২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সময় ও ব্রাত্যজনের দহনকাব্য

  • সিরাজুল ইসলাম

‘চাষার পুত’ শব্দবদ্ধের মধ্যে পাঠক চকিতেই বুঝতে পারেন কবি কাদের কথা মনোজগতে রোপণ করে ফলিয়েছেন কাব্যফসল। সভ্যতা বিনির্মাণে যাদের অবদান সময় পরম্পরায় উচ্চকিত সেই কৃষককুল বড় একটা অংশজুড়ে বিরাজ করছে বক্ষ্যমাণ কাব্যগ্রন্থে। কবি-চলচ্চিত্র নির্মাতা মাসুদ পথিকের ‘চাষার পুত’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে কিছু বলার আগে প্রবাদপ্রতিম সেই দুটি লাইন কার না মনে পড়ে! ‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা/দেশ মাতারই মুক্তিকামী দেশের সে যে আশা।’ রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণী গত শতকের গোড়ার দিকে রচনা করেছিলেন এমন অমর পঙ্ক্তিমালা।

সমাজ বিবর্তনের ক্রমধারায় সময়ের প্রয়োজনে যে চাষী সবার মুখে অন্ন জুগিয়ে চলেছেন নিরন্তর-নিঃস্বার্থভাবে তিনি কি সমাজে আর্থিক ও সাম্মানিকভাবে কথাকথিত ‘ভদ্রলোক’দের আসনে উন্নীত হতে পেরেছেন? সে প্রশ্ন মীমাংসিত নয়। কেন মীমাংসিত নয় সেটাও এক প্রশ্ন বটে। যে ক’জন পেশাজীবীর হাত দিয়ে মানব সভ্যতার শুরু হয়েছিল তাদের মধ্যে চাষী অগ্রগামী। তারা আজও মহত্ত্ব দেখিয়ে চলেছেন। তারা এ দেশে এ সমাজে আজও প্রান্তিক, দৃশ্যমান হয় তারা প্রাকৃতজন। যখন নিজেদের দাবি করছি সভ্যতার চরম উৎকর্ষের সন্তান আমরা- তখন তারা ক্রমান্বয়ে প্রান্তিকের দিকে ধাবিত। তাদের নিয়ে অজস্র শব্দ, পঙ্ক্তিমালা রচিত হয়েছে, ব্যয় হয়েছে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ কিন্তু সে ফল তারা পারেনি ভোগ করতে। অন্ন জোগানোর মূল আধার যে বীজ তা নিয়েও করা হয়েছে তাদের সঙ্গে ছলচাতুরি। মাসুদ পথিক ‘বীজ’ কবিতায় এরই একটি চিত্র আমাদের উপহার দেন এভাবে-

...‘সুকৌশলে চাষার বীজ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে এ-দিকে

এ-দিকে আমন-আউশের আঙিনায়

ঢেঁকির যতো ছন্দ লেখা হচ্ছে ঝরাপাতায়

নুনঘামি কিষানির গায়ের দুলুনির সে আনন্দ

হারিয়ে ‘আলোক’ বা ‘সুফলা’ নামের নকল হাসি

...ভৌত চাষের অনেক ঘামঝরা প্রান্তরে

যে করবে বনের পাখিরেও পোষ

যখন গোলার ধান খেয়ে যায় বিদেশি ইঁদুর’...

কৃষকের দুঃসময়, দুর্দিনের শুধু চিত্র নয়, দেশি-বিদেশি কালো শক্তির আস্ফালনের কথা মূর্ত হয় কাব্যরসে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের কালোথাবা কতদূর বিস্তার করেছে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘বীজ’ কবিতায়; সাধারণ পাঠকের তা বুঝতে কষ্ট হয় না। নিজস্ব সংস্কৃতিতে কারা বিষ ঢালছে সে মুখোশও খুলে দেন কবি।

‘চাষার পুত’ আসলে তিনটি গ্রন্থের সমন্বয়। ‘চাষার পুত’, ‘আগাছার মোকাম’ ও ‘আল’র ঙপর সংসার’ এই তিনটি কাব্যগ্রন্থ মলাটবন্দী হয়েছে একত্রে। পড়তে বসলে সৃষ্টি হয় এক ঘোরলাগা। শব্দের খেলা, চাতুর্য, বাক্যের ঐশ্বর্য, শব্দচয়নে এবং দৃশ্যকল্প চিত্রণে অগ্রজ কিংবা সমসাময়িক

