২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তিন বন্দরের দুর্নীতি ঢাকতে দায়মুক্তি আইনের সুপারিশ!

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ দেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রামসহ মংলা ও পায়রা বন্দরের দ্রুত উন্নয়নের অজুহাত দেখিয়ে এবং বিভিন্ন সময় আদালতের নিষেধাজ্ঞা, স্থগিতাদেশসহ আইনী বিধিনিষেধ থেকে পরিত্রাণ পেতে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি তিন বন্দরের জন্য তিনটি পৃথক দায়মুক্তি বিল সংসদে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে। গত ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ১৯তম বৈঠকে এ সংক্রান্ত আলোচনার পর এই সুপারিশের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এ তিন সমুদ্রবন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রমে আইনী জটিলতা থেকে উত্তরণে দায়মুক্তি আইন পাসের চিন্তাভাবনা করা হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে দায়মুক্তির তিনটি আইন সংসদে উত্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।

সংসদীয় কমিটির এ বৈঠকে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান স্পষ্ট করে বলেছেন, দায়মুক্তি আইন ছাড়া বন্দরের উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমান যে আইন রয়েছে এতে দফায় দফায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন তালুকদার আবদুল খালেক, আবদুল লতিফ, আবদুল হাই, নুরুল ইসলাম, হাবিবর রহমান, রঞ্জিত কুমার রায়, আনোয়ারুল আজিম, মমতাজ বেগম, নৌ পরিবহন সচিব এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বন্দরের উন্নয়ন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি দল আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে ৮ নবেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের লসএঞ্জেলেস, মরিশাস ও মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া সমুদ্রবন্দর পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তালুকদার আবদুল খালেকের নেতৃত্বে আরেকটি দল ১৫ থেকে ২২ অক্টোবরের মধ্যে ইতালি, বেলজিয়াম ও জার্মানির বন্দর সফরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এদিকে, বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সূত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার সৃষ্টি করেছে। এসব সূত্রে বলা হয়েছে, দেশের বন্দরের উন্নয়নে বিদেশের বন্দর সফরের কর্মসূচীতে কারও কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্ত উন্নয়ন কার্যক্রম ও আদালতে মামলা জটিলতা এড়াতে দায়মুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কাদের স্বার্থে। অভিযোগ উঠেছে, এ তিন বন্দরে বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরে নজিরবিহীন লুটপাট, দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির বড় বড় ঘটনা ঘটেছে। সরকারী অর্থ লোপাট হয়েছে দেদার। ভবিষ্যতে এসব দুর্নীতি, অনিয়ন, অপচয় ধামাচাপা দিতেই কি দায়মুক্তি আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদীয় কমিটি। জনগণের অর্থ লোপাট করার পর বিভিন্ন অভিযোগ হয়েছে। এ নিয়ে বর্তমানে দুর্নীতি দমন ব্যুরোও একাধিক ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বিভাগীয় তদন্তও হচ্ছে। এ অবস্থায় হঠাৎ সংসদীয় কমিটি একযোগে কোন্ স্বার্থে এবং কাদের রক্ষা করতে এ ধরনের দায়মুক্তির আইন পাসের সুপারিশের চিন্তাভাবনা করেছে তা বড় ধরনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে হরিলুটের নানা তথ্য ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংসদ সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নজরে আনা হয়েছে। ঠিক ওই মুহূর্তে সংসদীয় কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে দায়মুক্তি আইন পাসের। সূত্র জানায়, শুধু কর্ণফুলী নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের নামে ১২৯ কোটি টাকার বিল গ্রহণ করে গা-ঢাকা দিয়েছে ঠিকাদার। ৬ হাজার কোটি টাকার এফডিআর-এর লভ্যাংশ যত্রতত্র ব্যয় করে সরকারী অর্থের অপচয় ঘটানো হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় ব্যস্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তিনটি পুরনো জাহাজসহ বিটিআইএসএম, সিটিএমএস, ড্রেজার, কার্গো ও কন্টেনার হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্টস কেনায় পুকুরচুরির ঘটনা ঘটেছে। ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সমুদ্রে ভাসমান বর্জ্য সংগ্রহে দুটি জাহাজ ক্রয়, বে ক্লিনার-১, বে ক্লিনার-২ নামের দুটি জাহাজ কেনার পর থেকে অচলাবস্থায় রয়েছে। ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন নামে তিনটি পুরনো জাহাজ সম্পূর্ণ আইন ও বিধিবিধানকে উপেক্ষা করে ক্রয় করা হয়েছে। মূলত এগুলো স্ক্র্যাপ জাহাজ। রিকন্ডিশন্ড করে আনার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা-পানগাঁও সমুদ্ররুটে কন্টেনার পরিবহনের জন্য কেনা এসব জাহাজের নাম পানগাঁও এক্সপ্রেস, পানগাঁও সাকসেস ও পানগাঁও ভিশন। এসব জাহাজের হর্স পাওয়ার অতি নি¤œমানের বিধায় এগুলো একদিকে প্রায় যেমন অচল থাকে, অন্যদিকে পণ্য পরিবহনে সময় নেয় বেশি। সঙ্গত কারণে ব্যবসায়ী মহল এসব জাহাজে পণ্য পরিবহনে উৎসাহী নয়। প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফর্মেশন সিস্টেম (ভিটিএমআইএস) প্রকল্পের জন্য মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয় এইচআইটিটি হল্যান্ড নামের একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে চুক্তি করেছে একোয়া মেরিন সিঙ্গাপুর নামের অপর একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে বিদেশী যন্ত্রাংশ না লাগিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে দেশীয় তৈরি যন্ত্রাংশ। আবার এ প্রকল্পের অর্ধেক বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা মানিলন্ডারিং আইনে তদন্ত চলছে। প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কন্টেনার টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট ইনফর্মেশন সিস্টেম (সিটিএমআইএস) প্রকল্পে সব মডিউল বাস্তবায়ন হয়নি। কাজ অসমাপ্ত রেখে প্রকল্প বুঝে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্প চালুই করা যায়নি। সিটিএমআইএস পরিচালনায় চুক্তি বহির্ভূত অবৈধ পথে দেয়া হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। প্রতিমাসে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ১০ লাখ টাকা হারে ওই প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১ থেকে ৩ নম্বর জেটি পলি ভরাটের কারণে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এই পলি সরাতে ৮ কোটি টাকা মূল্যের ড্রেজার ক্রয়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২০ কোটি টাকা। অথচ, একই ড্রেজার বিআইডব্লিউটিএ ক্রয় করেছে ৬ কোটি টাকায়। প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়ার্কশপ স্লিপওয়ে চালু হলেও বন্দরের কোন জাহাজ এ ওয়ার্কশপে রিপেয়ারিং বা ম্যানটেনেস হয় না। এ প্রকল্পে একটিমাত্র টেন্ডারদাতাকে রেসপনসিভ করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বিনা প্রয়োজনে ক্রয়কৃত এ্যাম্বুলেন্সশিপ রয়েছে অলস অবস্থায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৮ কোটি টাকার ডিপিপি করা হলেও পূর্বে তা অনুমোদন পায়নি। অথচ, পরবর্তীতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে ২৪ কোটি টাকায়।

