২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৭ বছরে দু’শতাধিক মৎস্যজীবী খুন

  • সুন্দরবনে দস্যুবাহিনীর দাপট

নিজস্ব সংবাদদাতা, বরগুনা, ৯ অক্টোবর ॥ ইলিশ মৌসুমের শুরুতেই বরগুনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলদস্যুদের উৎপাত বেড়ে যায়। সুন্দরবনকে ঘাঁটি করে ছোট-বড় দস্যুবাহিনী রাম রাজত্ব তৈরি করে। গভীর সমুদ্রে জেলেরা জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। আর জেলেদের জীবন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত। গত ৭ বছরে ২০৯ জন জেলে জলদস্যুদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। মাসখানেক আগে পাথরঘাটার ১১ জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। ২২ সহস্রাধিক জেলে ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। জেলেদের অপহরণ করে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে। গত ৩ বছরে ৫৪ দস্যু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পরও তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন বাহিনী। বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলার ৫০ লাখের বেশি মানুষ সাগর ও নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এর মধ্যে বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলার জেলেরা জলদস্যুদের কাছে সবচেয়ে বেশি জিম্মি হয়ে পড়ে। জলদস্যুদের উৎপাত বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। জলদস্যুদের তা-বে জেলেদের জীবিকা নির্বাহের পথ বন্ধ হতে চলেছে।

ভুক্তভোগী জেলেরা জানান, বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবন থেকে শুরু করে ভোলার তজুমদ্দিন, কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র, গলাচিপার মোহনা, সোনারচর ও মেঘনা অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় সারাবছরই ডাকাতের উপদ্রব থাকে। আমরা গভীর সাগর ও নদীতে ট্রলারে মাছ শিকারে গেলে ডাকাতের কবলে পড়ি। বাধা দিলে সাগরে নিক্ষেপ অথবা গুলি করে হত্যা করে চলে যায় দস্যুবাহিনী। অনেক ক্ষেত্রে ট্রলারসহ জেলেদের আটক রেখে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। আটক অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে জেলেরা মুক্তিপণের অর্থ প্রদানে বাধ্য হয়। জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ অঞ্চলে ‘বিশেষ দস্যু পাস’ প্রথা চালু রয়েছে। এ জন্য প্রতি মৌসুমে প্রতিটি ট্রলার বাবদ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম প্রদান করে এই ‘দস্যু পাস’ সংগ্রহ করতে হয়। ছোট-বড় অন্তত ২০টি দস্যুবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে দক্ষিণাঞ্চলের অপরাধ জগত। বছরের পর বছর ধরেই তাদের অপতৎপরতা চলছে। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এসব বাহিনীর ক্যাডাররা সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে। অপহরণ, চাঁদাবাজি, লুটপাটের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। দস্যুরা ছদ্মবেশ ধারণ করে মাছ শিকারের নামে বাঘ ও হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী শিকার করে পাচার করছে। এদিকে গত তিন বছরে সুন্দরবনে র‌্যাব, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সংঘটিত ৩৪টি বন্দুকযুদ্ধে ৫৪ বনদস্যু নিহত হয়েছে। র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সুন্দরবনের মূর্তিমান আতঙ্ক জুলফু বাহিনী প্রধান জুলফিকারসহ চার দস্যু নিহত হয়। জুলফিকার মারা যাওয়ার পরই তার বাহিনীর আরেক সদস্য গামা বাহিনী নামে আত্মপ্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত গামাও বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে প্রতি ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাছ ধরার ভরা মৌসুম, এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত মধু ও মোম এবং বছরের অন্য সময় গোলপাতা আহরণের মৌসুম থাকায় প্রায় বছরজুড়েই বনে দস্যুদের অপতৎপরতা থাকে। দস্যুরা জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার পাশাপাশি বন বিভাগের বিভিন্ন টহল ফাঁড়িতেও হানা দেয়। র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও বন বিভাগসহ স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সুন্দরবনে ছোট-বড় মিলে ২০টি দস্যুবাহিনী বিচরণ করছে। একাধিক সূত্র জানায়, সুন্দরবনে রাজু, গামা, নাসির, নূর হাবিব, শহিদ, সোবাহান, নানা-মহুবর, বড় ভাই-মাইজ্যা ভাই, কবির, বাদল, মুকুল, সাকাত, আনোয়ার, বেলাল, সজল, জালাল, মাহাতাব, সিদ্দিক, জিহাদ, বাদল বাহিনী বিভিন্ন সময়ে মূর্তিমান আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে। এদের মধ্যে নাসির বাহিনীর প্রধান নাসির, জুলফু বাহিনী প্রধান জুলফিকার, হাফিজুর রহমান, সানোয়ার হোসেন সানু, মেঘনা জাকির, গামা, বড় ভাই, মাইজ্যা ভাই, জিহাদ ও বাদল নিহত হয়েছে। বিভিন্ন সময় একাধিক বাহিনীর প্রধান ও সেকেন্ড ইন কমান্ডার নিহত হলেও তাদের তৃতীয় অথবা চতুর্থসারির ক্যাডাররা দল টিকিয়ে রাখে। সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের চাঁদপাই এবং শরণখোলাসহ পাঁচটি রেঞ্জ এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টের গহীন বনে রয়েছে এসব দস্যু দলের নিরাপদ আস্তানা।

কোস্টগার্ডের একটি সূত্র জানায়, তারা সুন্দরবনের ২০টি দস্যু দলের প্রধানের নামের তালিকা তৈরি করেছে। তালিকানুযায়ী বিভিন্ন সময় তারা র‌্যাবের সহায়তা নিয়ে সুন্দরবন, দুবলারচর ও হিরণ পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। এদিকে বাংলাদেশের জলসীমায় ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশের ঘটনাও গত কয়েক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবন উপকূলে জেলেদের ওপর জলদস্যু উপদ্রবের মতো নতুন আরেক আতঙ্ক চেপে বসেছে। মৎস্য ব্যবসায়ী নামধারী একটি ক্ষমতাশালী চক্র এ আতঙ্কের স্রষ্টা। যে কারণে পাথরঘাটা, বরগুনা, নিদ্রাসখিনা, মহিপুর, পাড়েরহাট, রায়েন্দাসহ বিভিন্ন মৎস্যবন্দরকেন্দ্রিক জেলেরা আসন্ন ইলিশ মৌসুমে বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবন উপকূলে ইলিশ শিকারে যেতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

র‌্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবির বলেন, গভীর সমুদ্রে জলদস্যু, বনের বনদস্যুসহ ডাকাত তৎপরতা নির্মূলে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাকিতায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সর্বশেষ ‘সাগর-সৈকত’ বাহিনীর প্রধান নিহত হয়েছে।