১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কেন্দ্র স্থাপনে সেঞ্চুরি- এবার লক্ষ্য ঘরে ঘরে বিদ্যুত

রশিদ মামুন ॥ বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনে সেঞ্চুরি পূর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ ইতোমধ্যে দেশে ১০০ বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। পরপর দু’বার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের বিদ্যুত জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিদ্যুত উৎপাদনের মহাপরিকল্পনায় দেখা যায় সকলের ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দিতে উৎপাদনের সঙ্গে এখন বিতরণ ব্যবস্থায় মন দিয়েছে সরকার। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে সবার ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দিতে সমানতালে কাজ হচ্ছে উৎপাদন, সঞ্চালন এবং বিতরণে।

বিদ্যুত কেন্দ্রের সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কখনও যাতে বিদ্যুতের সঙ্কট না হয় সে লক্ষ্যে তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে। প্রথমে ছোট আকারের বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এখন বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দেয়া হবে। দুটি সরকারের শুরুতে দেশের বিদ্যুত উৎপাদন পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায় ২০০৯ সালে দেশে মাত্র ২৭ বিদ্যুত কেন্দ্র ছিল। সবগুলো বিদ্যুত কেন্দ্র মিলিয়ে উৎপাদান ক্ষমতা ছিল ওই সময়ে চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। তবে গড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুত উৎপাদন হতো। বিদ্যুতখাতে এক নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার গঠন করে। ওই সময়ে সারাদেশে গড়ে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হতো। খোদ রাজধানীতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুত সরবরাহ করা হতো। সরকার গঠনের পরই বিদ্যুতখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় ওই সরকার। শুরু থেকেই অনেকটা উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন শুরু করা হয়। সমালোচনা হলেও বিদ্যুতখাতের সার্থকতা সমালোচকদের উক্তি ম্লান করে দিয়েছে। সারাদেশ এখন বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হলেও সাত বছরে দেশে নতুন করে স্থাপন করা হয়েছে ৭৩ বিদ্যুত কেন্দ্র। কেবল পুরানো গ্রাহককে বেশি সরবরাহই নয় নতুন করে ৬৭ লাখ গ্রাহক বিদ্যুত সুবিধার আওতায় এসেছে। সরকারী হিসাবে বলছে এখন দেশে বিদ্যুত সুবিধা সরাসরি ভোগ করছেন ৭৪ ভাগ মানুষ। যা ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় ওই হার ছিল ৪৭ ভাগ। যেসব এলাকায় গ্রিডে বিদ্যুত সুবিধা দেয়া সম্ভব হয়নি সেখানে সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে ৪০ লাখ পরিবারকে বিদ্যুত সুবিধা দেয়া হচ্ছে। সরকার বলছে আগামী বছরের মধ্যে এ সংখ্যা অন্তত ৬০ লাখে উন্নীত করা হবে। এজন্য সরকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (ইডকল) মাধ্যমে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

বিদ্যুত উৎপাদন পরিস্থিতি বলছে চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াটে। অর্থাৎ স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা বেড়েছে সাত হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবে এর মধ্যে দৈনিক ৫০০ মেগাওয়াট প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। আর দৈনিক দিনের বেলা সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ছয় হাজার মেগাওয়াট আর রাতের বেলায় (পিক ডিমান্ডে) তা বাড়িয়ে করা হচ্ছে আট হাজার মেগাওয়াট। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বলছে, দেশে গত ১৩ আগস্ট সর্বোচ্চ আট হাজার ১১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন হয়েছে। তবে সঞ্চালন এবং বিতরণ অবকাঠামোর অপ্রতুলতা দূর করা গেলে উৎপাদন আরও অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট বৃদ্ধি করা সম্ভব।

সারাদেশে বিদ্যুতের বিস্তারে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (আরইবি) বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় ২০২১ সাল বলা হলেও আরইবি বলছে তারা সারাদেশে ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দেয়ার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে দেবে ২০১৮ সালের মধ্যে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ২০১৫Ñ২০১৬ অর্থবছরে ৩০ লাখ নতুন গ্রাহককে বিদ্যুত সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। দেশের পল্লী বিদ্যুত সমিতিগুলো প্রতিমাসে তিন লাখের বেশি গ্রাহককে বিদ্যুত সংযোগ দিচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর মাসেই দেশে পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের আওতাধীন এলাকায় তিন লাখ ২০ হাজার ৬৭৪টি পরিবারকে নতুন বিদ্যুত সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে দেশের পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের গ্রাহক সংখ্যা এক কোটি ২৯ লাখ ছাড়িয়েছে।

