১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার ৮৫ ভাগ পথশিশুই মাদকাসক্ত ড্যান্ডির নেশায় চুর অনেকেই

ঢাকার ৮৫ ভাগ পথশিশুই মাদকাসক্ত ড্যান্ডির নেশায় চুর অনেকেই

শর্মী চক্রবর্তী ॥ সকাল এগারোটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরের সামনে। নোংরা জীর্ণ কাপড় পরা ৮-১৫ বছরের কয়েকজন লিকলিকে রোগা ছেলে-মেয়ে ফুলানো পলিথিনে নাক ঢুকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। জানতে চাইলে এক পথচারি ঘৃণাভরা কণ্ঠে জানালেন ওরা ড্যান্ডি খাচ্ছে। এটি খাওয়ার পর একজন আরেকজনের ওপর হেলেদুলে পড়ছে। তারপরও একজনের হাত থেকে আরেকজন নিয়ে পলিথিনে নাক ঢুকিয়ে শ্বাস নিচ্ছে। তারা প্রকাশ্যেই সেবন করছে এই মাদক। তাদের মধ্যে কোন ভয়ও নেই এ বিষয়ে। প্রতিদিনই কোন না কোন জায়গায় দেখা যায় পথশিশুরা প্রকাশ্যে মাদক সেবন করছে। ঢাকার পথশিশুদের মাদক সেবন প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে মারাত্মকভাবে। বিশেষ করে ড্যান্ডি নামক এক ধরনের আঠার ওপর আসক্তি বেড়েই চলেছে। রাস্তাঘাট, ট্রেন, বাস, লঞ্চ স্টেশন, খেলার মাঠ, ফুটওভারব্রিজ, ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে ‘ড্যান্ডি’ সেবন করছে তারা। ভাঙ্গাড়ি টোকানো, কাগজ কুড়ানো বা কোন কাজের মধ্যেও পলিথিনের প্যাকেটে মুখ ঢুকিয়ে ড্যান্ডি সেবন করছে। বিশেষ করে কমলাপুর রেল স্টেশন, বিমানবন্দর ও গে-ারিয়া রেল স্টেশন, কাওরানবাজারসহ কয়েকটি স্থানে এদের বিচরণ সব থেকে বেশি দেখা যায়। ড্যান্ডি সেবন সরাসরি মাদক আইনে না পড়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতেও ঝামেলায় পড়ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এতে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে এসব পথশিশু।

কাওরানবাজারে ফুটপাথে কয়েক পথশিশুকে ড্যান্ডি সেবন অবস্থা দেখা যায়। তাদের কাছে গিয়ে জানতে চাইলে একজন জানায়, তার নাম আরিফ। বয়স ৮ বছর হবে। আরিফ জানায়, তার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আরও একটি বিয়ে করেছেন। সৎ মা তাকে ভাল চোখে দেখতেন না। শুধু মারধর করতেন। এক সময় রাগ হয়ে সে ঢাকায় চলে আসে। আরিফ আরও জানায়, তার বাড়ির পাশের আলম নামে একজন আগে থেকেই ঢাকা থাকত। মূলত সে-ই রনিকে নিয়ে আসে। এরপর আলমের সঙ্গে কাগজ ও ভাঙ্গাড়ি টোকানোর কাজে যোগ দেয়। সেই সঙ্গে বিড়ি ও ড্যান্ডি সেবরে হাতেখড়ি। ড্যান্ডি খেলে কী হয় জানতে চাইলে মামুন নামে অপর এক পথশিশু জানায়, ড্যান্ডিতে শরীরে শক্তি আসে। কাজ করতে ভাল লাগে। কোন খারাপ লাগে না। অনেক কাজ করা যায়। তা ছাড়া এর দাম বেশি না হওয়ায় তাদের কিনতে কোন অসুবিধা হয় না। আর না খেলে শরীর ভারি হয়ে যায়। ঝিমুনি আসে। কাজ করতে মন চায় না। ড্যান্ডি কোথায় পাওয়া যায়Ñ জানতে চাইলে আরিফ জানায়, ঢাকা শহরের যে কোন হার্ডওয়্যারের দোকানে পাওয়া যায়। বিশেষ করে নিমতলীর আনন্দবাজারে।

তারা জানায়, কোন পথশিশু ড্যান্ডি খেতে না চাইলে মহাজনরা (যাদের কাছে কাগজ ও ভাঙ্গাড়ি বিক্রি করে) জোর করে তাদের ড্যান্ডির প্রতি আসক্ত করে তোলে। কারণ ড্যান্ডি সেবন করে কাজে বের হলে একজন শিশু অনেক বেশি কাগজ ও ভাঙ্গাড়ি সংগ্রহ করতে পারে। আর তাই বাড়তি টাকা আয় করার জন্য মহাজনরা অনেকটা জোর করেই তাদের নেশায় আসক্ত করে তোলে। এদিকে এই ড্যান্ডি সেবন করে শিশুরা শ্বাসনালীর জটিল সব রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালেই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে মনে করছেন মাদক বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, পথশিশুদের ৮৫ ভাগই কোন না কোনভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে। সংগঠনটির তথ্য মতে, ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পটে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান মতে, ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্ত শিশুর প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে। মাদকাসক্ত ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলে এবং মেয়ে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন জানায়, মাদকাসক্ত ৮০ শতাংশ পথশিশু মাত্র সাত বছরের মধ্যে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। দারিদ্র্য ও সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা, এমনকি নগরীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা মাদকের আস্তানা দিন দিন পথশিশুদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যু দিকে।

