২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মন্দিরের ২৫ কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাত

  • পাবনায় সেবায়েতের যোগসাজশ

নিজস্ব সংবাদদাতা, পাবনা, ৮ অক্টোবর ॥ ফরিদপুর উপজেলার সুপ্রাচীন ডেমরা কালীমন্দিরের প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের সাত একর ভূসম্পত্তি আত্মসাত করেছে ভূমিদস্যুরা। কালীমন্দিরের কতিপয় অসাধু সেবায়েতের যোগসাজসে জাল দলিল তৈরিসহ বিভিন্ন কৌশলে মন্দিরের ভূসম্পত্তি জোরপূর্বক ভোগ দখল করছে বলে মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেছেন।

জানা গেছে, জেলার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা ইউনিয়নের ডেমরা বাজারের কালীমাতা বিগ্রহ মন্দিরের নামে সাত একর ২২ শতাংশ (প্রায় পৌনে ২২ বিঘা) জমি রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তি ডেমরার জমিদার রায় পরিবার কালীমাতা বিগ্রহ মন্দিরের নামে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য দান করেন। মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ ও পুজো-অর্চনার ব্যয় বহনের জন্য কালীমাতার নামে এই সম্পত্তি দান করা হয়। এজন্য রায় পরিবার থেকে সেবায়েত নিয়োগ দেয়া হয়। কালীমাতা ঠাকুরানী বিগ্রহ মন্দিরের ভূসম্পত্তির রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সিএস রেকর্ড সর্বসাধারণের ব্যবহার্য এসএ রেকর্ডে কালীমাতার নামে এবং আরএসএ কালীমাতার পক্ষে রায় পরিবারের উত্তরাধিকারীদের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। এ সুযোগে সেবায়েত ব্রজেন্দ্র কুমার রায়, নিরেন্দ্র নাথ রায় ও প্রভাত চন্দ্র রায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ডেমরা বাজারের জায়গা গোপনে স্থায়ী লিজ প্রদান করেন। লিজ গ্রহীতারা পাঁকা, আধা পাঁকা ঘর নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। তারা জাল দলিলপত্র তৈরি করে মন্দিরের জায়গা স্থায়ীভাবে দখল করে নিয়েছে বলে মন্দির কমিটি অভিযোগ করেছে। মন্দির কমিটির অভিযোগে জানা যায়, ডেমরা রায় পরিবারের সদস্য মন্দিরের সেবায়েত নিরেন্দ্র নাথ রায় ও প্রভাত চন্দ্র রায় আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে প্রায় ১৮Ñ১৯ বছর আগে কালীমন্দিরের পাঁচ একর ৭৬ শতাংশ জলাশয় ও আবাদি জমি ফরিদপুর উপজেলার পুঙ্গলী ইউনিয়নের দিঘলীয়া গ্রামের মঞ্জুরুল নাজিমের তালুকদার মাল্টিফার্মের নামে এককালীন তিন লাখ টাকা এবং বার্ষিক ১০ হাজার টাকা ইজারার বিনিময়ে ৯৯ বছরের জন্য লিজ প্রদান করেন। মঞ্জুরুল নাজিম তালুকদার মাল্টিফার্মের নামে মন্দিরের জায়গা দখলে নিয়ে মৎস্য ও কৃষি খামার গড়ে তোলেন। এ লিজ প্রদানে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন মতামত নেয়া হয়নি। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কালীমন্দির পরিচালনা ও পুজো-অর্চনা করার জন্য কমিটি গঠন করে। এ লিজ বাতিলের জন্য মন্দির কমিটির পক্ষে সন্তোষ কুমার কু-ু বাদী হয়ে পাবনা সাব-জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন। বিচারক লিজ বাতিলের আদেশ দেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে তালুকদার মাল্টিফার্মের পক্ষে মঞ্জুরুল নাজিম পাবনা জজ আদালতে আপীল মামলা দায়ের করেন। বিচারক নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে তালুকদার মাল্টিফার্ম হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে। হাইকোর্টের বিচারপতি নিম্ন আদালতের লিজ বাতিলের আদেশ বহাল রেখে রায় দেন। উচ্চ আদালতের রায়ের পরও তালুকদার মাল্টিফার্ম কালীমন্দিরের জায়গা দিচ্ছে না বলে মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পদক মনিন্দ্রনাথ সূত্রধর ওরফে তুফান মেম্বর অভিযোগ করেন।

এদিকে ফরিদপুর উপজেলার রতনপুর গ্রামের প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক, আবু সাইদ, নুরজাহান বেগম, রেজাউল করিম তালুকদার ফরিদপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেজিস্টার খন্দকার এ জলিলের যোগসাজশে জনৈক ব্রজেন্দ্র নাথ রায়কে মৃত নিরেন্দ্র নাথ রায়ের ছেলে সাজিয়ে কালীমাতা ঠাকুরানী বিগ্রহ মন্দিরের সাত একর ২২ শতাংশ জলাশয়, কৃষি জমি ও বাণিজ্যিক ভূমির মধ্যে দুই একর ৮৯ শতাংশ জলাশয় ও কৃষিজমি মাত্র ১৬ লাখ টাকায় ২০০৯ সালের ৪ মার্চ ২৪৯/০৯ নম্বর দলিল মূলে রেজিস্ট্রি করে নেয়। ব্রজেন্দ্র নাথ রায়ের পিতার নাম বলরাম নাথ রায় তিনি ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা।

নিরেন্দ্র নাথ রায় এক সময় ওই কালীমাতা মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন। সেই হিসেবে ডেমরা মৌজার ৩৯০ খতিয়ানের ৮১ এবং ৮২ দাগের পর্চায় কালীমাতা ঠাকুরানীর পক্ষে সেবাইত নিরেন্দ্রনাথ রায়ের নাম লেখা ছিল। কালীমাতা ঠাকুরানীর পক্ষের জায়গায় ফটোকপিতে ‘পক্ষে’ লেখা উঠিয়ে দিয়ে নিরেন্দ্র নাথ রায়কে মালিক দেখিয়ে এই জমি রেজিস্ট্রি করা হয়। পর্চা টেম্পারিং এবং ভুয়া মালিকের বিষয়টি মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে তৎকালীন সাব-রেজিস্টার খন্দকার এ জলিলকে অবহিত করা হয়। কিন্তু তিনি বিষয়টি আমলে না নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা উৎকোচের বিনিময়ে গোপনে দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন বলে মন্দির কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেছেন।