২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সুরের জাদুকর ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান

  • তৌফিক অপু

ছিপছিপে গড়নের মেয়েটি যখন ঝিলের পাড়ে এবং ফুলের বাগানে নেচে নেচে গাইছে ‘গুন গুনাগুন গান গাহিয়া নীল ভোমরা যায়’... তখন সিনেমা হলে বসে অনেকেই হয়তো সেই গানের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিলেন। কেউ কেউ হয়তো সেই মেয়েটিকে নিজের মনের নায়িকার সঙ্গে তুলনা করে কল্পোলোকে স্বপ্ন বুনছেন। কেউ বা গান শুনে শিস দিচ্ছেন আবার কেউ বা মনের অজান্তেই বাহ! বলে উঠে গানটির প্রশংসা করছেন। সত্যিকার অর্থেই একটি ভাল গানের প্রভাব নানাভাবে বিস্তৃত হয়। আর গানটি জনপ্রিয় হওয়ার কারনে গানের স্রষ্টাও প্রশংসিত হন। এমনই কালজয়ী অনেক গানের স্রষ্টা হলেন ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান। যিনি জীবনের পুরোটা সময় কাটিয়ে গ্রাম বাংলার মাটি ও মানুষের গান নিয়ে। আজও মুখে মুখে ফেরে ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া, কত যতেœ বানাইয়াছেন সাঁই... বন্ধু রঙ্গিলা রঙ্গিলারে, আমারে ছাড়িয়া বন্ধু কই গেলা রে..’।

বাংলার শাশ্বত লোকজ সংস্কৃতির ধারাকে মূলধন করে এই মহান সাধক কলম ও দোতারা হাতে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। বাংলার লোকজ বা পল্লী গানকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়। পল্লী গান বাংলার মানুষের চিরায়ত সঙ্গীত। এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য গ্রাম্য মানুষের একান্ত আপন ধন। এ গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য লোকমুখে শোনা গান। অর্থাৎ পুঁথিগত অনুশীলনের ধার না ধারলেও এর অনাবিল চলন আজও মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে। গানের বাণীগুলো মুখে মুখেই রচিত। তবে এ গানে রয়েছে আদ্যরস। কোন কৃত্রিমতার ছোঁয়া নেই। পল্লী গান তাই বাংলার মানুষের আপন সংস্কৃতি।

আর এ সংস্কৃতিকে ধারণ করে কিছু কিছু মানুষ নিজেদের অন্য এক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান তেমনি একজন। যিনি এই মৌলিক গানগুলোকে পুঁথিগত বিদ্যার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। গ্রামীণ এ গান দিয়েই কুড়িয়েছেন বিশ্ব দরবারের সুনাম।

বাংলা গানের আদি কথা

ঠিক কবে থেকে বাংলা গানের প্রচলন তার সঠিক ইতিহাস না থাকলেও বাংলাদেশের প্রাচীন সঙ্গীতের পরিচয় পাওয়া যায় পাল বংশের রাজত্বকালে। অষ্টম শতকের মধ্যভাগ থেকে দ্বাদশ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করে পাল বংশ। এ সময়ের পালাগান বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং লোকমুখে দ্রুত প্রসার ঘটতে থাকে। রাগ ও প্রবন্ধ শ্রেণীর সঙ্গীত এ সময়কার অন্যতম সংযোজন। এ ছাড়াও বহুকাল ধরেই বাংলা গানের আদি ভিত ধরা হয় স্তোত্র। দেব-দেবীর ম-পে ঠাকুর সুর করে যে মন্ত্র আওড়ান তাকেই স্তোত্র বলে। পাল বংশীয় সময়ে দেব-দেবীর পূজা অর্চনা বেশি ছিল বলে অধিকাংশ গানই মন্দিরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

একাদশ শতাব্দীতে চালুক্যরা বাংলাদেশ অভিযানে আসে। সেন রাজ বংশের পূর্ব পুরুষরাই হচ্ছে চালুক্য। এক সময় বাংলাদেশের শাসন সেন বংশের হাতে চলে যায়। সেনদের অনুরাগ ছিল সংস্কৃত চর্চার প্রতি। কিন্তু ভাষাগত সমস্যা এ দেশের মানুষকে সেই সঙ্গীত থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