পথশিশু ও তাদের নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পথশিশুদের মধ্যে ড্যান্ডির মতো সস্তা মাদক জনপ্রিয় হওয়ার মূল কারণ, ক্ষুধা নিবারণ এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা ও অবহেলা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় জেলা শহরগুলোতেও অনেক পথশিশু ড্যান্ডি সেবন করছে। তবে ড্যান্ডি সেবনকারীদের সংখ্যা কত এমন কোন তথ্য সরকারী বা বেসরকারী কোন সংস্থার কাছে নেই।

মাদক বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্যান্ডি স্থানীয় একটি শব্দ। এর আক্ষরিক তেমন কোন অর্থ নেই। মূলত ভারতে তৈরি ড্যান্ডরাইট নামক একটি আঠা থেকে ‘ড্যান্ডি’ শব্দের উৎপত্তি। মূলত জুতো তৈরির কাজে ব্যবহারের জন্য এই আঠাটি আমদানি করা হয়ে থাকে। এই আঠা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে তার গন্ধ নেয়াই হচ্ছে ড্যান্ডি সেবনকারীদের কাজ। নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ড্যান্টরাইট সেবন করলে এর গন্ধে সেবনকারীদের শ্বাসতন্ত্রের মধ্যে এক ধরনের অনুভূতির সৃষ্টি হয়, যার কারণে তাদের নাকে অন্য কোন গন্ধ কাজ করে না। এছাড়া শরীরের নেশা জাতীয় এক ধরনের অনুভূতির সঞ্চার হয়। পথশিশুরা মূলত ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ীদের দ্বারাই ড্যান্ডি সেবন করতে শুরু করে। তবে কেউ কেউ আছে বন্ধুদের দেখে দেখে এই কাজ করে। কিছু অতি লোভী ব্যবসায়ী শিশুদের স্বাস্থ্যের কথা না ভেবে নিজেদের স্বার্থের জন্য শিশুদের হাতে এ বিষাক্ত আঠা তুলে দিচ্ছে। এতে করে শিশুরা বক্ষব্যাধিসহ শ্বাসতন্ত্রের নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ড্যান্ডরাইট থেকে পথশিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে সরকারী ও বেসরকারীভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

ড্যান্ডির ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চীফ কনসালট্যান্ট ডাঃ সৈয়দ ইমামুল হোসেন বলেন, শুধু ড্যান্ডি নয়, সব ধরনের নেশা শিশুসহ বড়দের জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের মাদকাসক্তিতে আক্রান্ত শিশুদের কলিজা, ফুসফুসসহ দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নষ্ট হয়, ধীরে ধীরে শিশুদের মেধাশক্তি কমে যায় শেষে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।

ড্যান্ডির নেশায় আসক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, পথশিশুদের এ মাদকে আসক্ত হওয়ার পেছনে কারণ হলো, তাদের পরিবার থাকলেও বন্ডিং থাকে না। এছাড়া এ শিশুদের মৌলিক চাহিদাগুলো ঠিকমতো পূরণ হয় না। ক্ষুধা মেটানোর জন্য নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ে তারা। এছাড়া বেশিরভাগ শিশুরাই মহাজনের অধীনে কাজ করে। বিভিন্ন সময় তাদের মারধর খেতে হয় এই ড্যান্ডি খাওয়ার ফলে তাদের শরীরে কোন ব্যথা অনুভব হয় না তাই এটা তারা সেবন করে। শিশুদের এ ধরনের নেশা থেকে দূরে রাখাতে হলে নেশা জাতীয় দ্রব্যের ব্যাপারে সচেতন করার জন্য আসক্তদের কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনতে হবে। পথশিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারলে ভাল হয়। তিনি বলেন এ ধরনের শিশুদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য আমি দশটি বেড করেছি। কিন্তু এমন কোন রোগীই আমি পাইনি। কারণ তাদের চিকিৎসকের কাছে এনে দেয়ার মতো কেউ নেই। আবার কেউ আনতে চাইলে তাকেও বিপদে পড়তে হয়। তবে এখনই যদি তাদের চিকিৎসা দেয়া যায় তাহলে তাদের এই মরণপথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

প্রকাশ্যে মাদক সেবন বেআইনী। তাও আবার অপ্রাপ্ত বয়স্ক যদি হয় তাহলে তো এখানে দায়িত্বরত পুলিশ তাদের ধরে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর কথা। তা না হলে কমপক্ষে লাঠিপেটা করে এলাকা ছাড়া করতে পারে। কিন্তু এমন কিছুই দেখা যায় না বরং পুলিশের সামনে তারা ড্যান্ডি সেবন করছে।