১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বৈশাখী পূর্ণিমায় সমুদ্র সৈকতে

মো. সাইফুল আলম

কাপ্তাইয়ের প্রকৌশল একাডেমিতে ট্রেনিং করতে এসে ট্রেনিংয়ের মধ্যবর্তী সময়ে পেলাম বৌদ্ধ পূর্ণিমার সরকারী ছুটি। অবসরকে কাজে লাগানোর জন্যই ট্রেনিংয়ে আসা সহকর্মীদের নিয়ে ঠিক করলাম এবার বৈশাখী পূর্ণিমা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে উপভোগ করব। কথামতো সে দিন ভোর ৫টায় কাপ্তাই থেকে মাইক্রোবাসে ৬ জন ভ্রমণ সঙ্গীসহ চড়ে বসলাম। রুট নির্ধারণ হলো কাপ্তাই-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আবার ফিরতি পথে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-কাপ্তাই। কাপ্তাইয়ের ¯িœগ্ধ পাহাড়ী পথের সৌন্দর্য দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। চট্টগ্রামে এসে প্রাতঃরাশ সেরে নিলাম। এবার পথ চলা কক্সবাজারের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর চলে এলাম গহীন বনের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া পথে। সাইনবোর্ডে লেখা দেখলাম ‘চুন্তী অভয়ারণ্য’। মসৃণ পিচঢালা আঁকাবাঁকা রাস্তার দু’ধারে নজরকাড়া বন্য প্রকৃতি দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। একইভাবে পার করলাম ‘ফাঁসিয়াখালী’। সকাল ১১ টায় কক্সবাজার পাউবো রেস্ট হাউসে পৌঁছেই অস্থির হয়ে গেলাম, কখন সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ব। প্রচ- গরম আর দেরি সইছে না। চলে এলাম সৈকতে। পূর্ণিমার জো তার সঙ্গে গত দিনের সাগরে ৩ নং বিপদ সংকেত, তাই সমুদ্র কিছুটা উত্তাল। অসময় বলে পর্যটকদের উপস্থিতি কম, সাবধানতা অবলম্বন করে নেমে গেলাম সমুদ্র ¯œানে। প্রায় দুই ঘণ্টা নোলা পানিতে দাপাদাপি করে ক্লান্ত দেহে রেস্ট হাউসে ফিরে ফ্রেস হয়ে ‘পৌউষী’-তে মধ্যহ্নভোজ সেরে নিলাম।

শুনেছি, ইনানী বীচ থেকে সূর্যাস্ত দেখার মজাই নাকি আলাদা। তবে আর দেরি কেন? আমাদের গাড়ি দূরন্ত বেগে ছুটে চললো মেরিন ড্রাইভ দিয়ে। ডানদিকে সাগরের বেলাভূমিতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের গর্জন আর বামে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু নিচু পাহাড়ের সারি আমাদের সাথী হয়ে চলল। এসে নামলাম হিমছড়িতে, অনেক সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে উঠে এলাম উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়। তাকালাম দিগন্ত জোড়া সমুদ্রের পানে। উপভোগ করলাম এর অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যকে। মনে হলো আমরা যেন আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ কোন উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ভারত মহাসাগরকে দেখছি।

দ্রুত সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাই সময়ের সঙ্গে তাল রেখে আবার ছুটে চলা। সময় নষ্ট না করে গাড়ি থেকে নেমেই দৌঁড়ে ইনানী বীচে এলাম। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ ১২০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান ইনানী বীচ। প্রবাল গঠিত এই বিস্তীর্ণ পাথুরে সৈকত প্রকৃতির এক নৈসর্গিক লীলাভূমি। সমুদ্র থেকে ভেসে এসে এখানকার বেলাভূমিতে জমা হয়েছে প্রচুর প্রবাল পাথর।

সাগরের ঢেউগুলো প্রবালের গায়ে আঘাত লেগে আমাদের পায়ের কাছে আছড়ে পড়ছে। স্বচ্ছ জলের তলায় দেখতে পেলাম বালুর স্তর। এখানকার বিস্তীর্ণ বালুকাবেলায় ছুটে বেড়াচ্ছে হাজারো লাল কাঁকড়া। দেখতে দেখতে স্বল্প সময়ের মধ্যে লাল টুকটুকে সূর্যটা সীমাহীন দূরে নীল সাগরে ধীরে ধীরে ডুবে গেল। অনেকক্ষণ চেয়ে রইলাম তার চলে যাওয়া পথের পানে। পশ্চিম আকাশ রঙিন হলো রক্তিম আভায়। ফিরে যাওয়ার জন্য পিছু ফিরলাম, পুবের আকাশে ভরা চাঁদ কখন যে এত উপরে উঠে এলো টের পাইনি।

নৈশভোজের জন্য চলে এলাম লাবণী পয়েন্টসংলগ্ন ‘হান্ডি’ রেস্টুরেন্টে, স্বাদ নিলাম হায়দ্রাবাদী বিরানীর। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার এলাম সাগরের পাড়ে। স্বল্প সংখ্যক পর্যটক আর আমরা দাঁড়িয়ে আছি নিঃশব্দে অসীম জলরাশির পানে চেয়ে। চাঁদ ঠিক মধ্য গগনে, চারদিকে জোৎস্নার বন্যা। বিশাল বিশাল সাদা শুভ্র ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে আমাদের নগ্ন পায়ে। কানে ভেসে আসছে সাগরের গর্জন, বইছে মৃদুমন্দ বাতাস। এভাবেই কেটে গেল কিছুক্ষণ। এবার ফেরার তাগাদা অনুভব করলাম।