২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গুগলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ইউরোপিয়ান কমিশনের

ইউরোপের বাজারে মার্কিন সার্চ ইঞ্জিন গুগলের একক আধিপত্যের যে অভিযোগ ইউরোপিয়ান কমিশন এনেছে, তাকে অযৌক্তিক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে গুগল যদি জনপ্রিয়তার অপব্যবহার করে থাকে, তাহলে তা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেই মত তাদের। ১০ সপ্তাহের মধ্যে এ অভিযোগের জবাব দিতে বলা হয়েছে গুগলকে। এদিকে, এ অভিযোগকে অনৈতিক এবং অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং গুগল। ইন্টারনেটে যে কোন কিছু সহজে খুঁজে পেতে হলে গুগলের সাহায্য যেন না পেলেই নয়। সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগল এতটাই পরিচিত যে, এ ওয়েবসাইটটির ওপরই নির্ভরশীল অধিকাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। কিন্তু সম্প্রতি ইউরোপিয়ান কমিশন বলছে, অনলাইনের বাজারে একক আধিপত্য বিস্তার করছে গুগল। আর এভাবে গুগল নিজেদের পণ্য আর সেবার বিজ্ঞাপনকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও রয়েছে অভিযোগ। অথচ ইউরোপের অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষই অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে গুগলকে। যেখানে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে এ হার ৭০ শতাংশ। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ওয়ারেন গ্রিমস বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের এমন অভিযোগে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, কারণ ইউরোপে গুগল ব্যবহারকারীর অভাব নেই, কিন্তু ইয়াহুর চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু তো গুগল করছে না। ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াহু ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম। এটি তো গুগলের কোন দোষ নয়। তবে, গুগল যদি এই জনপ্রিয়তার অপব্যবহার করে তবে অপরাধ বলেই গণ্য হবে।’ এদিকে, এ অভিযোগের কারণে তোপের মুখে পড়েছে গুগলের মোবাইল এ্যাপ্লিকেশনগুলো। এছাড়া, গুগলে কোন কিছু সার্চ দিলে সর্বপ্রথম গুগল ম্যাপস, গুগল প্লাস, গুগল শপিং সার্ভিসকে দেখানো হয় বলেও অভিযোগ ইইউ’র। ইইউ কম্পিটিশন কমিশনার মার্গ্রেথ ভেস্তাগার বলেন, ‘আপনি গুগলে যাই সার্চ দেন, গুগল প্রথমে আপনাকে তাদের শপিং সার্ভিসের সন্ধান দেবে। এটি অবশ্যই জনপ্রিয়তার অপব্যবহার। এজন্য গুগলকে জরিমানা দিতে হতে পারে।’ এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে কয়েক শ’ কোটি ডলারের জরিমানা গুনতে হতে পারে গুগলের। তাই ইইউ’র এ অভিযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, মার্কিন টেক জায়ান্টগুলোর ক্ষমতা আর জনপ্রিয়তা কমাতেই এমন অভিযোগ তুলেছে ইইউ। গুগলের এ্যান্ড্রয়েড এ্যাপস এ ট্রোজান হর্স পাওয়া গেছে। এই ঘটনা প্রযুুক্তির বাজারে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। গত কিছুদিন ধরে এই খবর সর্বত্রও ছড়িয়ে পড়ে। এখন কিছু প্রতিষ্ঠান গুগলের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছে। গত কিছুদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে মাইক্রোসফটসহ ১৭টি প্রযুক্তি পণ্য নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এক জোট হয়ে গুগলের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছে। নকিয়া মাইক্রোসফট, ওরাকলসহ ১৭টি প্রতিষ্ঠানের এ জোটের অভিযোগ হচ্ছে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের জন্য তৈরি গুগলের এ্যান্ড্রয়েড এ্যাপসটিতে ‘ট্রোজান হর্স’ আছে, যে ইউজার গুগল এর এ্যান্ড্রয়েড এ্যাপসটি বাবহার করবে তার সমস্ত তথ্য গুগল পেয়ে যাবে। এতে করে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য অনাকাক্সিক্ষতভাবে গুগল পেয়ে যাবে। ট্রোজান হর্স যা আমন এক ধরনের ভাইরাস যা মোবাইল ইন্টারনেটের বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। গুগলের এ নিজস্ব এ্যাপ্লিকেশনগুলো ব্যবহারের জন্য ব্যবহারকারীকে বাধ্য করছে গুগল কর্তৃপক্ষ। এদিকে এ ব্যাপারে গুগল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সহযোগিতা করবে।