বাংলাদেশের শেষ হিন্দু রাজা লক্ষণ সেনের সভাকবি জয়দেব রচিত গীত গোবিন্দ একটি প্রাচীন কাব্যগ্রন্থ। গীত গোবিন্দের অন্তর্ভুক্ত গানগুলোকে বলা হয় প্রবন্ধ শ্রেণীর সঙ্গীত। দশম শতাব্দী থেকে প্রবন্ধ সঙ্গীতের সঙ্গে চর্যাপদ বা চর্যা প্রবন্ধের প্রচলন ছিল। জয়দেবের গান থেকে বাংলাদেশে প্রবন্ধ সঙ্গীত বিস্তার লাভ করে। চর্যাকে তাই বাংলাদেশের প্রাচীনতম সঙ্গীত বলে মনে করা হয়। চর্যা এক ধরনের যোগী সম্প্রদায়ের গীত। চর্যায় রাগের উল্লেখ আছে। এ কারণে চর্যা সঙ্গীতে রাগের প্রভাব লক্ষণীয়।

১২০১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির আগমন ঘটে এবং মুসলিম শাসনের সূত্রপাত। আর বাংলাদেশের মধ্যযুগের ইতিহাস এবং সঙ্গীতের নতুন ধারার সূচনা ঘটে এ সময় থেকে। যে সঙ্গীত আগে ছিল শুধুমাত্র দেব-দেবীর আরাধনায় নিয়োজিত সে সঙ্গীত মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে সহজ, সরল ও সাবলীল রূপ ধারণ করল। ছড়িয়ে পড়ল প্রতিটি আনাচে-কানাচে যা আগে ছিল অকল্পনীয়। কারণ তখন তা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির নিকট সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মুসলমানদের কাছে সঙ্গীতের রূপ ছিল বাস্তবধর্মী এবং জাগতিক আনন্দের উৎস। মূলত এখান থেকেই সঙ্গীতের নবযুগ সূচিত হয়।

প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে দুই ধরনের সঙ্গীত প্রচলিত রয়েছে। (১) মার্গ সঙ্গীত (২) দেশী সঙ্গীত। মূলত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতই মার্গ সঙ্গীতের অনুসারী। বাংলা সঙ্গীত প্রধানত দেশী সঙ্গীতের আদর্শেই রচিত।

বাংলা গানের এ পরিক্রমায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হতে থাকে লোকসঙ্গীত। গ্রামীণ পটভূমির বিরহ-ব্যথা, হাসি কান্নাই এর মূল উপজীব্য। মূলত তিনটি উপাদান (গ্রাম্য জীবন, প্রকৃতি ও পল্লী মানুষের মনের কথা) নিয়ে রচিত সঙ্গীতই হচ্ছে পল্লী সঙ্গীত। তবে ঠিক কবে থেকে এ গানের উদ্ভব তা আজ পর্যন্ত সঠিকভাবে নির্ণীত হয়নি।

