২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রধানমন্ত্রী সরাসরি খালেদা জিয়াকেই দায়ী করেছেন ॥ দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা

প্রধানমন্ত্রী সরাসরি খালেদা জিয়াকেই দায়ী করেছেন ॥ দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা
  • পাঁচ জেলার আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এখন বিদেশে বসে নতুন ষড়যন্ত্র করছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, নতুন কৌশল হিসেবে উনি (খালেদা জিয়া) দেশে থাকা বিদেশী নাগরিকদের হত্যা করে আতঙ্ক ছড়ানো এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন।

দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার জন্য সরাসরি খালেদা জিয়াকে দায়ী করে তিনি বলেন, দেশে থেকে দেশের মানুষ পুড়িয়ে আর বিদেশে থেকে দেশে বিদেশীদের মেরে উনার (খালেদা জিয়া) আন্দোলন! তবে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসের কোন স্থান হবে না। এদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিময় দেশ। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের দেশেও পরিণত হবে।

শনিবার গণভবনে চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর, গোপালগঞ্জ ও গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। লন্ডনে থাকা খালেদা জিয়াকে উদ্দেশে করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন বিদেশে বসে নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। সেই ষড়যন্ত্র কী? বিদেশে থেকে ওদিকে লবিস্ট রেখেছেন, যাতে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন জায়গায় জামায়াত ও বিএনপি মিলে নানা ধরনের অপপ্রচার এবং একটা প্যানিক (আতঙ্ক) ছড়ানো যায়। বিদেশে বসে বাংলাদেশে বিদেশীরা যারা আছেন তাদের হত্যা করে বিদেশীদের মধ্যে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি দেশে থেকে দেশের মানুষ হত্যা করেছেন। এখন আবার উনি বিদেশে গেছেন। বিদেশে বসে এখন দেশে একটা অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়েছেন। এখন নাকি উনি আন্দোলনের কৌশল পাল্টেছেন। সেই কৌশলই তিনি ব্যবহার করছেন। দেশে যারা বিদেশী মানুষ আছে, তাদের মেরেই তার আন্দোলন!

দেশবাসীকে সজাগ ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যখনই দেশের উন্নতি হয়, দেশ যখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মানজনক অবস্থানে যায়, তখনই বিএনপি-জামায়াত জোটে একটা অন্তপীড়া শুরু হয়ে যায়। দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। তখন তারা খুন করা, নানা ধ্বংসাত্মক কাজ করাসহ যা যা করা দরকার তাই করে। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট লবিস্ট রেখে ইউরোপ, ইউএসএ এবং ইউকেতে বদনাম আর প্যানিক ছড়াচ্ছে। তাদের অনেক টাকা আছে। হত্যা-খুন আর বিদেশে বসে অপপ্রচার চালিয়ে তারা দেশের বদনাম করছে। দেশের মানুষকেও এর বিরুদ্ধে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দু’দফা বিএনপি-জামায়াত জোটের দেশব্যাপী হত্যাযজ্ঞ ও নারকীয় সন্ত্রাসের কথা তুলে ধরে বলেন, বিএনপি নেত্রী দেশে নিজের অফিসে বসে আন্দোলনের নামে টানা ৯২ দিন মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে সম্পদ ধ্বংস করেছেন। জ্বালাও-পোড়াও আর মানুষ খুন করাই তার রাজনীতি। আর এখন বিদেশে বসে দেশকে অস্থিতিশীল করার নতুন ষড়যন্ত্র করছেন।

বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, খালেদা জিয়া বুঝেছেন তার আন্দোলনে জনগণ সাড়া দেয়নি। তার ডাকে দেশের মানুষ ন্যূনতম সাড়া দেয়নি। তিনি ঢাকাবাসীকে ডেকে দেখেছেন তারাও তার দিকে ফিরে তাকাননি। জ্বালাও-পোড়াও করে সরকার উৎখাত সেটাও তিনি পারেননি। সবদিক থেকে ব্যর্থ হয়ে আদালতেও হাজির হতে হয়েছিল, নিজের বাড়িতেও ফিরে গিয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ৯২ দিন বিএনপি নেত্রী তার পার্টি অফিসে বসে ৬৪ জন মানুষকে নিয়ে তিনি সরকার উৎখাত না করে ঘরে ফিরবেন না বলে ঘোষণা দিলেন। আর সরকার উৎখাত করতে তিনি নির্বিচারে মানুষ হত্যা করলেন। এমন বীভৎস্য দৃশ্য বোধহয় মানুষ কখনও দেখেননি। জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। শিশু-নারী কেউ তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

