২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সরেজমিন ॥ মাতৃত্বকালীন ভাতা

  • মো. মারুফ খান

সুন্দরবনের ধারঘেঁষা গ্রাম দক্ষিণ দাতিনাখালী। নদীর এপারে গ্রাম দাতিনাখালী আর ওপারে সুন্দরবন। এবার ঈদ করতে গিয়েছিলাম- সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার বুড়ী গোয়ালিনী ইউনিয়নের দক্ষিণ দাতিনাখালী গ্রামে।

দাতিনাখালীর ফরিদা বেগম, লতিফা খাতুন আর মোছাম্মৎ আকলিমা খাতুনকে আমি চিনি না, তারাও আমাকে চেনেন না। সবার বাড়িতেই আলাদা আলাদাভাবে গিয়েছি। বুড়ী গোয়ালিনী ইউনিয়নের মহিলা মেম্বার সাজেদা বেগমের কিশোরী মেয়ে আসমা আমার পথপ্রদর্শক ছিলেন।

এক বিকেলে বৃষ্টিভেজা পিচ্ছিল রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফরিদা বেগমের বাড়ির বারান্দায় যখন উঠলাম তখনও টিপটিপিয়ে বৃষ্টি চলছে। আসমা যেন জলপরী- ভিজতে লাগলেন। আমিও অর্ধভেজা। কিছুটা সামলে নিয়ে বললাম, ‘আমি মারুফ খান। ঢাকা থেকে এসেছি। বন্ধুর বাড়ি ঈদ করতে। আমার বন্ধু আকরাম, আপনাদের গ্রামেরই। আপনারা কি মাতৃত্বকালীন ভাতা পেয়েছেন?’

জি, পেয়েছি। মাসে ৫০০ টাকা করে পেয়েছি। মোট ৩,০০০ টাকা পেয়েছি। এবারই প্রথম পেলাম।’

‘ক’বার পাবেন জানেন?’

‘দুই বছরে চারবার, আর তিনবার পাব বলেছে।’

‘কে বলেছেন?’

আসমাকে দেখিয়ে বললেন ‘ওর মা।’

আমি বললাম, ‘এই যে আপনারা মাতৃত্বকালীন ভাতা পাচ্ছেন, যিনি আপনাদের জন্য এই ভাতা সরকারকে দিতে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর নাম মো. নোমান। নোমান ভাই। নোমান ভাই আমাকে আসার সময় বললেন, মারুফ, গ্রাম এলাকায় যাচ্ছেন- মাতৃত্বকালীন মায়েদের সঙ্গে একটু দেখা করে আসেন না?’

আমার এ ধরনের কথায়, সবাই যেন পরম আত্মীয় নোমান ভাইকে কল্পনায় খুঁজছিলেন! এঁরা কেউ নোমান ভাইকে চেনেনও না! আর আমি নোমান ভাইয়ের প্রতিনিধি হিসেবে এক নিমেষে সবার পরিবারের অংশ হয়ে উঠেছিলাম!

একদিন যখন লতিফা খাতুন আর মোছাম্মৎ আকলিমা খাতুনের বাড়ি গিয়েছি, সবার ক্ষেত্রেই ওপরে বর্ণিত ঘটনা কমবেশি একই ছিল। আর সবার ক্ষেত্রে তাঁদের স্বামী ও সন্তান উপস্থিত ছিলেন। স্ত্রীদের সঙ্গে স্বামীরাও কথা বলছিলেন। যেটা ভাল লাগল- কেউ কারও কথায় বাগড়া দিচ্ছিলেন না। ভাল লাগল- আকলিমার কথায়। বললেন, ‘টাকাটা সরকার আমাদের দিচ্ছে, আমাদের বাচ্চা যেন পুষ্টি পায়। আর আমি এমন সময় টাকাটা পেয়েছি যখন হাতে কোন টাকা ছিল না। ওষুধপাতি কিনেছি। আমার খুব উপকারে লেগেছে টাকাটা।’ দেখা গেল, অন্যরাও মাতৃত্বকালীন ভাতার উদ্দেশ্য বেশ ভালভাবেই জানেন। লতিফা বলছিলেন, ‘আমাদের জন্য ৬ মাসে ৩,০০০ টাকা পাওয়া অনেক বড়। অনেক উপকার হয়। নিজে ইচ্ছা করলে কিছু কিনে খেতে পারি। অন্য কাজেও লাগে। সামনে যদি পাই, তো বাচ্চাটার মুখে ভাল-মন্দ কিছু তুলে দিতে পারব।’ কথা প্রসঙ্গে বুড়ী গোয়ালিনী ইউনিয়নের মহিলা মেম্বার সাজেদা বেগম বললেন, ‘এই ভাতাটা আসলেই দরিদ্র্য পরিবারগুলোর জন্য খুবই ভাল হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়, সরকার যদি বড় ওয়ার্ড হিসেবে প্রতিটা ওয়ার্ডে ৬০ জনের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা দিতে পারত, তো দেশের জন্য খুবই ভাল হতো।’

