২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পানির ওপর হাঁসের খামার, খাঁচায় মাছ চাষ

পানির ওপর হাঁসের খামার, খাঁচায় মাছ চাষ
  • স্বাবলম্বিতার চাবিকাঠি

রাজু মোস্তাফিজ

পানির ওপরে হাঁসের খামারের ঘর ভেসে চলছে বিলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। ঘরের ভেতরের এক প্রান্তে থাকে হাঁস অপরপ্রান্তে হাঁসের খামারের খাদ্যসহ নানা উপকরণ। আর দিনে বিলের মধ্যেই চলে একপাল হাঁসের চলাচল। এমনি এক ব্যতিক্রম হাঁসের খামার গড়েছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাটের যুবক আবদুস সালাম।

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কামারের ছড়ার বিলের পানির ওপর ভাসমান ও ভ্রাম্যমাণ খামার ঘর তৈরি করে হাঁস পালন করে বেকারত্ব ঘোচানোর চেষ্টা করছেন আবদুস সালাম। ইতোমধ্যে তিনি সফলতাও পেতে শুরু করেছেন। নিজের জমি-জমা ও পুকুর না থাকলেও বিলে এ রকম ভাসমান হাঁসের খামার গড়ে অনেকেই লাভবান হতে পারেন বলে জানান ওই যুবক। আবদুস সালাম বলেন, এক বছর আগে নিজের বেকারত্ব ঘোচাতে ৩শ’ হাঁসের বাচ্চা দিয়ে কামারের ছড়া বিলের ওপর ভাসমান এ খামারে হাঁস পালন শুরু করেন তিনি। নিজের টাকা-পয়সা না থাকলেও বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে সামান্য ঋণ নিয়ে ঘর তৈরি ও তিনশ’ হাঁসের বাচ্চা কিনে আনেন। ওই টাকা দিয়েই হাঁসের খাদ্য সামগ্রী কেনেন। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বর্তমানে খামারে তার হাঁসের সংখ্যা ৫ শতাধিক। খামার থেকে প্রতিদিন শতাধিক ডিম বিক্রি করেন তিনি। পাশাপাশি হাঁস বিক্রি করেও আয় হয় তার। হাঁসগুলো সারাদিন বিলের পানিতে খাদ্য খেতে পারে বলে হাঁসের খাবারের পিছনে খুব বেশি খরচ করতে হয় না। প্রতিমাসে ডিম ও হাঁস বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে তার আয় হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এ দিয়েই ভালভাবে সংসার চলছে বলে জানান আবদুস সালাম। তবে খামারের প্রসার ঘটাতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

কামারের ছড়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন জানান, আবদুস সালামের হাঁস পালনের এ উদ্যোগ একেবারেরই ব্যতিক্রমী। প্রতিদিন অনেক মানুষ পানির ওপর ভাসমান এ খামার দেখতে আসে। আর খামারের হাঁসগুলো সারা বিলে দল বেঁধে বেঁধে ঘুর বেড়ায় এবং বিভিন্ন খাবার খায়। এতগুলো হাঁস একসঙ্গে দেখলেও ভাল লাগে। তাছাড়া আমাদের গ্রামের মানুষের আর ডিম বা হাঁস কিনতে বাজারে যেতে হয় না।

পার্শ¦বর্তী গ্রামের যুবক আমিনুল ইসলাম জানান, আমি পানির ওপর ভাসমান হাঁসের খামার দেখতে এসেছি। আমার ইচ্ছা আছে এ বছরই এ রকম একটি খামার গড়ার।

এ ব্যাপারে রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান মিঠু জানান, জলাশয়ের একই পানিতে মাছের সঙ্গে প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে হাঁস পালন করলে মাছ দ্রুত বড় হয়। মাছের জন্য আলাদা খাবার খুব একটা দেয়ার প্রয়োজন হয় না। এতে করে মৎস্যজীবীরা লাভবান হবেন।