তিনি বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) দেশে থেকে, অফিসে বসে থেকে মানুষ হত্যা করলেন। গাড়ি পোড়ানো, বাস, ট্রেন পোড়ানো, লঞ্চ পোড়ানো, মানে জ্বালাও-পোড়াও মানুষ খুন করা, বোমা মারা, পেট্রোলবোমা মারা এই ছিল তার রাজনীতি। এটাই খালেদা জিয়ার আন্দোলন। ২০০১ পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা সারাদেশে সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করেছিল। খুন করা ছাড়া তাদের কোন কাজ ছিল না।

বক্তব্যের শুরুতে বিভিন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির বিজয়ে তাদের অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। বিচার বিভাগ ও আইনাঙ্গনের উন্নয়নে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিচার বিভাগ ও আইনজীবীদের উন্নয়নে আমরা অনেক কিছু করেছি। ১৯৯৬ সালেই এনেক্স ভবন ও ৬৪টি জেলা সদরে আদালত ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তার অনেকগুলো শেষও হয়েছিল। ’৯৬ সালে যে কাজ শুরু হয়েছিল তা এতদিনে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেন শেষ হয়নি? বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় এসে সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপর সাত বছরে দেশের সবকিছুতেই স্থবিরতা ছিল। এটাই দুর্ভাগ্য। তবে আমরা আবারও ক্ষমতায় এসে কাজ শুরু করেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির কাজ কী? আইনজীবী ও বিচারকসহ এমন কোন মানুষ নাই, যাদের তারা হত্যা করেনি। তারা জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই করেনি। খুন ছাড়া তাদের আর কোন কাজও নেই।

এর আগে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আইনজীবী নেতারা নিজ নিজ জেলায় আইনজীবী সমিতির জন্য নতুন ভবন নির্মাণ এবং পিপি-জিপি-এপিপিসহ নিম্ন আদালতের সরকারী আইন কর্মকর্তাদের সম্মানীভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। এসব দাবি-দাওয়া পূরণের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনজীবীদের দাবি অনেক। আমরা দেখব, কিভাবে এসব দাবিগুলোর সমাধান করতে পারি।

সরকারী আইন কর্মকর্তাদের সম্মানীভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখনকার যুগে ধান কাটার জন্য একজন দিনমজুরও যে টাকা পান, সরকারী আইন কর্মকর্তারা তাও পান না। তবে নিম্ন আদালতের সরকারী আইন কর্মকর্তাদের ভাতা বাড়াতে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের সঙ্গে নিম্ন আদালতের অনলাইনে যোগাযোগ নিশ্চিত করাসহ আইন ও বিচার বিভাগকে ডিজিটালাইজড করার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীদের সহযোগিতা চেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষ বিচার চায়। বিচার চাওয়া তাদের অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করেই আমরা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এ প্রসঙ্গে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচারের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার মতো কেউ বিচারবঞ্চিত হোক, তা চাই না। অনেকেই যখন বলেন, ওই হত্যার বিচার চাইÑ তখন আমি তাদের ব্যথা বুঝি। ২১ বছর আমাকে আমার বাবা-মা ও পরিবার হত্যার বিচার চাইতে দেয়া হয়নি, বিচার করতে দেয়া হয়নি। এই বঞ্চনার যন্ত্রণা আমি জানি। তবে অগণিত নেতাকর্মী আর দেশের মানুষের সমর্থনে ক্ষমতায় এসে এই বিচার করতে পেরেছি।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন রংপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল হক, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক, বরিশাল আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনিসউদ্দীন শহীদ, সাধারণ সম্পাদক কাজী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান, চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য ইব্রাহিম হোসেন বাবুল, চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি মুজিবুল হক চৌধুরী, গোপালগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী খান এবং গাজীপুর আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আজমতউল্লাহ খান ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইব্রাহিম।

এ সময় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস এমপি, জেবুন্নেসা আহমেদ এমপি, এ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।