১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তুচ্ছ কথা অতুচ্ছ কথা

  • শেখ আতাউর রহমান

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে হেরাক্লিটাস ঘোষণা করেছিলেন- একজন মানুষ একটা নদীতে দু’বার স্নান করতে পারে না। তারই প্রায় দুইশত বছর পর এ্যারিস্টটল এ কথারই প্রতিধ্বনি করে বললেন- সময় ও জলস্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। তাহলে একবার ভাবুন কি দারুণ গতিতে এই বিশ্বব্রহ্মা ছুটে চলেছে এবং আমাদের এই গ্যালাক্সির নক্ষত্রপুঞ্জ ক্রমশ পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারপর একদিন এই নক্ষত্রপুঞ্জের মোমেনটাম শূন্যে এসে ঠেকবে এবং তখন আবার তারা ফিরে আসতে থাকবে কেন্দ্রে। অতঃপর আরেকটি বিস্ফোরণ। এমনি করে অনন্তকাল। এমনি করে কোটি কোটি আলোকবর্ষ ধরে বিশ্বব্রহ্মাে র সৃষ্টি এবং ধ্বংস-ধ্বংস আর সৃষ্টি। আবার অন্যদিকে বাল্যকাল থেকে শুনে আসছি ধ্রুবতারা উত্তরাকাশে ঠিক একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। তাহলে তো একথা ভাবতেই হয় মহাবিশ্বের একটি মহামুহূর্তের কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি ভগ্নাংশের মধ্যে আমাদের বসবাস। আর তাই আমাদের এই বর্তমান সভ্যতা যা কিনা স্ট্যাটিক নয়- ডায়নামিক- স্টিফেন হকিংয়ের ভাষায়, এই বিশ্ব ‘সময়’ ও ‘শূন্যতা’র (টাইম এ্যান্ড স্পেস) সংঘর্ষ মুহূর্তের লক্ষকোটি ভগ্নাংশ মাত্র।

অতএব, আমাদের সকল ভাবনাই আপেক্ষিক ও তাৎক্ষণিক। আজ যা ভাবছি কাল তা বদলে যাবে সন্দেহ নেই। অর্থাৎ আমাদের সকল ভাবনাই মুহূর্তের ভাবনা মাত্র- যা মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। ইবনে খল্দুন যথার্থই বলেছিলেন- সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতা ভাঙ্গে- সভ্যতা গড়ে। জাতির উত্থান-পতন একটা সাইক্লিক অর্ডারের মতো (‘আল মুকাদ্দামা- কিতাবুল ইবার’)। কার্ল মার্কস কি একেই বলেছিলেন ‘ঐতিহাসিক নিয়তিবাদ’? (হিসটোরিক্যাল ডিটারমিনেজম্)। ‘ওল্ডটেস্টামেন্ট’ (‘তাওরাত’)’-এর ভাষা হিব্রু এখন একটি মৃতভাষা। ‘বেদ’-এর ভাষা সংস্কৃতও মৃতপ্রায়। হাজার হাজার বছর ধরে মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠী পরিবর্তিত হতে হতে অন্তিম স্তরে এসে উৎপত্তি হয়েছিল ‘বঙ্গকামরূপী ভাষা’। অতঃপর আমাদের এই বাংলাভাষা। তাই বাংলাভাষা যে ক্রমশ পরিবর্তিত হতে হতে একদিন একটি আন্তর্জাতিক ভাষায় রূপ নেবে তা বলাই বাহুল্য এবং তা বিশ্বভাষাগোষ্ঠীর মূল স্ট্রিমের সঙ্গে মিশে যাবে। সভ্যতার ডায়নামিজমই এর জন্য দায়ী। হয়তো এক সময় এমনটা ঘটবে সমস্ত পৃথিবীর কেবল একটিই ভাষা থাকবে। ধ্বনি, ঠোঁট, জিহ্বার উত্থান-পতনই সব ভাষা সব ভাষাকে বুঝিয়ে দেবে- এমনকি বলতেও পারব। চমেস্কু এই বিজ্ঞানটা ধরতে পেরেছেন। অতএব আক্ষেপ করা বৃথা। পাঁচ হাজার বছর বা দশ হাজার বছর পর এই পৃথিবীর সব ভাষা যে কেবল একটি ভাষায় রূপ নেবে তা বলাই বাহুল্য। কিভাবে? আজ আমরা বলছি ‘লিঙ্গুয়াফ্রাংকা’। -বর্তমানে লিঙ্গুয়াফ্রাংকার সংখ্যা নয়টি- তখন হবে মাত্র একটি। প্রযুক্তিই ভাষাকে করছে আন্তর্জাতিক- একমুখীন। আমরা অবাক চোখে দেখছি কি দ্রুততার সঙ্গে এ মানবসভ্যতা ক্রমাগত সংহত বা কম্প্যাক্ট হচ্ছে। আমরা কি দারুণ গতিতে পরস্পরের অতি কাছাকাছি চলে আসছি। পৃথিবী জুড়ে কেবল এক ভাষা- এক সভ্যতা- আমাদের আগামী হবে এমনটাই।