রাজারহাট উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, কামারের ছড়া বিলে আবদুস সালামের ভাসমান হাঁসের খামারটি আমি পরিদর্শন করেছি। এটি একটি ভাল উদ্যোগ। এ পদ্ধতিতে হাঁসের জন্য বাড়তি খাবার না দিয়েও হাঁস পালন করা যায়। আমাদের উপজেলায় এ রকম অনেক ছড়া ও বিল রয়েছে। যেখানে স্বপ্ল খরচে হাঁস চাষ করে বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি প্রচুর আয় করা সম্ভব।

খাঁচায় মাছ চাষ ॥ এদিকে উন্মুক্ত জলাশয়ে খাঁচায় মাছ চাষ শুরু করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন কুড়িগ্রামের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা। নিজের পুকুর না থাকলেও নদ-নদীসহ উন্মুক্ত যে কোন জলাশয়ে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা যায়। ফলে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মাছ চাষের এ পদ্ধতি।

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ও নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গায় দুধকুমার নদীতে ১০টি করে মোট ২০টি খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ করছেন ২০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টিভিটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে চলতি বছরের শুরুতে মাছ চাষ শুরু করেন তারা। এরই মধ্যে মাছের উৎপাদনে সফলতা পেয়েছেন মাছ চাষীরা। ৪ মাস পরপর ১০ ইউনিটের প্রতিটি খাঁচা থেকে মাছ বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ করছেন তারা।

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া গ্রামের কৃষক রিয়াজুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম জানান, মাছ চাষের উপযোগী আমাদের নিজেদের কোন জমি নেই। আমরা কৃষকরা ১০ জনের দল গঠন করে প্রশিক্ষণ নিয়ে খাঁচায় মাছ চাষ শুরু করি। প্রথম অবস্থায় ১০টি খাঁচা তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। মাছের উৎপাদন ভাল হওয়ায় আরও ৫টি খাঁচা বানিয়েছি। সব মিলে খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকা। মাছ বিক্রি করেছি ৩ লাখ টাকা। কৃষি কাজের পাশাপাশি মাছ চাষ করে লাভবান হচ্ছি।

এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে কৌশল শিখে নিতে আশপাশের এলাকার পার্শ্ববর্তী দূর-দূরান্তের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকসহ অনেকেই। খাঁচায় মাছ চাষ দেখতে আসা ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বঙ্গসোনাহাট এলাকার আবদার হোসেন বলেন, এর আগেও একবার এসেছি। আমি এ পদ্ধতিতে কিভাবে মাছ চাষ করা যায় তা শিখে নিচ্ছে। আগামীতে খাঁচা বানিয়ে নদীতে মাছ চাষ করব।

ভুরুঙ্গামারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুর রহমান খান জানান, ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সকল উন্মুক্ত জলাশয় ও নদীতে খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করে যাচ্ছি। এখানকার খাঁচায় মাছ চাষীরা সফলতা পাওয়ায় অনেকেই আমাদের কাছে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। খাঁচায় মাছ চাষে আগ্রহী কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। আশা করছি আগ্রামী বছর খাঁচায় মাছ চাষের পরিধি বৃদ্ধি পাবে। শুধু মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ নয়, থাই কৈ মাছসহ অন্যান্য মাছ চাষেরও পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টিভিটি প্রকল্পের কুড়িগ্রাম জেলা সমন্বয়কারী সিরাজুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তাসহ ১৬টি নদ-নদী বেষ্টিত এ জেলায় মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে দুই উপজেলায় নতুন এ পদ্ধতি চাল করা হয়েছে। এতে করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা স্বপ্ল সময়ে স্বাবলম্বী হতে শুরু করেছেন। নতুন এ পদ্ধতিতে মাছ চাষের পরিধি বৃদ্ধি পেলে জেলার চাহিদা মিটিয়ে জেলার বাইরে মাছ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।