ফরিদা বেগমের স্বামী পিরামিন ইসহাক। ফরেস্টে চাকরি করেন। মাসিক বেতন ১০,০০০ টাকা। তাঁদের ২ বাচ্চা। দ্বিতীয় বাচ্চার জন্য জুলাই ২০১৫ মাসে ভাতা পেয়েছেন। বাচ্চার বয়স বর্তমানে ৭ মাস। দ্বিতীয় বাচ্চা পেটে আসার সময় ফরিদার বয়স ছিল ২৬ বছরের কিছু বেশি। ফরিদার যখন বিবাহ হয় তখন তার বয়স ছিল ১৮-১৯ বছর। আর তাঁদের প্রথম বাচ্চা ছেলে, তার বর্তমান বয়স ৮ বছর। ফরিদাদের বসতবাড়ি আছে। তবে চাষের কোন জমি ও পুকুর নেই।

অন্যদিকে, লতিফা খাতুনের স্বামী কবির হোসেন জঙ্গলে কাঁকড়া মেরে মাসে গড়ে ৫,০০০-৬,০০০ টাকা আয় করেন। তাদেরও ২ বাচ্চা। প্রথম বাচ্চা মেয়ে। বয়স ৭ বছর। দ্বিতীয় বাচ্চার জন্য ভাতা পেয়েছেন জুলাই মাসে। দ্বিতীয় বাচ্চার বয়স বর্তমানে ৭ মাস। ছেলে। দ্বিতীয় বাচ্চা পেটে আসার সময় ফরিদার বয়স ছিল ২৪ বছর। ফরিদার বিয়ে হয় ২০০৪ সালে, তখন বয়স ছিল ১৮ বছর। ফরিদাদের বসতবাড়ি আছে। চাষের কোন জমি নেই, তবে দুই ভাগীতে মোট ১০ শতাংশ পুকুর আছে।

মোছাম্মৎ আকলিমা খাতুনের স্বামী মো. আনোয়ারুল ইসলামও জঙ্গলে কাঁকড়া মারেন। মাসে ৮,০০০-১০,০০০ টাকা আয় করেন। এই দম্পতিরও দুই বাচ্চা এবং দ্বিতীয় বাচ্চা মেয়ে, বয়স ৮ মাস, এই বাচ্চার জন্যই ভাতা পান। মেয়ে পেটে আসার সময় আকলিমার আনুমানিক ৩২ বছর বয়স ছিল। এই দম্পতিও জুলাই ২০১৫ তে প্রথম ভাতা পেয়েছেন। প্রথম বাচ্চা ছেলে, বয়স ১৩ বছর। এঁদেরও বসতবাড়ি আছে। কিন্তু চাষের জমি নেই। তবে দুই ভাগীতে মোট ৪০ শতাংশ পুকুর আছে। তিনটি পরিবারে কোন প্রতিবন্ধী নেই।

যাই হোক, মাতৃত্বকালীন ভাতাটা এলাকার মানুষের কাছে মাতৃত্বকালীন হিসেবে যতটুকু গেছে, ঠিক দরিদ্র মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা হিসেবে ততটুকু যায়নি বলে মনে হয়েছে। বিষয়টা নিয়ে মহিলা মেম্বার যা বললেন, ‘দরিদ্র হিসেবে মাসিক আয় ১,৫০০ টাকার নিচে- এটা আমাদের এলাকার জন্য ঠিক খাটে না। সুন্দরবন এলাকায় দরিদ্র মানুষরা মূলত বন থেকে কাঠ সংগ্রহ, কাঁকড়া সংগ্রহ, মধু সংগ্রহ, ইত্যাদি কাজ করে জীবন চালায়। এসব কাজ সবসময় করাও যায় না। আবার ঠিকমতো মূল্যও পাওয়া যায় না। আর বন-জলদস্যুদের উপদ্রব তো দরিদ্র পরিবারগুলোকে ছারখার করে দিচ্ছে। আর এ এলাকায় মাছের ঘেরের কারণে শাক-সবজি-ধান-গমের চাষ কম। ফলে অনেক কিছু কিনে খেতে হয়। এছাড়া, জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়াতেও গড়ে মাসে ৬,০০০-১০,০০০ টাকা আয় করলেও বছরে গিয়ে দেনায় থাকতে হয়।’

যখন বিদায় নিচ্ছিলাম, সবার মুখে আতিথেয়তা করতে না পারায় কষ্টটা ফুটে উঠছিল! কিছু দূর এগিয়ে আনমনে পেছনে তাকিয়েছি- দেখেছি আমাদের পথপানে চেয়ে আছেন ‘নোমান ভাইয়ের মায়েরা!’ আর আমি বার বার অনুভব করছিলাম নোমান ভাইকেই! আসলেই একটা মহান কাজ করেছেন তিনি!- তাঁর মায়েদের জন্য।-গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের সঙ্গে।

উল্লেখ্য, মহিলাবিষয়ক অধিদফতর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে শুরু করে ৪,৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১০,০৭,৪০০ মাকে এই ভাতা প্রদান করে। বর্তমান অর্থবছর ২০১৪-২০১৫-তে দেশের প্রতিটা ইউনিয়নে ২১ জন করে ২,২০,০০০ মা প্রত্যেকে মাসিক ৫০০ টাকা করে মাতৃত্বকালীন ভাতা পাচ্ছেন। মা সংসদের সাংসদরা এক গবেষণা করে দেখেছেন, জনপ্রতি ভাতার পরিমাণ মাসিক কমপক্ষে ১,০০০ টাকা এবং প্রতি ইউনিয়ন পরিষদে কমপক্ষে ১০০ মাকে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদানের প্রয়োজন আছে।

লেখক : লাইফ স্কিলস ও জীবন ব্যবস্থাপনাবিষয়ক গবেষক, আত্মশক্তি পাঠশালা

marufcm@gmail.com