২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডিএনএ মেরামতি

পৃথিবী নামক এ গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ। মানব প্রজাতির অধিকতর জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান অংশ হিসেবে ধরা হয় দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের। দার্শনিক তথা ভাবুকরা কল্পনাশক্তি দিয়ে মানব জাতিকে এমন একটি জায়গায় পৌঁছে দিতে চান যা গোটা মানব জাতিকেই বিস্মিত করে। আর বিজ্ঞানীরা কাজ করেন বস্তু জগত নিয়ে। বলা যেতে পারে কল্পনারই বাস্তব রূপ দেন তাঁরা। জুল ভার্ন স্বপ্ন দেখেছিলেন মাত্র ৮০ দিনে গোটা বিশ্ব ভ্রমণের। কালপরম্পরায় একদিন সত্যি সত্যি মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়েছে তার চেয়েও অল্প সময়ে সমগ্র দুনিয়া ঘুরে দেখা। সভ্যতার সূচনা থেকেই মানুষ নিজেকে পরিপূর্ণরূপে জানা এবং মানব জীবন সংহত, উন্নত ও প্রলম্বিত করার জন্য চিন্তা-ভাবনার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজটিও করে আসছে।

ডিএনএ সম্পর্কে জানার পর মানব জাতি নিজেকে জানার ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে যায়। আমরা জানি যে, ডিএনএ বংশগতির একক বা বাহক। এটি আমাদের জীবন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। ডিএনএ অবস্থান করে কোষের নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকা ক্রোমোজোমে। এ ডিএনএতে লেখা থাকে আমাদের দৈনিক কার্যক্রমের ছক। মাত্র চার অক্ষরে লেখা হয় এ ছকটি। জীববিজ্ঞানীরা অ, ঞ, এ এবং ঈ এই চারটি আদ্যক্ষর দ্বারা ছকের এ ভাষাকে প্রকাশ করেন। আদ্যক্ষরগুলো নেয়া হয়েছে নাইট্রোজেন বেসগুলোর আদ্যক্ষর থেকে।

পদার্থ বিজ্ঞানী এরউইন স্রোডিনজার তার ‘হোয়াট ইস লাইফ’ বইতে প্রথম ধারণা দেন ডিএনএর ব্যাপারে। তিনি তার বইয়ে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে এপিরিয়ডিক ক্রিস্টাল নামক একটি অণু সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। যা বংশপরম্পরায় জীব দেহের তথ্য সংরক্ষণ করে ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। এর প্রায় ১০ বছর পরে ১৯৫০ সালে ফান্সিস ক্রিক ও জেমস ডি ওয়াটসন ডিএনএর গঠন নিয়ে কাজ করে পরবর্তীকালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। রসায়নে নোবেল জয়ের বিষয় হিসেবে আবারও জায়গা করে নিয়েছে ডিএনএ। মানুষের দেহের প্রতিটি কোষে প্রতিনিয়ত ডিএনএর যুদ্ধ জয়ের কাহিনী প্রকাশ্যে এনেই এ বারে রসায়নে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী, টমাস লিনডাল, পল মডরিক এবং আজিজ স্যানকার। তাঁরা দেখিয়েছেন লড়াইটা চলছে প্রতিনিয়ত। যদিও চোখের আড়ালেই। কখনও প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়ছে সে, তো কখনও ‘গৃহযুদ্ধ’-এ। আক্রান্ত হচ্ছে, ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। কিন্তু শেষমেশ সব যুদ্ধেই সে জয়ী। নিজের জায়গায় অবিচল।

নোবেলবিজয়ী তিন বিজ্ঞানীর একজন পল মডরিকের কাজটা ছিল একটু অন্য রকম। ডিএনএ প্রতিনিয়ত তার প্রতিলিপি ছেপে চলেছে। জীবনের এই ছাপাখানায় মাঝেমধ্যেই নানা ধরনের ভুলভ্রান্তি ঘটে যায়। কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএর প্রতিলিপি গঠন হতে গিয়ে হয়ে যায় ‘মিসম্যাচ’। সেই ‘মিসম্যাচ’ কিভাবে সারাই করে কোষ, তার খোঁজ দিয়েছেন মডরিক। দেখা যায় প্রোটিন কণার স্রোতটি অনবরত ডিএনএর ‘প্রুফ’ দেখে যাচ্ছে। ‘ছাপা’য় সামান্য ভুলচুক হলেই ঠিক করে দিচ্ছে সে। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের কথাগুলো স্মরণ করা যাক। তারা বলেছে, ‘জীবিত কোষগুলো ঠিক কিভাবে কাজ করে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন বুড়িয়ে যায় দেহ কিংবা পারিবারিক রোগগুলো কেন বংশপরম্পরায় তাড়া করে বেড়ায়, তারই ব্যাখ্যা দিয়েছে ওদের সুসংগঠিত কাজ। ব্যাপকভাবে সাহায্য করছে ক্যান্সার চিকিৎসাতেও।’

একদল বিজ্ঞানী সম্ভাবনার দুয়ার খোলেন, আরেক দল এসে সেই দুয়ার দিয়ে অজানা জগতে প্রবেশ করে অজানাকে জয় করেন। ডিএনএর মেরামতির বিষয়টি ভবিষ্যতে শুধু ক্যান্সার নয়, প্রাণহন্তারক বহু ব্যাধির চিকিৎসার কাজে লাগতে পারে। অমরত্বের বাসনা মানবের প্রাচীনতম আকাক্সক্ষা। দেহকে চিরজীবী করতে না পারলেও বিজ্ঞান একদিন মানবের আয়ু বিস্ময়করভাবে প্রলম্বিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবেÑ এমন একটি আশাও উঁকি দিতে শুরু করেছে ডিএনএ মেরামতি সংক্রান্ত গবেষণার অগ্রগতিতে।