১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশে ৩০ লাখ মামলার জট, তবে নিষ্পত্তির হার বাড়ছে

দেশে ৩০ লাখ মামলার জট, তবে নিষ্পত্তির হার বাড়ছে
  • তুলনামূলকভাবে দ্রুত শেষ হচ্ছে ডেথ রেফারেন্সের মামলাগুলো

বিকাশ দত্ত ॥ উচ্চ আদালতসহ সারাদেশের আদালতগুলোতে ৩০ লাখ মামলার জট থাকলেও মৃত্যুদ- নিশ্চিতকরণ অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) মামলাগুলো তুলনামূলকভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। গত বারো বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায় নিষ্পত্তির হার ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ডেথ রেফারেন্স শোনার জন্য হাইকোর্টে বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে সমস্ত অপরাধীদের মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে তাদের আপীলও দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে আপীল বিভাগে। পিলখানায় বিডিআর হত্যা রায় শেষে হাইকোর্টের স্পেশাল বেঞ্চে ডেথ রেফান্সের শুনানি চলছে। রমনা বোমা হামলা ও চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার ডেথ রেফারেন্স ও হাইকোর্টে এসেছে। জঙ্গী শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ ছয় জঙ্গীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর এখনও ২১ জন জঙ্গী কারাগারে আছে। তাদের ডেথ রেফারেন্স দীর্ঘদিন ধরে শুনানির অপেক্ষায় আছে হাইকোর্টে। সুপ্রীমকোর্ট সূত্রে জানা গেছে, আনুষঙ্গিক কাগজপত্র রেডি হলেই এ সমস্ত মামলার শুনানি শুরু হবে। এদিকে আইন কমিশন মামলা দ্রুত নিষ্পাত্তির জন্য আরও বিচারক নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেছেন, তুলনামূলকভাবে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ সুপ্রীমকোর্টের প্রশাসনও কঠোরভাবে মনিটর করছে। সেকশন থেকে মামলার দ্রুত নথি দেয়া, পাশাপাশি পেপারবুক তৈরিতে যাতে বিলম্ব না হয় সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। বর্তমানে সুপ্রীমকোর্ট অবকাশকালীন ছুটি চলছে। এক নবেম্বর কোর্ট খোলার পর বেঞ্চ গঠন করা হবে। সেখানে ডেথ রেফারেন্সের জন্য বেঞ্চ বাড়ানো হতে পারে। বেঞ্চ বাড়লে অবশ্যই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।

সুপ্রীমকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৩৮টি, নিষ্পত্তি হয়েছে ১০১টি। ২০০৫ সালে বিচারাধীন ৪৬৪টি নিষ্প্িতত হয়েছে ৪৯টি, ২০০৬ সালে বিচারাধীন ৫১১টি নিষ্পত্তির হয়েছে ৬৫টি, ২০০৭ সালে বিচারাধীন ৪৬৫নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪৮টি, ২০০৮ সালে বিচারাধীন ৪৭৪ নিষ্পত্তি ১২৮, ২০০৯ এ বিচারাধীন ৫০৯ নিষ্পত্তি ৪৮টি, ২০১০ সালে বিচারাধীন ৫৪২ নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৩টি, ২০১১ সালে বিচারাধীন ছিল ৫৩৫ নিষ্পত্তি হয়েছে ৭৪টি, ২০১২ সালে বিচারাধীন ছিল ৪৫০ নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪৫টি, ২০১৩ সালে বিচারাধীন ৪০৬ নিষ্পত্তি ১১১টি, ২০১৪ সালে বিচারাধীন ৩৬৩ নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩৫টি, ২০১৫ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বিচারাধীন ছিল ৩৭৯টি নিষ্পত্তি হয়েছে ৩১টি। একটি সূত্র জানায়, পদ্ধতিগত কারণে মামলা দীর্ঘ জটভুক্ত হচ্ছে। সনাতনী পদ্ধতিগত কারণে মামলাজট বেড়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ হয়ে গেছে। এখন মামলাজট দূর করতে আইনমন্ত্রী বা সরকারের কোন ভূমিকা নেই।

বিডিআর হত্যা মামলা ॥ এদিকে বিচারপতি মোঃ শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিশেষ বেঞ্চে বিডিআর হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি চলছে। বিশেষ এই বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মোঃ নজরুল ইসলাম তালুকদার। প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ৫ নবেম্বর পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন স্থানে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে ঢাকা মহানগর তৃতীয় দায়রা জজ ড. আক্তারুজ্জামান পিলখানা হত্যাকা-ের রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদ-, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ-, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ও ২৭৮ জনকে খালাস দেয়া হয়। বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ১১৯টি ফৌজদারি আপীল, ১৪১টি জেল আপীল ও ১৫২ জনের মৃত্যুদ- নিশ্চিত করার জন্য একটি ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে দায়ের করা হয়। খালাসপ্রাপ্ত ২৭৮ জনের মধ্যে ৬৯ জনের বিরুদ্ধে আপীল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। সকল আপীল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধ ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদ- প্রাপ্ত বিএনপি ও জামায়াতের ৫ শীর্ষ নেতার আপীল নিষ্পত্তির পর এখনও নয়টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এরই মধ্যে কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের দ- কার্যকর করা হয়েছে। সাকা ও মুজাহিদের মৃত্যুদ- বহাল রেখে আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। এ দুটি মামলা এখন রিভিউয়ের অপেক্ষায়। আপীল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় যে সমস্ত মামলা রয়েছে সেগুলো হলো, মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাশেম আলী, আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কুত মোবারক হোসেন, জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির নেতা (পলাতক) আব্দুল জব্বার (রাষ্ট্রপক্ষ) জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের মাহিদুর রহমান এবং আফসার হোসেন চুটু। রাষ্ট্র পক্ষ আশা করছেন সুপ্রীমকোর্ট অবকাশ কালীন ছুটি শেষে এ মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে কার্যতালিকায় আসতে পারে।

