২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নাসেরের জামাতা ছিলেন ইসরাইলী স্পাই!

  • অনুবাদ : এনামুল হক

আশরাফ মারওয়ানকে অনেকে বলে বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্পাই। মিসরের এই বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী কার পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করতেন সেটা ঠিক স্পষ্ট নয়। কেউ বলে ইসরাইলের পক্ষে, কেউ বলে মিসরের পক্ষে আবার কেউ বলে উনি ছিলেন ডবল এজেন্ট। তার আরও একটা পরিচয় আছে। তিনি ছিলেন মিসরের প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়ক জামাল আবদুল নাসেরের জামাতা- তার তৃতীয় ও অতি আদরের মেয়ে মোনা নাসেরকে বিয়ে করেছিলেন। যাই হোক ২০০৭ সালের ২৭ জুন তিনি লন্ডনে তার পাঁচতলার এ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনি থেকে পড়ে মারা যান। এই মৃত্যু যে স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ব্রিটিশ পুলিশের ক্রমবর্ধমান বিশ্বাস তাকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু কে বা কারা হত্যা করেছিল সে বিষয়টি এখনও রহস্যের অবগুণ্ঠনেই ঢাকা পড়ে আছে। কারণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মারওয়ান তার সমস্ত গোপন তথ্যই সঙ্গে নিয়ে গেছেন।

ডাক্তারী পরীক্ষায় বলা হয়, মারওয়ান এয়োর্টা বা মহাধমনী ফেটে যাওয়ায় মারা যান। কিন্তু তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো ধোঁয়াশাময়। প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না এমন নয়, কাছাকাছি একটি ভবনের চারতলায় মারওয়ানেরই একটি কোম্পানির ৪ জন লোক বৈঠকে বসেছিল এবং সেখানে মারওয়ানের যাবার কথা ছিল। তারা তাদের বসের জন্য অপেক্ষা করছিল। ওখান থেকে মারওয়ানের ২৪ কার্লটন হাউস টেরেসে মারওয়ানের এ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনি পরিষ্কার দেখা যেত। চারজনের একজন হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে : ‘দেখ দেখ ড. মারওয়ান কি করছেন!’ বাকি তিনজনের দু’জন দ্রুত জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতে পায় মারওয়ান ব্যালকনি থেকে লাফ দিচ্ছেন। অপরজন জানালার কাছে ছুটে গিয়ে দেখে মারওয়ান পড়ে যাচ্ছেন।

মারওয়ান কি নিজে থেকে লাফ দিয়েছিলেন নাকি কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল? ময়নাতদন্তে তার রক্তে বিষণœতার ওষুধের নমুনা পাওয়া গিয়েছিল। তিনি যে ডাক্তারকে দেখাতেন তিনি জানিয়েছেন ‘ইদানীং তিনি যথেষ্ট মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন এবং দু’মাসে ১০ কেজি ওজন হারিয়েছিলেন। তবে আত্মহত্যা তিনি যে করেননি মনে করার কারণ আছে। তিনি কোন চিরকুট রেখে যাননি। ওই দিন সন্ধ্যায় তার আমেরিকা রওনা হওয়ার কথা ছিল। ক’দিন আগে তিনি তার এক নাতির জন্মদিনে প্লেস্টেশন ৩ (ভিডিও গেম সরঞ্জাম) কিনে দিয়েছিলেন। পাঁচ নাতি-নাতনিকে নিয়ে মারওয়ান দম্পতির অবকাশে যাওয়ার কথা ছিল। মারওয়ানের অনেক পরিকল্পনা ছিল। তার বেঁচে থাকার কারণ ও যুক্তি ছিল। তার মানসিক বা মনস্তত্ত্ব¡গত সমস্যার কোন প্রমাণ মেলেনি। তার আত্মহত্যা করার ইচ্ছা হয়েছিল এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তবে হতবুদ্ধিকর ব্যাপার হলো মারওয়ানকে হত্যা করা হয়েছিল এমন বক্তব্যের সমর্থনেও কোন প্রমাণ নেই।

অবশ্য আত্মহত্যার ইচ্ছা হয়ত মারওয়ানের ছিল না। তবে তার মৃত্যুভীতি যে ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। শেষের দিকে স্ত্রীকে একবার তিনি বলেছিলেন তাকে মেরে ফেলা হতে পারে। কারা মারতে পারে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু না জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার নানা ধরনের শত্রু আছে।’ মৃত্যুর পূর্ববর্তী কয়েক মাস প্রতিরাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি দরজা ঠিকমতো লক করা হয়েছে কিনা পরখ করে দেখতেন। স্ত্রী মোনার ভাষ্য অনুযায়ী ওটা ছিল তার নতুন অভ্যাস যা পূর্ববর্তী ৩৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে কখনও দেখা যায়নি।

