২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বদলে গেছে পেশা ॥ সময়ের দাবিতে

  • এক শতকে বিলুপ্ত অসংখ্য লোকজ পেশা

আজ থেকে তিন-চার দশক আগেও বাংলাদেশের গাঁ-গেরামে কম-বেশি দেখা গেছে পালকি। তারও আগে পালকি ছিল অভিজাত পরিবারের লোকজন বিশেষ করে নারীদের একমাত্র বাহন। অন্তত নববধূ আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে পালকি। এরও আগে পালকিতে ছিল জমিদার কিংবা নায়েব-গোমস্তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। আর এ পালকি ঘিরে গড়ে উঠেছিল ‘বেহারা’ বা ‘কাহার’ নামের পেশাজীবী গোষ্ঠী। কাঁধে পালকি বয়ে নিয়ে যাওয়া ছিল তাদের জীবিকার একমাত্র উৎস। কালক্রমে পালকি যেমন হারিয়ে গেছে, তেমনি হারিয়ে গেছে-হুম-হুম-হুম না, শব্দের ছন্দে ছুটে চলা বেহারা জনগোষ্ঠী। বেহারাদের মতো বাংলার বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীগুলোর লোকজন সময়ের দাবিতে বেছে নিয়েছে নানা পেশা। আজ যা জীবিকার প্রধান অবলম্বন, সময়ের বিবর্তনে তা হয়ে পড়ছে ইতিহাস।

পেশার পরিবর্তন কেবল এ দেশ-জনপদেই নয়। পৃথিবীর সব দেশেই তা ঘটছে। আর তা ঘটছে নানা কারণে। প্রধানত আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে পেশার পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। সময়ের চাহিদা মেটাতেও বিলুপ্ত হচ্ছে অনেক পেশা। শিক্ষা ও সংস্কৃতির কারণেও ঘটছে পেশার পরিবর্তন। আসছে নতুন নতুন পেশা। আবার জলবায়ুর পরিবর্তনেও ঘটছে পেশার পরিবর্তন। মানুষের স্থান পরিবর্তনেও পেশায় আসছে বৈচিত্র্য। এমন নানা কারণে দেখা যায় মাত্র ১০-২০ বছর আগেও যে পেশা ছিল জমজমাট, আজ তা ম্রিয়মাণ। হয়ত আর কিছুদিন পরে তার অস্তিত্বই মিলবে না। এ জনপদে বসবাসকারী জাতিগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস-ঐতিহ্য পর্যালোচনায় এমন অনেক পেশার নাম উঠে এসেছে, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে শুধু অপরিচিতই নয়, অবিশ্বাস্যও বটে।

বাংলাদেশের প্রাচীন পেশাগুলোর অন্যতম হচ্ছে ‘বহুরূপী’। মুখে দেব-দেবী বা জীবজন্তুর মুখোশ বেঁধে, গায়ে রংচঙে পোশাক পরে, পায়ে ঘুঙুর নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এ পেশাজীবীরা অর্থ উপার্জন করেছে। বহুরূপীদের ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, এ পেশাজীবীরা এক সময়ের শক্তিশালী অভিনেতা উমর-ই-ইয়ারের উত্তরাধিকারী। ‘উমর-ই-ইয়ার’ বাংলার ন্যায় বিচারক হিসেবে পরিচিত বাদশাহ নওশিরবানের দরবারে অভিনয় করতেন। শুরুতে বহুরূপীরা মুখে গাবের রং মেখে ও নকল দাড়ি-গোঁফ লাগিয়ে অভিনয় করে মানুষ হাসাত। পরবর্তীতে পেশাটিতে ধর্মের আবরণ দেয়া হয়। যেমন রাধাকৃষ্ণ কিংবা শিবপার্বতী সেজে অভিনয় করেছে। এতে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ধর্মীয় অনুভূতির সৃষ্টি হয়। যা তাদের বাড়তি উপার্জনে সহায়ক হয়েছে। পরবর্তীতে অন্যান্য ধর্ম-বর্ণের মানুষের মাঝে এ পেশা ছড়িয়ে পড়লেও এখন এ পেশাজীবীরা পুরোপুরি বিলুপ্ত। যারা বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মানুষকে বিমোহিত করেছে, তারা ‘বাজুনিয়া’ নামে সমধিক পরিচিত ছিল। এদের মধ্যে আবার সানাইবাদক, একজন তবলাবাদক ও একজন ঝনঝাবাদক তিনে মিলে গঠিত দলকে বলা হতো ‘রওনক চওকি’। সাতজনের বাদক দল নিয়ে গঠন করা হতো ‘নাকাড়া’। যদিও নাকাড়া এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র বিশেষ। যা বাজিয়ে রাজদরবারে সময় নির্দেশ করা হয়েছে। বাইজি ও বাদকদের নিয়ে গঠিত দলকে ‘তায়ফদার’ বলা হতো। গরুর গাড়িতে যারা মালামাল বহন করে পেটের খাবার যোগাত, তারা ‘বলদিয়া’ বলে পরিচিত ছিল। ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের বেপারি, বানজারা ও লাম্বাদি নামে ডাকা হতো। যারা আজকে মেথর হিসেবে পরিচিত, তাদের পূর্ব পুরুষরা এক সময়ে মুসলমান হলে ‘বেলদার’ আর হিন্দু হলে ‘ভূঁইমালি’ উপাধি পেয়েছে। ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা এদের জীবিকার প্রধান উৎস। আজকে যারা মুদি দোকানদার, তারা এক সময়ে ‘ভাটিয়ারা’ হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের বিবর্তনে মুদি ব্যবসা রয়ে গেলেও পেশার নামটি পাল্টে গেছে। ব্রিটিশ আমলে ভাটিয়ারাদের একটি গোষ্ঠী মুদি ব্যবসার পাশাপাশি রাঁধুনী কুলির কাজ করেছে, তাদের ‘বাক্কল’ বলা হতো। এক সময়ে হিন্দু চামড়া ব্যবসায়ীরা ‘ঋষি’ আর মুসলমানরা ‘ফরোশ’ নামে পরিচিত ছিল। ঋষিদের আরেকটি গোষ্ঠী এখনও ‘মুচি’ হিসেবে পরিচিত। যারা প্রধানত জুতো সেলাই করে।