জঙ্গীদের মামলা ॥ জঙ্গী শায়খ আবদুর রহমান, বাংলাভাইসহ ছয় জঙ্গীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর এখনও ২১ জন জঙ্গী কারাগারে আছে। ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন হরকাত-উল-জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ওরফে মুফতি হান্নানকে মৃত্যুদ-ের নির্দেশ দেয়া হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলায় ২৯ জঙ্গীকে মৃত্যুদ- প্রদান করেছেন বিভিন্ন আদালত। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জঙ্গীদের মধ্যে আরিফুর রহমান ওরফে হাসিব ওরফে আকাশ, সাউদুল মুন্সী ওরফে ইমন ওরফে পলাশ, মাসুদ ওরফে আনিসুল ইসলাম ওরফে ভুট্টু, আবদল্লাহ আল সোয়াইল ওরফে ফারুক ওরফে জাহাঙ্গীর ওরফে আকাশ, এনায়েতুল্লাহ জুয়েল ওরফে ওয়ালিদ, তৈয়বুর রহমান ওরফে হাসান, মামুনুর রশিদ ওরফে জাহিদ, আশ্রাফুল ইসলাম ওরফে আব্বাস খান ও আদনান সামী, হুজির জঙ্গী আরিফ হাসান সুমনও জেএমবি সদস্য মোঃ নিজাম উদ্দিন ওরফে রনি ওরফে রেজা, জঙ্গী আমজাদ হোসেন বাবু, এইচ এম মাসুমুর রহমান, কামারুজ্জামান ওরফে স্বপন, আক্তারুজ্জামান, আসাদুজ্জামান ও আবুল কালাম ওরফে শফিউল্লাহ কারাগারে আছে। এদের ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ॥ জামায়াতের আমির মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি মতিউর রহমান নিজামী ও লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদ-াদেশ দিয়ে চট্টগ্রাম স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর দেয়া দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে এসে পৌঁছেছে। গত ৩০ জানুয়ারি দশ ট্রাক অস্ত্র আটক সংক্রান্ত দু’টি মামলার মধ্যে চোরাচালান মামলার (বিশেষ ক্ষমতা আইনে) রায়ে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়াসহ ১৪ আসামিকে মৃত্যুদ- দেন চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১।

বাবর, নিজামী ও পরেশ বড়ুয়া ছাড়া ফাঁসির দ-াদেশপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোঃ আবদুর রহিম, পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাব উদ্দিন আহাম্মদ, উপপরিচালক মেজর (অব.) লিয়াকত হোসেন, এনএসআইয়ের মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খান, সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসিন উদ্দিন তালুকদার, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কে এম এনামুল হক, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব নুরুল আমিন, অস্ত্র বহনকারী ট্রলারের মালিক হাজি সোবহান, চোরাকারবারি হাফিজুর রহমান এবং অস্ত্র খালাসের জন্য শ্রমিক সরবরাহকারী দ্বীন মোহাম্মদ। এঁদের মধ্যে পরেশ বড়ুয়া ও নুরুল আমিন পলাতক।

মামলা জট ॥ বিচারক সংকট, সাক্ষীদের গড়হাজিরা, কিছু আইনজীবীর ভূমিকার কারণে দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালতে প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলা দায়েরের চেয়ে নিষ্পত্তির হার অনেকাংশে কম। ফলে প্রতিদিন নতুন করে মামলা জটে যুক্ত হচ্ছে সিংহভাগ মামলা। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে বিচারকের স্বল্পতা, আইনজীবীদের ভূমিকা, সর্বপরি মান্ধাতার আমলে দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা চলা। মামলা জট নিরসন ও নতুন বিচারক নিয়োগ, তাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ প্রদান, চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মোবাইল কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিধান রাখাসহ আইন কমিশন ব্যাপক কর্মপ্রক্রিয়ার সুপারিশ করেছেন। ১৬ কোটি মানুষের বিপরীতে অন্তত ৪ হাজার বিচারক প্রয়োজন। এত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেয়া সম্ভব না হলে প্রতিবছর অন্তত ২০০ জন নতুন বিচারক নিয়োগ করা যেতে পারে।