শৈশবের মোমতাজ আলী খান

সকালের সূর্যই নাকি বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে। ঠিক তেমনি মোমতাজ আলী খান শৈশবেই সঙ্গীতের সাধক হবার পথে হেঁটেছেন। ১৯১৫ সালের ১ আগস্ট মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে জন্ম নেয় এই গুণী সাধকের গানের সঙ্গে পরিচয় ঘটে বাবার কেনা গ্রামোফোনে গান শুনে। সেখান থেকেই মূলত গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ক্লাম সেভেনে পড়াকালীন অবস্থাতেই গান শেখার জন্য পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানে গিয়ে পদ্মভূষণ উপাধিপ্রাপ্ত ওস্তাদ নেসার হোসেন খানের কাছে পাঁচ বছর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ওপর তালিম নেন। এর পাশাপাশি ওস্তাদ জমির উদ্দিন কাছে খেয়াল, ঠুমরি ও গজলের ওপর তিন বছরের তালিম গ্রহণ করেন। সে সময়ই তার তাল লয়ের ওপর দক্ষতা এবং গায়কি সবার নজর কাড়ে। অনেক ছাত্র ছাত্রীর ভিড়ে তিনি হয়ে ওঠেন অনন্য। আরও বেশি নৈকট্য লাভ করেন গুরুদের। আর সুয়োগে সঙ্গীতের নানা চলনের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। যা তাঁর জীবনের পাথেয় হয়ে থাকে। সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগী হওয়া এবং সে পথেই নিজেকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার পণ শৈশবেই ধারণ করেছিলেন। যে কারণে বাংলা সঙ্গীত এমন একজন সাধকের সন্ধান পেয়েছে। যে সাধক শুধু অকাতরে দিয়েই গেছে কোন প্রাপ্তির হিসেব ছাড়াই।

সঙ্গীতে পথচলা

প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরপরই মোমতাজ আলী খান বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। যে কারণে তাঁর আর ডিগ্রী পরীক্ষায় দেয়া হয়নি। তবে এ সময়ে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি লোকজ গানের প্রতিও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। শুরু হয়ে যায় কলম আর দোতরা হাতে নিয়ে লোকজ আয়ত্তের কাজ। গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গান ও সুর খুব অল্প সময়ের মধ্যে আয়ত্তে চলে আসে। এরই মধ্যে তিনি সান্নিধ্য লাভ করেন বিখ্যাত ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর। খুব দ্রুত তিনি ওস্তাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। এই ওস্তাদের সহায়তায় মোমতাজ আলী খান কলকাতার সং পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৩২ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি হতে ‘ওরে শ্যাম কেলে সোনা, তোমায় বারে বারে করি মানা’ এবং ‘আমি যমুনাতে যাই বন্ধু, তোমার সনে দেখা না পাই’ এ গান দুটি রেকর্ড করান। গান দুটি প্রকাশিত হবার পরপরই ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। আর এ গানদুটিই তাকে তারকা খ্যাতি এনে দেয়। এর পর থেকে আর পিছু তাকাতে হয়নি গুণী এই শিল্পীর। পরের বছরই অভিযাত্রী ছায়াছবিতে কণ্ঠ দেন তিনি। এরপর একে একে মধুচন্দ্রিমা, অশ্রুদিশারী, কলংক ইত্যাদি ছবিতে কণ্ঠ দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সে বছরই কলকাতা বেতারে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

১৯৩৪ সাল তাঁর জীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। সে বছর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে শান্তি নিকেতন যান। পরিচয় পর্বের পর কবিগুরু তার কাছ থেকে ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, দেহতত্ত্ব, বিচ্ছেদী প্রভৃতি গান শুনে মুগ্ধ হন। কবি গুরু তার এ চর্চা অব্যাহত রাখার অভিপ্রায় জানান। একই বছরে কলকাতা বেতারে গান রেকর্ডিংয়ের সময় সান্নিধ্য পান কে মল্লিকের এবং এই কে মল্লিকের মাধ্যমেই পরিচয় ঘটে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। মোমতাজ আলী খানের গানে মুগ্ধ হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম তাকে দিয়ে দুটি ইসলামী গান রেকর্ড করান। অল্প সময়ের মধ্যে কাজী নজরুলে প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন এবং তার সফর সঙ্গী হয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন।

১৯৩৫ সালে নিজের দক্ষতা, ধৈর্য এবং সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে শিষ্যত্ব লাভ করেন উপমহাদেশের বিখ্যাত সরোদ বাদক ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর। টানা দু’বছর তিনি তার কাছে সরোদের ওপর তালিম নেন। ১৯৩৭ সালে সং পাবলিসিটির চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কলকাতা বেতারে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৩ সালে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের একমাত্র মহিলা বাদক শিল্পী কাজল খানের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। কাজল খান ছিলেন ওস্তাদ ফুলঝুরি খানের ছাত্রী।