২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন ক্রয় করা হয়েছে সব নিয়মনীতি উপেক্ষা করে। বন্দরে এ ধরনের মেশিন ক্রয়ের কথা এনবিআর-এর। অথচ, ওই নিয়ম উপেক্ষা করে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে তা বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া সচল স্ট্রাডল কেরিয়ারের ১০ থেকে ২০ শতাংশ যন্ত্রপাতি কিনতে গড়ে ব্যয় করা হচ্ছে সাড়ে ৩ কোটি টাকারও বেশি। একটি নতুন স্ট্রাডল কেরিয়ার তিন বছর মেরামত ও মেনটেনেন্সসহ ১২ বছরের আয়ুষ্কাল নিয়ে বর্তমান বাজারমূল্য সর্বোচ্চ সাড়ে ৮ কোটি টাকা। এছাড়া এসব স্ট্রাডল কেরিয়ারের যন্ত্রাংশ এনে দেখালে ৫০ শতাংশ অগ্রিম পেয়ে যায় ঠিকাদার। ১২টি ইঞ্জিনের মূল্য সর্বোচ্চ আড়াই কোটি টাকা হলেও দরপত্রের প্রাক্কলিত ব্যয় বিবরণীতে প্রস্তাব করা হয়েছে ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা; যা বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা বেশি। সূত্রমতে, ৬টি স্ট্রাডল কেরিয়ার পুনঃ সংস্কার উদ্যোগ প্রকল্পে ২২ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগে বেসরকারী আইসিডি (ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো) চলছে কোন ধরনের নীতিমালা ছাড়াই। আইসিডি প্রতিষ্ঠার কোন নিয়মনীতি পর্যন্ত করা যায়নি। এ ধরনের ১৯টি আইসিডিতে আমদানি পণ্যের হ্যান্ডলিং হচ্ছে অবাধে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে বেসরকারী আইসিডি নীতিমালা প্রণীত হয় ১৯৯৫ সালে।

চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ন্ত্রিত ঢাকা কমলাপুর আইসিডিতে কন্টেনার ও কার্গো হান্ডলিংয়ের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শর্তানুযায়ী হয়নি। গোপনে দলিল পরিবর্তন করে এ টেন্ডার গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ, ৬৯ কোটি টাকারও বেশি কমলাপুর আইসিডি নিয়ে গৃহীত কার্যক্রম কোন অগ্রগতি নেই। এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাও হয়েছে। শেষ ফল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। এদিকে, ক্যাপিটাল ড্রেজিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্ণফুলী নদীতে একের পর এক চর জেগে উঠছে। অর্থাৎ মরতে বসেছে বন্দরের প্রাণ এ নদী। সর্বশেষ জানা গেছে, ঠিকাদারের সঙ্গে একটি আপোস মীমাংসায় আসার চেষ্টা চলছে।

এ অবস্থায় সংসদীয় কমিটি তিন বন্দরের কার্যক্রম নিয়ে দায়মুক্তি আইনের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তা প্রকারান্তরে এই তিন বন্দরের নজিরবিহীন দুর্নীতিকে ধামাচাপা দেয়ার প্রয়াস হিসেবেই দেখছেন বন্দর ব্যবহারকারী সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচিত সংবাদ