এখন এ মুহূর্তে বাংলাভাষা আছে এবং থাকবে। তবে তা আজকের বাংলা নয়। মানবসভ্যতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকবে। চর্যাপদের ভাষা আর আজকের বাংলাভাষার ভিন্নতাই এর বড় প্রমাণ। এখন চাই কেবল প্রতিভাধর ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতা। ল্যাটিন আমেরিকার অরণ্যসভ্যতা ‘একশত বছর নিঃসঙ্গ’ ছিল- অজানা ছিল-অজ্ঞেয় ছিল- রহস্যময় ও দুর্বোধ্য ছিল। গ্র্যাবিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এই বিপন্ন সভ্যতাকে- ভাষাকে- সংস্কৃতিকে অসাধারণ প্রতিভাবলে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কী ভাবে? তাঁর নায়িকা অনিন্দ্য সুন্দরী দ্রোহীকন্যা রেমেদিওসের মনে হয় ব্রা, পেটিকোট আর লম্বাচুলের খাঁচায় নারীকে বন্দী করে রাখা হয়েছে একটা গভীর ষড়যন্ত্রের মতো। তাই সে একদিন অভিমানভরে প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রামভর্তি লোকের সামনে উড়ে যায় শূন্যে- আকাশে- তারপর ধীরে ধীরে মেঘের কোলে হারিয়ে যায়। আমরা তখন বাস্তবতা আর রহস্যের ঘোরটোপের মধ্যে পড়ে খাবি খাই। এ-দৃশ্য দেখে উঠোনে থকথকে কাদায় চেরিগাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা সিজোফেনিয়াক দানববৃদ্ধ হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার লোহার ডা-াবেড়ি ঝনঝন করে বেজে ওঠে; বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বলে, ‘এভরিথিং ইজ নোন্- সব জানা হয়ে গেছে।’ (রেমেদিওস কি মাকোন্দোর কপালকু-লা?) এটাই তো ম্যাজিক- ম্যাজিক রিয়ালিজম- যাদুবাস্তবতা (বন্ধু মার্কেস, প্রতিভারও একটা সীমা থাকা উচিত !)

রবীন্দ্রনাথ, আপনাকে বলি কেন থেমে গেলেন মাঝ পথে? ‘মনিহারা’য় কেন আপনার শেষ এরকম- ‘প্রকৃতিঠাকুরানী উপন্যাস লেখিকা নহেন, তাঁহার হাতে বিস্তর কাজ আছে।’ -কিন্তু কি সেই কাজ? -কেবল ধ্বংস? নাম তার ‘নৃত্যকালী’? আমাদের রিয়ালিটি আর ফ্যান্টাসির ভুবনে কি নিষ্ঠুর আঘাত হানলেন আপনি! আরেকটু অগ্রসর হলে আপনিও চাক্ষুস বাস্তবতাকে অলৌকিক যাদুতে রূপান্তরিত করতে পারতেন। মনিমালিকার জীবন্ত চোখের মতো কঙ্কালটাও জীবন্ত হয়ে উঠত। পারতেন না? -পারতেন।

একদিন এ দেশেও তো ‘লালসালু’ লেখা হয়েছিল। স্নানেভেজা কাপড়ের অন্তরালে জমিলার অপ্রতিরোধ্য শরীর দেখে ধূর্ত মজিদের গড়গড়া টানা স্তব্ধ হয়ে যায় আতঙ্কে- কি করে সে এই অপ্রতিরোধ্য যৌবনকে বশ করবে? ব্যাস, এইটুকু! আর না। -নাটকের ড্রপসিন পড়ে যায়। অতঃপর ‘নির্বাপিত দেউটি....... কেবল হিয়া মোর উত্তরঙ্গ ব্যর্থ হাহাকারে !’ (সুধীন দত্ত) -না -হলো না -সম্ভাবনা ছিল কিন্তু হলো না। এদেশে ম্যাজিক রিয়ালিজমের এমনি করেই মরণ ঘটল দ্বিতীয়বার। রিয়ালিটি আর ফ্যান্টাসির উন্মোচন কোথায় বঙ্গসাহিত্যে?

তাই এখন আমাদের অপেক্ষা কেবল আরেকজন রবীন্দ্রনাথের- যিনি বাংলাকে ভারতের একটি প্রাদেশিক ভাষাকে নিজ প্রতিভাবলে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিতে পেরেছিলেন। হ্যাঁ, আমাদেরও চাই একজন গ্র্যাবিয়েল গর্সিয়া মার্কেস। অপেক্ষায় দোষ কি? শেষ কথা। অধ্যাপিকা রাশেদা খালেকের আশাবাদের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। আর এই ঐকমত্যের একটা বাধ্যবাধকতাও আছে। বাংলাভাষাকে আরও উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেবার জন্য এখন চাই কেবল সৃষ্টিশীল প্রতিভার- সৃষ্টিশীল প্রযুক্তিবিদের। এ প্রত্যাশা কোন কষ্টকল্পনা বা ইওটোপিয়া নয়- এটা বাস্তব। লেখিকার আশাবাদকে তাই অকুণ্ঠ অভিনন্দন। *

* প্রেক্ষিত ঃ ১. বাংলাভাষার নবনব সম্ভাবনা ঃ অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক, দৈনিক সোনালী সংবাদ, রাজশাহী, ২১শে ফেরুয়ারি, ২০১৪। ২. একুশ আসে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে ঃ অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক, দৈনিক সোনার দেশ, রাজশাহী, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১। স্মারকগ্রন্থ।