একাগ্রে অনুশীলনের ফলে তার প্রতিভা ও খ্যাতি দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করে। নিজেকে সহজেই একজন সঙ্গীত সাধক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। সং পাবলিসিটির এক অনুষ্ঠানে মোমতাজ আলী খানের কণ্ঠে ‘আমার বন্ধুরে আগে বলিস সজনী’ গানটি শুনে পল্লী কবি জসিমউদ্দীনও তার প্রতি আকৃষ্ট হন। সেই থেকে দু’জনে একসঙ্গে কাজ করে গেছেন এবং বহু কালজয়ী গান সৃষ্টি করেছেন। মোমতাজ আলী খান কবি জসীমউদ্দীনের বহু গানের সুর স্রষ্টা। বিশেষত পল্লী কবির লেখা মোমতাজ আলীর সুর করা এবং শচীন দেব বর্মনের গাওয়া গান দুটি আজও বাংলা গানের জগতে ইতিহাস হয়ে আছে। গান দুটি হচ্ছে, ‘বন্ধু রঙ্গিলা রঙ্গিলারে, আমারে ছাড়িয়া বন্ধু কই গেলা রে.. এবং এই যে দুনিয়া, কিসেরও লাগিয়া’।

১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বেতারের নিজস্ব শিল্পী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে তিনি সাউথ ইস্ট এশিয়ান মিউজিক কনটেস্টে প্রথম স্থান অর্জন করে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনেন। ১৯৬৫ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে পিআইএ আর্টস একাডেমিতে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে নিযুক্ত হন।

মুক্তি সৈনিক

দেশ মাতৃকার প্রতি টান ও শ্রদ্ধা যার নেই সে হয়তো মানুষের কাতারে পড়ে না এবং তাকে দিয়ে কখনই দেশের সেবা করানো যায় না। আর একজন মানুষ যখন তার সৃষ্টিতে অনন্য হয়ে ওঠেন তখন নেপথ্যে কিন্তু দেশ প্রেমই কাজ করে যায়। যার ব্যত্যয় ঘটেনি মোমতাজ আলী খানের ক্ষেত্রে। ১৯৭১ সালে মার্চ মাসের ২০ তারিখে তিনি ছুটি না নিয়েই করাচী থেকে গোপনে ঢাকায় চলে আসেন। এর পরপরই বেঁধে যায় মুক্তিযুদ্ধ। এ সময়েও বসে ছিলেন না তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে এবং হায়নার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে তিনি লিখেছেন বহু উদ্দীপনামূলক গান। তার রচিত ‘বাংলা মায়ের রাখাল ছেলে বাঁশী দিল টান’, বাংলাদেশের মাটি ওগো তুমি আমার জন্মস্মৃতিসহ বহু গান রণাঙ্গনে তখন অস্ত্রের মতই বেজে উঠতো। দেশ স্বাধীন হবার পর ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনে লোকসঙ্গীত বিভাগ খোলা হলে তিনি সে বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

স্বাধীনতা পরবর্তী গানের ধারা এবং পিলু মোমতাজ প্রসঙ্গ: দেশ স্বাধীন হবার পর সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হতে লাগল। যার ছোঁয়া বাংলা গানেও লেগেছিল। চিরাচরিত গানের প্যাটার্ন ভেঙ্গে নতুন নতুন গানের জোয়ার আসতে থাকে। আর এ নতুনের পালে হাওয়া লাগে খোদ মোমতাজ আলী খানের মেয়ে পিলু মোমতাজের হাত ধরে। তিনি এদেশে পপসঙ্গীতের আবির্ভাব ঘটান। তার সমসাময়িক ফেরদৌস ওয়াহিদ, আজম খান, ফিরোজ সাই, ফকির আলমগীর একই পথের অভিযাত্রী। যদিও এ নিয়ে সে সময় অনেক মতবাদ এবং প্রতিবাদ পর্যন্ত হয়েছিল কিন্তু সে সব আর ধোপে টিকেনি। তরুণ প্রজন্ম খুব সহজেই গানগুলো লুফে নিয়েছিল। ফোক গানগুলোর মডার্ন ভার্সন সে সময়ে বাংলা গানে অন্যরকম এক আভা ছড়িয়েছিল। ওস্তাদ মোমতাজ আলী খানে ছয় মেয়েই সঙ্গীতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তার মধ্যে পিলু মোমতাজ ছিলেন পপ ঘরানায় এগিয়ে।