অন্য কবি থেকে আলাদা করা যায়। উপমার কম ব্যবহার করে ছন্দের ধারের কাছে না গিয়ে কাব্য সৃষ্টি কম কঠিন নয়। শুধু শাব্দিক ঝঙ্কার দিয়ে পাঠকমন দোলা দেয়া সুকঠিন। আর এ কঠিন কাজে সাফল্য দেখিয়েছেন কবি মাসুদ পথিক। কোথাও কোথাও শব্দের জাদুতে আবার কঠিন কুহকজাল সৃষ্টি করেছেন তা ভেদ করা ক্ষেত্র বিশেষে দুরূহ হয়ে পড়ে। যেমন ‘ঘুম শালুক’ কবিতাটি শুরু হয়েছে এভাবে- ‘এবং যেতে চাই শালুক কুড়ানো মরণের কোলে/আর কারা থাকে দুপুর হারানো রাত্রির গর্ভ হিমফুলে’। ...দৃশ্যত পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে, কিন্তু অবোধ্য নয়। চমৎকার একটা চিত্রকল্প সামনে এসে দাঁড়ায়। একটা আলো-আঁধারির খেলা নাচতে থাকে। এটা সময়ের চাহিদা বা দাবি কিনা তা কাব্য সমালোচকরাই ভালো বলতে পারবেন। আমরা বরং এ প্রবণতার ফল পেতে ভবিতব্যের হাতে ছেড়ে দিতে পারি।

কবি কবিতা নিয়ে অনেক নিরীক্ষা করেছেন। কবিতা নিয়ে নিরীক্ষা অবশ্যই স্বাগত জানানোর বিষয়। ভাঙচুর করে যদি কোনো কবি কবিতার অরিজিনের একটি রূপ বা দর্শন উপহার দেন এবং তা স্থায়ী ও অনুকরণীয় হয় তবে তা অবশ্যই মহৎকর্ম।

কবি নিরীক্ষা করতে গিয়ে ম্যাজিক রিয়ালিজম (জাদু বাস্তবতা) স্যুররিয়ালিজম (পরাবাস্তবতা) ইত্যাদির ওপর নির্ভর করেছেন। কোনো ইজমের দ্বারস্থ হওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু সেই ইজম গ্রহণে পাঠকমানস বা স্থান কালপাত্র কতটুকু প্রস্তুত সেটা বিবেচ্য বিষয়। যে কোনো বিষয় চাপিয়ে দিলে পাঠকমন বিভ্রান্ত হতে পারে; চাইকি বিব্রতও হতে পারে। পাশাপাশি কোনো ইজম প্রয়োগে সাফল্যের বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরী। আর যদি হয় এ দেশের পরমনির্ভরশীল মহৎ পেশার মানুষ কৃষককুলকে নিয়ে, যারা অধিকাংশ নিরক্ষর, সেক্ষেত্রে আরও সতর্কতা আবশ্যক। কবিতাকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ও দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার সময় বয়ে যাচ্ছে- এ কথা মনে রাখা দরকার। প্রায় এক দশক আগে প্রকাশিত কবির ‘বাতাসের বাজার’ কাব্যগ্রন্থ থেকে বর্তমানের কাব্যগ্রন্থ এটাই সাক্ষ্য দেয় কবিতার কাছে তার দায়বদ্ধতা বেড়েছে অনেক বেশি। শিল্প সাধনায় ঋদ্ধ। প্রথম কবিতার বই ‘কৃষকফুল’-এর ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন নিজস্ব প্ল্যাটফরমে, সৃষ্টি করেছেন স্বতন্ত্র স্বর।

‘চাষার পুত’ শুধু প্রান্তিক মানুষের কাব্যচিত্র নয়। স্থান পেয়েছে সময়ের যন্ত্রণার চিত্র। নাগরিক জীবন যে ক্রমান্বয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে আর সেই আগুনে দগ্ধ হচ্ছেন কবি সে চিত্র আমরা পাই ‘বাড়ি ভাড়া’ কবিতায়-

...‘সবহারা প্রতিটি হাপরের পর আবারও মনে পড়ে গোলাভরা ধান নদীভরা মাছের স্বপ্ন যে মিথাভাষে ফেরে আর/বাড়ি ভাড়ার তাড়ায় নগর দানোটি গেলে আমার সন্তানের শেষ আহার।’ এ অনুভূতি আর যন্ত্রণা কবির একার নয়, হয়ে উঠেছে সবার। ব্যক্তিকে ছাপিয়ে যখন কবিতা সবার হয়ে ওঠে তখনই তার সার্থকতা। এমন অনেক সার্থক কবিতা পাঠক পাবেন ‘চাষার পুত’ কাব্যগ্রন্থে। এ কারণেই গ্রন্থটির জয়গান গাওয়ার সুযোগ আছে। সূচিপত্র থেকে কবিতার বিন্যাস, মেকআপে নিরীক্ষা ও যতেœর ছাপ রয়েছে। উন্নত কাগজে ২৪০ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ৭০০ টাকা। প্রকশনায় রুচিশীলতার ছাপ রয়েছে। চমৎকার দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন চারু পিন্টু। প্রকাশ করেছে বাংলালিপি। শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমদ ও কবি কামাল চৌধুরীকে উৎসর্গ করে কবি হয়েছেন ধন্যবাদার্হ।