দক্ষিণাঞ্চলে এখনও বহু মানুষ রয়েছে, যাদের নামের শেষে বংশ পরিচয় হিসেবে ‘ঘরামি’ লেখা বা বলা হয়। মূলত ঘরামি একটি পেশা। একটা সময়ে এ অঞ্চলের মানুষ ছনের ছাউনি দেয়া ঘরে বসবাস করেছে। আর ছাউনি দেয়ার কাজটি বংশানুক্রমে ঘরামিরা করত। ঘরামিদের ঢাকা অঞ্চলে ‘ছাপরা-বন্ধ’ হিসেবে ডাকা হতো। বংশ পরিচয়ে ঘরামি শোভা পেলেও বাস্তবে ঘরামি পেশা লুপ্ত হয়ে গেছে। এর পরিবর্তে এসেছে ইট-কাঠ-টিনের ঘর। নতুন পেশা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে রাজমিস্ত্রি। জমিদারদের নির্দেশে লোক ধরে আনার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল ‘পেয়াদা’ গোষ্ঠী। পেয়াদারা নিজেদের অভিজাত মনে করত। কোন কোন অঞ্চলে পেয়াদারা দফাদার নামে পরিচিত। সুন্দরবন অঞ্চলে নলখাগড়া দিয়ে যারা ধামা এবং মোটা মাদুর বানাত, তারাও পেয়াদা নামে পরিচিত ছিল। এখন পেয়াদারা টিকে আছে শুধু কাগজপত্রে। বাস্তবে তারা নানা পেশায় ছড়িয়ে গেছে। পেশাজীবী ‘দাই’ সদর্পে এখনও আমাদের সমাজে টিকে থাকলেও এক সময়ে তারা দুধ-মা, নারকাটা বা ধাত্রী হিসেবে পরিচিত ছিল। এক সময়ে এ পেশাটিতে নিম্ন শ্রেণীর বিশেষত হিন্দুদের মধ্যে চামার সম্প্রদায়ের নারীদের একক আধিপত্য ছিল। এখন সেটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। দাইদের নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে এখনও বিভিন্ন ধরনের সংস্কার রয়েছে। এক সময়ের দর্জিরা সময়ের দাবিতে ‘টেইলর’ হলেও ‘দস্তরবন্দরা’ কিন্তু হারিয়ে গেছে। দস্তরবন্দরা বিভিন্ন রঙের কাপড় দিয়ে মাথার হরেক রকমের পাগড়ি বানাত।

