১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাখাইনরা কৃষির বদলে এখন ব্যবসায়ী

সাগর পাড়ের জনপদ কলাপাড়ায় আদিবাসী রাখাইনদের পেশা বদলে গেছে। তবে পেশার পরিবর্তনে তাদের কোন উচ্ছ্বাস নেই। নেই জৌলুস। বরং রয়েছে বিষাদ। কৃষি ছিল এদের প্রধান পেশা। প্রত্যেকটি পরিবারের ছিল অঢেল কৃষি জমি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসতি বেড়ে যাওয়ায় রাখাইন পরিণত হয় সংখ্যালঘুতে। নিজস্ব জীবন ধারণ পদ্ধতি ও সংস্কৃতি চর্চায় প্রতিবন্ধকতাসহ বহুমুখী সমস্যার পাশাপাশি জমিজমা দখলের কারণে অধিকাংশ রাখাইন এ জনপদ ছেড়ে বার্মাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে চলে গেছে। এককালের দাপুটে এ জনগোষ্ঠীর এখন যারা রয়েছে তারা ক্ষয়িষ্ণু সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ১২শ’ রাখাইন জনগোষ্ঠী কলাপাড়ায় বসবাস করছে। ভূ-সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার কারণে রাখাইন জনগোষ্ঠীর পেশা পাল্টে গেছে। এখন ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের পেশার পাশাপাশি সরকারী-বেসরকারী চাকরিতে ঝুঁকছে কেউ কেউ। শিক্ষার প্রতি তাদের বেড়েছে অদম্য উৎসাহ। পেশা বদলের কারণে বদলে যাচ্ছে এ জনগোষ্ঠীর জীবনধারা। অধিকাংশ রাখাইনের দাবি সোৎসাহে নয়, কোন উপায় না পেয়ে জীবিকার প্রয়োজনে তারা বাধ্য হয়েছে পেশা পাল্টাতে।

বালিয়াতলী ইউনিয়নের হাড়িপাড়া রাখাইন পল্লীর সামনেই কুয়াকাটাগামী বিকল্প সড়কের পাশে ছোট্ট দোকান রয়েছে ২৩ বছর বয়সী রাখাইন অংচানের। স্টেশনারিসহ বিভিন্ন সামগ্রীর পাশাপাশি ছোট্ট দোকানে রয়েছে কসমেটিক্স সামগ্রী। ছয় বছর আগে দোকানটি চালু করে অংচান। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া জানা এ যুবক জানায়, অর্থাভাবে শিক্ষার দৌড় থমকে গেছে। তার বাপ-দাদা এখনও জীবিত রয়েছেন। বাবা কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। দাদা বয়সে প্রবীণ। তার একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। কাঁকড়া-মাছ শিকার করেন। অংচানের বাপ-দাদার মূল পেশা ছিল কৃষি। জমি, বিত্ত-বৈভব সবই ছিল। কিন্তু দখলসহ নানা উপদ্রবে কিছু জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। বাকি জমির দখল হারিয়ে ফেলেছেন। এখন তাদের ছয়জনের সংসার চলছে ভিন্ন-ভিন্ন পেশার উপার্জনে। এনজিও থেকে নেয়া ক্ষুদ্রঋণের যোগানে কোনমতে দোকানটি সচল রাখার কথা জানায় অংচান।

একই পল্লীর ক্ষুদে দোকানি থম্রাউ জানালেন, বাপ দাদার ৪০ বিঘা জমি ছিল। ছিলেন তারা গৃহস্থ পরিবার। ওইসব অতীত ষাট বছর বয়সী থম্রাউ এখন আর ঘাটতে চান না। নিজে কয়েক বছর বর্গা কিংবা একসনায় অন্যের জমি চাষাবাদ করেছেন। তারপরে মাছের ব্যবসা করেছেন। তাও টেকেনি। এখন স্ত্রী-সন্তান-নাতিদের নিয়ে পাঁচ জনের সংসারের ভরসা ক্ষুদে দোকান। একই বক্তব্য ৭২ বছর বয়সী রাখাইন থনচিংয়ের। দাদার প্রচুর কৃষি জমি ছিল। বাবার জীবদ্দশায় তাদের জমি শেষ। নিজে কয়েক বছর একসনা কিংবা বর্গাচাষী হিসেবে পেশার ঘানি টেনেছেন। এখন কৃষিকাজ বাদ দিয়েছেন। ক্ষুদে দোকান ছাড়াও ছেলেরা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় কুচে-কাঁকড়া ধরে জীবিকার চাকা কোনমতে ঠেলছেন। আট জনের সংসারের ধকল বইতে সবাই এখন কাহিল। হাড়িপাড়ার ১৪টি পরিবারের মাত্র তিনটি কৃষিকাজ করছে। তাও অন্যের জমিজমা বর্গা কিংবা একসনা রেখে। বাকি পরিবারগুলোর সবাই রয়েছে দুর্বিসহ দশায়। প্রত্যেকটি রাখাইন পল্লীর বাসিন্দার একই দশা। কারও পেশায় নেই জৌলুস।

পটুয়াখালী জেলা রাখাইন বুদ্ধিস্ট ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বাবু উথাচিং জানালেন, তাদের আমখোলা পাড়ায় এখনও বসবাস করছে ৪৯টি পরিবার। এরমধ্যে ৩০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিঃস্ব, ভূমিহীন হয়ে গেছে। ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, বাধ্য হয়ে পেটের যোগান দিতে এসব পরিবার চোলাই মদ উৎপাদন করে বিক্রি করছে, নিজেরাও খায়। তার দেয়া তথ্যমতে শতকরা ৯০ জন জমিজমা হারিয়ে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছে। এ পল্লীর দু’চারজন চাকরি করছে। জমি হারানোর মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে গেছে অনেকে। সরকারীভাবে কুয়াকাটায় ১৯৯৮ সালে দুস্থ রাখাইন নারীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আড়াই শ’ কক্ষের দ্বিতল মার্কেট করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৪টি কক্ষের একতলা পর্যন্ত নির্মাণ করার পর ওই প্রকল্প আর সামনে এগোয়নি। ১৪টি দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রথম দু-চার বছর দোকানগুলো জমজমাটই ছিল। এখন প্রায় সময় বন্ধ থাকে। অধিকাংশের দাবি পুঁজি সঙ্কটে এমন অবস্থা হয়েছে। এক সময় প্রত্যেকটি রাখাইন পাড়ায় অবস্থাপন্ন বাড়িতে তাঁত ছিল। তাঁতের লুঙ্গি, চাদর বুনতেন রাখাইন নারীরা। এখন তাও নেই। তবে কেউ কেউ তাঁত বন্ধ করে উলের চাদও বুনে বিক্রি করছে। এভাবে কলাপাড়ায় বর্তমানে ২৬টি রাখাইন পল্লীর বাসিন্দা পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে। ছিটকে পড়েছে মূল পেশা কৃষি থেকে।

Ñমেজবাহ উদ্দিন মাননু

কলাপাড়া থেকে