আরইবি চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈন উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, গ্রাহকের দোরগোড়ায় বিদ্যুত সুবিধা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ২০২১ সালের মধ্যে এক লাখ ৩০ হাজার নতুন বিদ্যুত বিতরণ লাইন নির্মাণ, এক হাজার ১০৭ উপকেন্দ্র নির্মাণে পাঁচটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর ২৫ হাজার কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে এছাড়া ৫৪ লাখ গ্রাহকের জন্য প্রি-পেইড মিটার এবং সিস্টেম লস সিঙ্গেল ডিজিটে হ্রাস করাসহ নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এসব কাজ শেষ হলে গ্রাহক বিদ্যুতের তুলনামূলক ভাল সেবা পাবেন।

উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বলছে সাত বছরে সঞ্চালন লাইন বেড়েছে এক হাজার ৬৯৫ সার্কিট কিলোমিটার, গ্রিড সাব স্টেশন ক্ষমতা বেড়েছে আট হাজার ৮০০ এমভিএ, বিতরণ লাইন বেড়েছে ৮১ হাজার কিলোমিটার। ২০০৯ এ স্থাপিত সোলাার সিস্টেমের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন লাখ। যা এখন বেড়ে প্রায় ৪০ লাখে দাঁড়িয়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুত উৎপাদন ছিল ২২০ কিলোওয়াট ঘণ্টা, যা বর্তমানে ৩৭১ কিলোওয়াট ঘণ্টা। বেড়েছে ১৫১ কিলোওয়াট ঘণ্টা। বিদ্যুত গ্রাহক সংখ্যা ছিল এক কোটি আট লাখ, বর্তমানে এক কোটি ৭৫ লাখ, বেড়েছে ৬৭ লাখ। সেচ গ্রাহক সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৩৪ হাজার, বর্তমানে তিন লাখ ৬১ হাজার, বেড়েছে এক লাখ ২৭ হাজার। ২০০৯ সালে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতখাতে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৬ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। সাত বছরে বরাদ্দ ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সামগ্রিক সিস্টেমলস ১৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে প্রায় পাঁচ শতাংশ কমে বর্তমানে ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ হয়েছে।

বিদ্যুত বিভাগের নেয়া কর্মপরিকল্পনায় দেখা যায় ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার এবং ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন এবং এক লাখ কিলোমিটার বিতরণ লাইন ও প্রয়োজনীয় উপকেন্দ্র নির্মাণ ও ক্ষমতাবর্ধন করা হবে। এজন্য সরকারের ২০২১ সাল পর্যন্ত ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংস্থান করতে হবে। অতীতে বিদ্যুতের প্রকল্প বাস্তবায়নে দাতা সংস্থার দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। দাতা সংস্থা বছরের পর বছর ঘুরিয়ে প্রকল্প বাতিল করতো। এখন সেই পরিস্থিতি থেকে সরে এসে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। অনেক ব্যাংকই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে সরকারের কাছে আসছে। সরকার বলছে এখন প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন কোন বড় সমস্যা নয়।

সরকার প্রতিবেশী দেশের সহায়তা সম্প্রসারণ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে নিজেদের মধ্যে সহায়তা বৃদ্ধিকে সম্প্রসারিত করেছে। সার্কে এ সংক্রান্ত একটি ফ্রেমওয়ার্ক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের বিদ্যুতখাতের সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রশংসা করেন।

বাংলাদেশ ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত আমদানি করছে। আরও ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত আমদানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরে ত্রিপুরা থেকে ১০০ মেগাওয়াট এবং এর ২০১৭ এর জুনের মধ্যে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত আসবে বাংলাদেশে। সরকারের পরিকল্পনা বলছে আঞ্চলিক গ্রিডের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে আরও ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত আমদানি করা হবে। এছাড়া ছয় হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মাধ্যমে দুই হাজার মেগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন করছে। ২০২২ সালের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত উৎপাদন করবে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা জরিপ শেষ করেছে রোসাটম। চলতি বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন চুক্তি হয়ে যাবে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুত উৎপাদনের ন্যূনতম ১০ শতাংশর সংস্থান করা হবে। এজন্য প্রায় হাজার মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিদ্যুত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, বাংলাদেশের জন্য বিদ্যুত কেন্দ্রের সেঞ্চুরি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বর্তমান সরকারের নিরলস চেষ্টার ফলে এ অর্জন হয়েছে। এর ধারাবাহিকতা চলমান থাকবে। চলতি বছর আরও একটি বিদ্যুত কেন্দ্র চালু হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে আরও ১৩টি নতুন বিদ্যুত কেন্দ্র উৎপাদন শুরু করবে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশের সকল মানুষকে বিদ্যুত সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা। সেজন্য বিশেষ বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।