেশমাত্র চিহ্ন নেই বরং রাতারাতি বেড়েই চলছে। সেতু, ছাইহাম, উত্তরা, সফটসিল্ক, কটন, জরি, রেয়ন, পাকুয়ানসহ সব ধরনের সুতার দাম তাঁত মালিকদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে তাঁত মালিকরা উচ্চ দামে সুতা ক্রয় করতে না পেরে অনেকেই তাঁত বন্ধ করে দিচ্ছে। অন্যদিকে হ্যান্ডলুম তাঁতের সংখ্যা দিনদিন কমে এখন পাওয়ারলুম তাঁত বসায় শ্রমিকরা আরও কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। তাঁত বন্ধ হওয়ায় তাঁতের কাজ করে যে সমস্ত শ্রমিক সংসার চালাতেন তারা দিনদিন বেকার হয়ে পড়ছেন।

জানা গেছে, বর্তমানে জরি ৪৫০ টাকা থেকে ৭শ’ টাকায়, পাকুয়ান ১৬শ’ থেকে ২৫শ’, ৩০ টাকা মুরা সুতার বর্তমান মূল্য ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ৪০ কাউন্টের ১১শ’ টাকার সুতা ২ হাজার টাকা, ছাইহাম ১৫শ’ থেকে ২৬শ’ টাকা। বিশ্ববাজারে সুতার দাম যত না বাড়ছে তার চেয়ে দ্বিগুণ বাড়ছে দেশীয় বাজারে। তুলার দামের চেয়ে সুতার দাম সঙ্গতি না থাকায় সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। স্পিনিং মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে বাড়াচ্ছে তাঁত শিল্পের প্রধান কাঁচামাল সুতার দাম। তুলার দামের সঙ্গে অযৌক্তিকভাবে সুতার দাম বেড়েই চলছে টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প বাজারে। সুতার মূল্যের নিয়ন্ত্রণহীন উর্ধগতির কারণে বহুমুখী রফতানি দ্রব্য হিসেবে টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প চরমভাবে মার খাচ্ছে।

আর মাত্র কয়েক দিন পরই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা উৎসব। এ উৎসবকে ঘিরে তাঁতের শাড়ির চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক তাঁত ঘরে এখনও তাঁতের কাজ বন্ধ রয়েছে। নেই তাঁতের সেই পুরনো খটখট শব্দ। গৃহিণীর হাতে নেই চড়কা। অনেক তাঁত মালিক জানান, সুতার দাম আকাশছোঁয়া হওয়াতে সুতা কিনতে পারছেন না তারা। পুঁজি সংগ্রহ আর তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে বাধ্য হয়ে সুতা কিনলেও বাজারে নিয়ে উচ্চ দামে উৎপাদিত কাপড় বিক্রি করতে না পেরে ক্ষতির হিসাব গুনতে হচ্ছে তাদের। শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, টাঙ্গাইল সদরের বাজিতপুর, করটিয়া, চারাবাড়ি, পোড়াবাড়ি, এনায়েতপুর, দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চন্ডী, কালিহাতীর বল্লা, রামপুরের তাঁত মালিকরা চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। উচ্চমূল্যে সুতা ক্রয় অতিরিক্ত শ্রমিক মজুরি, রং, প্যাকিং, সুতাসহ পরিবহন খরচ মিলিয়ে একটি কাপড় তৈরি করে বাজারে চড়া দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প শুধু দেশ থেকে নয়, বহির্বিশ্ব থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বয়ে আনছে। অথচ এই তাঁত শিল্প এখন ধ্বংসের মুখে।

সম্ভাবনাময় এ খাতকে বাঁচাতে সরকার কতটা ভূমিকা পালন করছে এ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অনেক তাঁতী এনজিও, স্থানীয় সমিতি থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরু করলেও আশা তাদের আশাই রয়ে যাচ্ছে। এনজিও ও সমিতির দেনা পরিশোধ করতে পারছে না তারা। এখনও যারা তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের পাশে কেউ আছে বা থাকবে কিনা, এটাও তাদের অজানা।

দেশের সবচেয়ে বৃহৎ তাঁতের শাড়ির হাট টাঙ্গাইলের করটিয়ায় তাঁতীরা তাদের উৎপাদিত কাপড় নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকলেও সাধারণ ক্রেতাদের কাছে তা ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে এসেছে। যেখানে গত ছয় মাস আগেও শুধু করটিয়ায় সাপ্তাহিক হাটে আমদানি রফতানি হতো প্রায় ৬ কোটি টাকা। সেখানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২ কোটি টাকায়। বছরজুড়ে টাঙ্গাইল শাড়ির যে ব্যবসা চলত বর্তমানে তা নেমে এসেছে শুধু ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবকেন্দ্রিক। সুতার দাম বাড়ছে, তবে মহাজনদের লাভের কমতি নেই।

সুতার দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শাড়ির দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন মহাজনেরা। অথচ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন সাধারণ তাঁতীরা। নিজের পুঁজি না থাকার কারণে পুঁজি সংগ্রহ করতে হয় মহাজনদের কাছ থেকে। তাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মহাজনদের ওপর নির্ভর করতে হয় শ্রমিক আর ক্ষুদ্র শাড়ি ব্যবসায়ীদের। যে কারণে লাভের বৃহৎ অংশই চলে যায় মহাজনদের হাতে। অন্যদিকে টাঙ্গাইল শাড়ি দেশীয় ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে আসায় মহাজন শ্রেণী ব্যবসায়ীরা বসে নেই। ভারতে টাঙ্গাইল শাড়ির কদর থাকায় অবৈধ পথে মহাজনরা পাচার করছে দেশীয় এ শাড়ি। আর এ পথেই আসছে ভারতীর সুতা। এতে মহাজনেরা গড়ছে প্রাসাদ আর সাধারণ ব্যবসায়ীরা এ শিল্প থেকে পড়ছে ছিটকে। সরকার বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্য ভ্যাট থেকেও। অনেক অসাধু ব্যবসায়ীরা আবার ভারত থেকে আনা কম মূল্যের শাড়ি টাঙ্গাইল শাড়ি হিসেবে চালানোর চেষ্টা করছেন। এতে ক্রেতারা টাঙ্গাইল শাড়ির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন।

ভ্যাট শব্দটা এড়িয়ে গেলেও ভারতের সঙ্গে শাড়ি ব্যবসার সম্পৃক্ততা নির্দিধায় স্বীকার করলেন টাঙ্গাইল তাঁত শিল্প সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক ও সাধারণ সম্পাদক নীলকমল বসাক। এ অবস্থায় সুতার দামসহ তাঁত শিল্পের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য কমিয়ে আনা এমনকি সরকারী ও বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থাগুলোর সুনজরই তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় বলে তারা জানান।