তাকে সম্ভবত হত্যাই করা হয়েছিল এমন আরেকটি সূত্র পাওয়া গিয়েছিল। তিনি তার স্মৃতিকথা রচনা করছিলেন। প্রায় শেষ করে এনেছিলেন। একটাইমাত্র জানা কপি ছিল। অবাক ব্যাপার, যেদিন তিনি মারা যান ওইদিন তার বুকশেলফ থেকে কপিটা উধাও হয়ে যায়। তিন খ-ের এই স্মৃতিকথাটির প্রতিটি খ- ছিল ২০০ পৃষ্ঠার। মারওয়ান তার স্মৃতিকথা ডিকটেট করতেন এবং তা টেপে বাণীবদ্ধ থাকত। সেই টেপও উদ্ধার করা যায়নি। এক বিশেষজ্ঞের মতে, মারওয়ান দীর্ঘদিন মিসরীয়, ইসরাইলী, ইতালীয়, আমেরিকান ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে কাজ করেছিলেন। স্মৃতিকথার মাধ্যমে তিনি কি এমন সব গোপন তথ্য ফাঁস করার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন যা রাজা বাদশা ও রাষ্ট্রনায়কদের বিব্রত করে তুলতে পারে? স্মৃতিকথার ওই কপিটির সত্যিই যদি অস্তিত্ব থেকে থাকে তাহলে কে নিয়েছিল ওটা? ওই স্মৃতিকথার সঙ্গে তার মৃত্যুর কি কোন যোগসূত্র আছে? মনে রাখতে হবে একই রকম পরিস্থিতিতে লন্ডনে তার মতো আরও দু’জন মিসরীয়র মৃত্যু হয়েছিল। ২০০১ সালের জুন মাসে অভিনেত্রী সোয়াদ হোসনি তার স্মৃতিকথা রচনার জন্য জনৈক প্রকাশককে অনুরোধ জানানোর পর স্টুয়ার্ট টাওয়ারের ব্যালকনি থেকে পড়ে মারা যান। ১৯৭৩ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডের সাবেক প্রধান এল-লেইখি নাসিক একই টাওয়ারের ব্যালকনি থেকে পড়ে মারা যান। তিনিও স্মৃতিকথা লিখছিলেন। মারওয়ানসহ এই তিনজনের প্রত্যেকেরই মিসরীয় নিরাপত্তা সার্ভিসগুলোর সঙ্গে যোগসূত্র ছিল।

মারওয়ানের মৃত্যুরহস্য নিয়ে অনেক তদন্ত হয়েছে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের এলিট স্কোয়াড স্পেশালিস্ট ক্রাইম ডাইরেক্টরেটসহ দুটি আলাদা আলাদা স্কোয়াড তিন বছর ধরে অনেক তদন্ত ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। তারপরও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কাহিনীটা যেমন কৌতূহলোদ্দীপক তেমনই রহস্যময়। পরিস্থিতিটাও ছিল তেমনইÑ লাঞ্চের সময় লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে ব্যালকনি থেকে পড়ে যাওয়া, প্রত্যক্ষদর্শীর উপস্থিতি, অকুস্থলে নানা সূত্রের অস্তিত্ব। তারপরও মারওয়ান কাহিনীর কোন উপসংহার টানা যায়নি। অসংখ্য প্রশ্ন অনুত্তরই রয়ে গেছে। যেমন ধরুনÑ

মারওয়ান যখন ব্যালকনি থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন ঠিক সে মুহূর্তে এহরন ব্রেগম্যান লন্ডনের কিংস কলেজের ওমার স্টাডিজ বিভাগে নিজ কার্যালয়ে বসা ছিলেন। অপেক্ষা করছিলেন একটা ফোন কলের যে কলটি কখনই আসেনি। যার কাছ থেকে কলটি আসার কথা ছিল তিনি একজন স্পাই। কয়েক ঘণ্টা পর ব্রেগম্যান উইম্বলডনে ফিরে গিয়ে তার ফ্যামিলিকে নিয়ে নানদোস রেস্তরাঁয় লাঞ্চ করতে যান। রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে আসার সময় মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। ইসরাইল থেকে করেছেন তার বোন। জানালেন, মারওয়ান মারা গেছে। খবরটা শুনে বিচলিত বোধ করলেন ব্রেগম্যান। তবে একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না ব্যাপারটা। আগের কয়েকটা দিন মারওয়ানের কাছ থেকে আনসার ফোন বার্তা পেয়েছিলেন যার মধ্যে ভীতির সুর ছিল। ব্রেগম্যান জানতেন তার এই বন্ধু নিজের জীবন বিপন্ন বলে আশঙ্কা করতেন। ব্রেগম্যান আরও জানতেন তার এই আশঙ্কার জন্য তিনি নিজেও আংশিক দায়ী।

মারওয়ানের সঙ্গে ব্রেগম্যানের সম্পর্কটা বেশ জটিল। আগে মাত্র একবারই তাদের সশরীরে দেখা হয়েছিল চার বছর আগে লন্ডনের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে। ব্রেগম্যান বেশ সতর্কতা অবলম্বন করে সেখানে গিয়েছিলেন। অলি-গলি দিয়ে পৌঁছেছিলেন যাতে তাকে কেউ অনুসরণ না করতে পারে। এই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে দু’জনের জীবন পরস্পরের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছিল। মারওয়ানের জীবনে ব্রেগম্যানের আগমনের আগেই মারওয়ানের একটা পরিচিতি ছিল ধনী ব্যবসায়ী ও চেলসি ক্লাবের দুর্দান্ত সমর্থক হিসেবে। চেলসি ক্লাবের সাড়ে তিন শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে তার একটি কোম্পানি চেলসি ও ফুলহাম ফুটবল ময়দান কিনে নিয়েছিল। ব্রেগম্যান আসার পর সবকিছু বদলে গেল।

ক্রমশ...

সূত্র : গার্ডিয়ান