এ ধরনের একচেটিয়া আচরণের অভিযোগ নিয়ে পাঁচ বছরের তদন্ত শেষে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নীতিবিষয়ক কমিশন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নীতিবিষয়ক কমিশনার মার্গ্রথে ভেস্টাগার জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অনুসন্ধান বাজারে একক আধিপত্য বিস্তার করে আছে প্রতিষ্ঠানটি। একচ্ছত্র প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য গুগলের কাছে আনুষ্ঠানিক ‘স্টেটমেন্ট অব অবজেকশন’ পাঠাবে ইইউ। কার্যকারিতা বিবেচনায় এটিকে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র বলা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে নিজেদের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অবৈধ পন্থা অবলম্বনের বিষয়ে কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে তিনি অবগত আছেন বলেও উল্লেখ করেন। তার মতে, অনলাইন শপিং খাতে আধিপত্য বাড়াতে অনেকটা কৃত্রিমভাবে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে কাজ করেছে গুগল। গ্রাহকের অনুসন্ধানের সঙ্গে ফলাফলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি মোটেও বিবেচনায় নেয়া হয়নি, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নীতিমালার পরিপন্থী। এ ধরনের সমস্যার সমাধানে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব নীতিতে পরিবর্তন বা অনুসন্ধান সেবাকে পুনঃসজ্জিত করতে বাধ্য করা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নীতিবিষয়ক কমিশনের মূল লক্ষ্য নয়। এক্ষেত্রে গুগলকেই নিশ্চিত করতে হবে যে, তারা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য কোন অবৈধ পন্থা অবলম্বন করছে না। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপের মুখে অনুসন্ধান ফলাফল প্রদর্শন নীতিতে পরিবর্তন আনতে রাজি হয়েছিল গুগল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির গৃহীত পদক্ষেপে সন্তুষ্ট হননি অভিযোগকারী ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা। ফলে অমীমাংসিতই থেকে যায় বিষয়টি। ২০১০ সাল থেকে মাইক্রোসফট, ট্রিপ এ্যাডভাইজার, স্ট্রিটম্যাপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গুগলের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতাবিমুখ আচরণের বিষয়ে তদন্ত করে আসছে ইইউ। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ ছিল, অবৈধভাবে গ্রাহকের অনুসন্ধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লিংকের মধ্যে প্রতিযোগীদের থেকে গুগল প্লাস, গুগল ম্যাপস, ইউটিউব মিউজিক ও ভিডিও, এডওয়ার্ডস প্লাটফর্মের বিজ্ঞাপনের লিংকগুলোকে প্রাধান্য দেয় গুগল। গুগলের জনপ্রিয় মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম এ্যান্ড্রয়েডের মাধ্যমে এ্যান্টিট্রাস্ট আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে আরও একটি তদন্ত শুরু করেছে ইইউ। অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের মাধ্যমে অন্য প্রতিষ্ঠানের সার্চ সেবা সরবরাহে বাধা দিচ্ছে গুগল। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনলাইন বিজ্ঞাপন খাত থেকে রাজস্ব অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক মোবাইল ডিভাইস। আর নিজস্ব অনুসন্ধান সেবা ডিফল্ট হিসেবে ব্যবহারে বাধ্য করে অবৈধভাবে সুবিধা নিচ্ছে গুগল।

দিনে দিনে এন্ড্রোয়েড ফোনগুলো ক্রেতাদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তার কারণ অবশ্য এক কথায় বলা যায়, এন্ডোয়েড মোবাইল ফোনে যে কোন এপ্লিকেশন ইনস্টল করা সহজ। শুধু মাত্র এ্যাপলের তৈরি স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে নয়। কেননা সেই প্রশ্নের দিকে না গিয়ে, বরং বিশ্বখ্যাত সার্চ ইঞ্জিন গুগলের দিকে সমালোচনার তীর উঠিয়েছেন অনেকে। তবে, সেই সমালোচনার উপযুক্ত জবাবও দিয়েছেন সুন্দর পিলাই, যিনি গুগল চীফ।গুগল চীফ এই সমালোচনায় বলেছেন, এন্ড্রোয়েড একটি খোলা জানালার মতো। এই এ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে গ্রাহকরা বিনামূল্যে তাদের প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ডাউনলোড করে নিতে পারেন। উন্মুক্ত বিশাল ভারচুয়াল দুনিয়ার সবকিছুই হওয়া উচিত বিনামূল্যে।

গুগলের এ্যাপস ও অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেম সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর অভিযোগের ভিত্তিতে ইইউ গুগলের অন্যান্য কার্যক্রমের বিষয়টিও পর্যবেক্ষণ করবে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, ইইউভিত্তিক ওয়েব সার্চের প্রায় ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হয় গুগলের মাধ্যমে। এ অবস্থাকে গুগলের ‘কর্তৃত্ব’ বলে অভিহিত করেছে ইইউ।

এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো গুগলের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ও ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। আইকম্প নামের একটি কোম্পানি বলেছে, গুগল ইউরোপের মার্কেটে তাদের আধিপত্যের অপব্যবহার ও ভোক্তাদের ক্ষতি করছে যা উতরে উঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা অন্য কোম্পানিগুলোর জন্য অসম্ভব।উল্লেখ্য, গুগলের বিরুদ্ধে শুধু ইউরোপিয়ান ইউনিয়নই তদন্ত করছে না। তিন বছরের তদন্ত শেষে ভারতের কম্পিটিশন কমিশন গত সপ্তাহে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে যাতে গুগলের বিরুদ্ধে অন্যায় ব্যবসার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে এত কিছুর পরও এই কথা অনায়াসে বলা যায়, গুগলের গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বব্যাপী। শুধু তাই নয়, এমন সব প্রোডাক্ট আছে যা আজ গুগলের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। তাই যত কিছুই হোক না কেন গুগলের দিকে সমালোচনার তীর ছুড়ে খুব একটা লাভ হবে না। বরং গুগল প্রতিনিয়ত গবেষণায় একটি জিনিসকে প্রাধান্য দিয়েছে সেটা হলো বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত এ্যাপ্লিকেশনের ব্যবহার। ফেডারেল ট্রেড কমিশন সংক্ষেপে এফটিসি বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের গুগলের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে, আর দু’জন বিশেষ ব্যক্তিকে এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখন অপেক্ষার পালা। দেখা যাক গুগলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কিভাবে মোকাবেলা করে গুগল। তবে এটা ঠিক যে, গুগলের সেবা গ্রহণ করছেন পৃথিবীর কোটি কোটি এন্ড্রোয়েড ফোনের গ্রাহকরা

মূল : কনর ডটরসেপ্ট, নিউইয়র্ক টাইমস

অনুবাদ : রেজা নওফল হায়দার