গীতিকার সুরকার

পাকিস্তান আমল থেকেই ছায়াছবিতে গীতিকার, সুরকার, গায়ক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন। তবে সব কিছু ছাপিয়ে তার পাগল করা কথা ও সুর সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছায়াছবিগুলো হচ্ছে, সাত ভাই চম্পা, বেদের মেয়ে, আকাশ আর মাটি, অরুন বরুন কিরন মালা, রূপবান, জোয়ার ভাটা, যে নদী মরুর পথে হারিয়েছে ধারা, ভাওয়াল সন্নাসী ইত্যাদি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যেসব ছবি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রেমীদের কাছে অমর হয়ে আছে সেগুলো হচ্ছে, দয়াল মুর্শিদ, সুজন সখি, একমুঠো ভাত, নিমাই সন্নাসী, লালন ফকির ইত্যাদি। তার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন, আবদুল আলীম, আব্বাস উদ্দীন, লায়লা আরজুমান্দ বানু, নীনা হামিদ, নিলুফার ইয়াসমিন, মিনা বড়ুয়া, আবদুল লতিফ, মাহবুবা রহমানসহ অনেকেই। এছাড়া ১৯৬০ সালে অধ্যাপক মনসুর উদ্দীনের অনুরোধে তিনি লালনের বহু গানের সুর করে নিজে রেকর্ড করেন। লালনের গান ছাড়াও পাঞ্জু শাহ, পাগলা কানাই, ভবা পাগলা, কানু শাহ, রাধরমনসহ বহু গীতকবির গান। যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। বাংলার লোকজ সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করার পেছনে ওস্তাদ মোমতাজ আলী খানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তিনি যা রেখে গেছেন সেসব কিছু আমাদের সম্পদ হয়ে রয়েছে। এ সম্পদের নিবিড় পরিচর্যা করা আমাদের দায়িত্ব।

সৃজনশীলতার পদক

সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৭ সালে গীতি কবি সংসদ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮০ সালে লাভ করেন একুশে পদক। ১৯৮৬ সালে কালু শাহ পদকে ভূষিত হন। এছাড়াও বিভিন্ন সময় তিনি যে সকল সম্মাননা পান তা হলো জাতীয় রবীন্দ্র পরিষদ পদক, লালন একাডেমী পদক, নজরুল একাডেমি পদক, মানিকগঞ্জ সাহিত্য ও সঙ্গীত একাডেমি পদক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রেডিও টেলিভিশনের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে ছিলেন। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গীত পরীক্ষার অন্যতম পরীক্ষক ছিলেন।

লোক সঙ্গীতচর্চা এবং তা লালন করে সারাটি জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন এই কীর্তিমান পুরুষ। যার ফলে বাংলা লোকসঙ্গীত আরও বেশি সমৃদ্ধশালী হয়েছে। নতুন প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন হারিয়ে যাওয়া বহু লোক সঙ্গীত। ঝিনুক থেকে মুক্তা আহরণ করেছেন তিনি। আজ সেই মুত্তার আভা আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের উচিত ওস্তাদ মোমতাজ আলী খানের এই সুদীর্ঘ সাধনার যথাযথ মূল্যায়ন করা। তার রেখে যাওয়া নির্দেশনার পথ ধরেই লোক সঙ্গীতচর্চা করে যাওয়া। ১৯৯০ সালের ৩১ আগস্ট এই সঙ্গীত সাধক মৃত্যুবরণ করেন। তবে তিনি আজও তার সৃষ্ট কর্মের জন্য আমাদের মাঝে অমর হয়ে আছেন। তাঁর প্রতি রইল সশ্রদ্ধ শ্রদ্ধা।