লেপ-তোষক-বালিশের তুলা পরিষ্কার করার কাজ এখন যন্ত্রে সারা হচ্ছে। যা ঘিরে এক সময়ে পেশাজীবী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। এরা ধুনকার, ধুনিয়া, তুলাওয়ালাসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। গোয়াল এবং গোয়ালা পৃথক দুটি পেশা। দক্ষিণাঞ্চলে গরু-মহিষের রোগব্যাধির চিকিৎসায় ‘গোয়াল’ আর গরু পোষাসহ দুধ বিক্রি করেছে ‘গোয়ালারা’। এর মধ্যে গোয়াল পেশাজীবীদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। শল্য চিকিৎসকরা হাকিম, আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা বৈদ্য আর বনাজি গাছপালা দিয়ে চিকিৎসকরা কবিরাজ হিসেবে পরিচিত থাকলেও আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যার কলাণে এখন এসব পেশা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে আরেকটি প্রাচীন পেশা হচ্ছে ‘কলু’। গরুর সাহায্যে ঘানিতে পিষে বিভিন্ন ধরনের বীজ থেকে তেল বের করা এ পেশাজীবীদের কাজ। ময়মনসিংহ অঞ্চলে কলুদের একটি গোষ্ঠী ‘বক-কলু’ হিসেবে পরিচিত ছিল। এরা গরুর বদলে নিজেরা ঘানি টানত। যন্ত্রের ব্যবহার এ পেশাজীবীদের ইতিহাসের পাতায় নিয়ে গেছে। একইভাবে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেয়েছে ‘মশালচি’ নামের পেশাজীবী গোষ্ঠী। ছোট ছোট শহর-বন্দরে মশাল জ্বেলে রাতের আঁধার দূর এবং অভিজাত শ্রেণীর লোকজনদের আলোতে পথ দেখিয়ে এ পেশাজীবী গোষ্ঠী দু’বেলা খাবার জোটাত। বরিশাল অঞ্চল বরাবরই গরু-মহিষের জন্য বিখ্যাত। আর এ গরু-মহিষ ঘিরে একাধিক পেশাজীবী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। যার অন্যতম হচ্ছেÑ ‘কাকইকাঁটা’। গরু-মহিষের শিং দিয়ে এ জনগোষ্ঠীর মানুষ নানা ধরনের চিরুনি তৈরি করেছে। যা মানুষের কাছে কদর পেয়েছে। বিশেষ করে সূক্ষ্ম কারুকাজের জন্য নারীদের কাছে এর চাহিদা ছিল ব্যাপক। বাজারে নানা স্টাইলের চিরুনি চলে আসায় কাকইকাঁটারা হারিয়ে গেছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ‘লাঠিয়াল-সরদার’ পেশাজীবী গোষ্ঠীর লোকজনও। দু’/তিন দশক আগেও বরিশালের চরাঞ্চলে জমি দখলে লাঠিয়াল-সরদারদের ব্যাপক ব্যবহার করেছে মহাজন/প্রভাবশালীরা। লাঠিয়ালরা ঢাল, লেজা, সড়কি, রামদাসহ দেশী অস্ত্র নিয়ে সরদারের নেতৃত্বে ‘হা-রে-রে’ ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রতিপক্ষের ওপর। মুহূর্তে ‘কল্লা’ পড়ে গেছে প্রতিপক্ষের। এখন লাঠিয়াল বাহিনীর তেমন প্রয়োজন হয় না। শহুরে মস্তান-ক্যাডাররাই সে দায়িত্ব পালন করছে। ফলে যেসব লাঠিয়াল-সরদারের নামে এক সময়ে প্রচ- আতঙ্কের সৃষ্টি হতো, এখন তারা নির্জীব। তাদের সময় কাটে স্মৃতিচারণে। ধানের ক্ষেতে পানি সেচের মেশিন নৌকায় বসিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘ট্রলার’। মানুষ এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছুটছে দ্রুত। ফলে নদী কিংবা খাল পাড়ি দেয়ার ‘পাটনি’ জনগোষ্ঠীর মানুষদের এখন আর দেখা মেলে না। চুল দাড়ি গোঁফ কাটার জন্য শহুরে সেলুন এখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও পেঁৗঁছে গেছে। ফলে হাঁটুর ওপর মাথা রেখে যেসব ‘নাপিত’ বা ‘শীল’ সম্প্রদায়ের মানুষ চুল কেটে বংশপরম্পরায় জীবন কাটিয়ে দিয়েছে, তাদের অধিকাংশই পিতৃপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য কিছু হাতড়াচ্ছে। বরিশালের দক্ষিণাঞ্চলে শীতে যারা খেজুর গাছ কেটে রস বের করেছে, তাদের বলা হতো ‘শিউলি’। খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শিউলিরাও হারিয়ে যাচ্ছে। খতনা করানোর জন্য শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা এখন ছুটছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কিংবা চিকিৎসকের কাছে। অথচ তিন-চার দশক আগেও এ কাজটি করেছে এক শ্রেণীর পেশাজীবী। যারা ‘ওস্তা’ নামে পরিচিত ছিল। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তারা খতনার কাজ করেছে। ওস্তারা কোথাও ‘খোনকার’, ‘খুন্দকার’ কোথাও ‘হাজাম’ নামে পরিচিত ছিল। ওস্তারা হারিয়ে গেছে। গ্রামীণ পাঠশালাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় ‘প-িত’ নামের পেশাজীবীদেরও আর দেখা মেলে না। গত এক-দু’ শতকে অসংখ্য লোকজ পেশা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে কিছু পেশা অবশিষ্ট থাকলেও সেগুলো বিলুপ্তির প্রহর গুনছে। এর কিছু কিছু বিবরণ অনুসন্ধিৎসু ঐতিহাসিকরা তুলে ধরেছেন। কিন্তু বাকিরা রয়ে গেছে ইতিহাসের অন্ধকারে। এক পেশা বিলুপ্ত হবে। আরেক পেশা নতুন করে ঠাঁই করে নেবে; এটিই সময়ের দাবি। এর অন্যথা হওয়ার জো নেই।

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে