২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অনন্যা নারীদের স্বপ্নের আঙ্গিনা

দেখতে দেখতে ‘পাক্ষিক অনন্যা’ ২৭ বছর অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে অনন্যা নিছক কোন রঙ্গিন কভারে মোড়ানো কোন পত্রিকা ছিল না। এর প্রকাশনার পাশাপাশি অনন্যার ব্যানারে নিয়মিত বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক ইস্যু নিয়ে হয়েছে সেমিনার ও ওয়ার্কশপ। আরও হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতিক, সামাজিক কর্মকা-। যা নারীদের রঙ্গিন কাগজের মোড়কে আবদ্ধ রেখে শুধু শব্দ দিয়েই প্রতিবাদ জানায়নি, সেই সঙ্গে নারীর মূল্যায়ন, প্রতিষ্ঠা, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে করে চলেছে নানামুখী কর্মকা-। এর মধ্যে দুটি বিষয় সর্বমহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। যেমন, প্রতি বছর একজন নারী সাহিত্যিককে পুরস্কার প্রদান এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা শীর্ষ দশ নারীকে ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করা। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় নানা প্রতিকূলতার পরও এই পুরস্কার প্রদানে কোন ছেদ পড়েনি। এটাই অনন্যার সবচেয়ে বড় সার্থকতা ও উচ্চমার্গের অর্জন।

এই শীর্ষ দশ নারী, যাদের অনেকের কাজের পরিচিতি লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায় বা আলোচনায় আসে না, অনন্যা তাদের শীর্ষ দশ পুরস্কারে ভূষিত করে শুধু তাদের সম্মানিতই করেনি, সেই সঙ্গে তাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে এবং অনেক নারী সেই পুরস্কারপ্রাপ্তদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। শীর্ষ দশ পুরস্কার প্রদানের বিষয়টির মূল্যায়ন করেন অনন্যা সাহিত্যে প্রথম পুরস্কার পওয়া নারী, দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তিনি বলেন, ‘অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার আমার কাছে নারীদের কাজের বড় ধরনের মূল্যায়ন বলে মনে হয়। যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে তাদের সামনে এনে অন্যদের কাছে পরিচিত করার একটি বিরাট বড় মাধ্যম। একই সঙ্গে এই পুরস্কার একটি সম্মানের প্রতীক। যারা তাদের কাজের ক্ষেত্রে পুরস্কৃত হন তাদের কাজের এবং যারা কাজ করেন তাদের কাছে দৃষ্টান্তস্বরূপ। বিশেষ করে সেই সব তরুণীর কাছে, যারা নিজেদের কার্য ক্ষেত্রটি নির্বাচন করতে শুরু করেছেন। এভাবে এই পুরস্কার আমার কাছে গৌরবের ও মর্যাদার।

অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার পাওয়া আরও একজন নারী ক্রাফট প্রমোটার, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের কর্ণধার ও বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মুনিরা ইমদাদ বলেন, ‘অনন্যার এই উদ্যোগ একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। নিজের কর্মক্ষেত্রে বিচরণ করার পথে যখন এই ধরনের একটি পুরস্কার পাওয়া যায়, তখন নিজের মধ্যে একটা আত্মতৃপ্তি আসে। তখন একজন নারীর মর্যাদা অনেক বেড়ে যায়। মনে হয় সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটা অনেক প্রশস্ত হয়েছে। শুধু তাই নয় অনন্যা সম্পাদক সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে যে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পুরস্কারটি দিচ্ছেন, তা এক অনন্য দৃষ্টান্ত বলে আমি মনে করি’।

যারা আগ্রহ নিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন তেমনে একজন নারী রীমা জুলফিকার। তিনি গৃহসুখন নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন প্রায় ৩০ বছর ধরে। এখান থেকে প্রায় ৪০ হাজার নারী রান্না, হস্তশিল্প, সেলাই, ফ্যাশন ডিজাইনিং ও বিউটিফিকেশনসহ আর বেশকিছু বিষয় প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিয়েছেন। তিনি শীর্ষ দশ পুরস্কারের বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনেন। তিনি বলেন, ‘চলার পথে একটি পুরস্কার ও প্রেরণা একজন নারীর জীবন পাল্টে দিতে পারে। অনন্যা কর্তৃপক্ষ সার্চলাইটের মতো নারীদের ওপর যে আলো ফেলে, তা দেখে অন্যান্য নারী, তরুণীরা অনুপ্রাণিত হয়। অনন্যা শুধু দেশের মহিলা বিষয়ক একটি শীর্ষ পত্রিকা নয়, এটি হলো নারীদের স্বপ্নের আঙ্গিনা। এই আঙ্গিনায় বিচরণ করতে পারাটা অবশ্যই আনন্দের’।

অবশ্য এটা বলার অবকাশ রাখে না যে, দেশে যখন মৌলবাদীরা সমাজের অগ্রগতির গলা টিপে ধরতে চাইছিল, তখন অন্যান্য লেখনী ও নারীদের স্বপ্নের আঙ্গিনায় বিচরণের যে অবাধ ক্ষেত্র তৈরি করেছে, তাতে দেশে নারীরা আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশ শাসনের ক্ষেত্রেও তারা যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছে। তবে অনন্যার কর্মকা- অনগ্রসর গ্রামগুলোতে পৌঁছে দিতে নতুন কিছু উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে মনে করেন অনেক মুক্তমনা ব্যক্তি।

‘পাক্ষিক অনন্যার’ পথচলার ২৭ বছর উদযাপন উপলক্ষে অনন্যা ‘শীর্ষ দশ সম্মাননা’ দুই দশক পার করল। গত ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘অনন্যা শীর্ষ দশ ২০১৪’ প্রাপ্তদের হাতে সম্মাননা তুলে দেয় পাক্ষিক অনন্যা। জমকালো অনুষ্ঠানের শুরুতে অনন্যা শীর্ষদশ নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন ২৭ বছরে অনন্যার পথচলার নানা দিক তুলে ধরে বলেন, নারী অনেক প্রতিকূলতা পার হয়ে পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জন করলেও সমাজ তাদের সেভাবে স্বীকৃতি দেয় না। এমন নারীদের উৎসাহ দিতেই অনন্যা শীর্ষ সম্মাননা। পেশাগত দায়িত্ব পালনে বছরের আলোচিত নারীদের কাজের স্বীকৃতি দিতেই এই উদ্যোগ। তিনি অনন্যা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ঢাকার কর্মজীবী নারীদের জন্য একটি ডরমিটরি করার ঘোষণাও দেন।

২০১৪ সালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্য ১১ নারীকে অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার ও একজনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে পাক্ষিক অনন্যা। পুরস্কারপ্রাপ্ত নারীদের হাতে উত্তরীয়-ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক, এফবিসিসিআইর সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন প্রফেসর লায়লা নূর (ভাষাসৈনিক), অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম (প্রথম নারী উপাচার্য), অধ্যাপক খালেদা একরাম (বুয়েটের প্রথম নারী ভিসি), মেহের আফরোজ চুমকি (রাজনীতি), ডা. তাহমিনা বানু (চিকিৎসক), রোকেয়া সুলতানা (সমাজসেবা), ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ (আইন ও মানবাধিকার), নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা (শিল্পকলা), সালমা খাতুন (খেলাধুলা), নাইমা হক ও তামান্না-ই-লতিফ। এছাড়া প্রথমবারের মতো অনন্যা বিশেষ সম্মাননা পান অনন্যার সাবেক নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মী দিল মনোয়ারা মনু।

ফেয়ার এ্যান্ড লাভলী ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ফারজানা রূপা। অনুষ্ঠানে সাধনা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মনোরম পরিবেশনা সবাইকে মুগ্ধ করে। এছাড়া বাঁশির সুরে আচ্ছন্ন করেন কিশোরগঞ্জ থেকে আসা সরস্বতী দাস। অনুষ্ঠানটি একাত্তর টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করে।

অপরাজিতা ডেস্ক