২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সুরক্ষায় নেই আইন ॥ নির্যাতনের শিকার ৫০ ভাগ গৃহকর্মী

  • বেশির ভাগই নারী ও শিশু ;###;নির্যাতিতরা পায় না বিচার

শর্মী চক্রবর্তী ॥ দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের জন্য পরিবার-পরিজন ছেড়ে দরিদ্র ঘরের নারী ও শিশুরা গৃহকর্মীর কাজ নেয়। গৃহকর্ত্রীর মন জয় করতে এদের রাতদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়। অথচ যে মানুষটি অন্যকে খুশি করতে সবসময় ব্যস্ত, তার সুখের কথা কটি পরিবার চিন্তা করে! অধিকাংশ পরিবারের সদস্যরাই গৃহকর্মীর ওপর চালায় অমানুষিক নির্যাতন। কাজে একটু নড়চড় হলেই সইতে হয় নির্যাতন। গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী দুজনে মিলে চালায় পাশবিক নির্যাতন। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে তারপরও তারা এই কাজ করে। এভাবেই দিনের পর দিন অনেকে রাজধানীসহ সারাদেশে গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীর এ রকম নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এমনই একটি শিশু মাহফুজা আক্তার হ্যাপি (১১)। ছোট বেলা থেকে বাবা-মা থেকেও নেই। বড় হয়েছে নানি ও মামার কাছে। অভাব অনটনের সংসার তাদের। দু’বেলা ভালভাবে খেতেও পেত না। পরিবারের দারিদ্র্য ঘুচানোর জন্য নানি মনোয়ারার মাধ্যমে মিরপুরে ক্রিকেটার শাহাদাতের বাসায় গৃহকর্মীর কাজে যোগ দেয়। কিন্তু সেখানে প্রতিনিয়ত সে নির্যাতনের শিকার হতো। সামান্য কোন ভুল হলেই অমানুষিকভাবে নির্যাতন করা হতো তার ওপর। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে এই শিশুটির ওপর নির্যাতন চালাত। তাদের এমন নির্যাতন সইতে না পেরে গত ৬ আগস্ট শাহাদাতের বাসা থেকে বের হয়ে আসে হ্যাপি। তারপর স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে গেলে সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। শুধু হ্যাপিই নয়, এমন অনেক গৃহকর্মী প্রতিদিন কোথাও না কোথাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কিন্তু এই অসহায় গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নেই কোন সুনির্দিষ্ট আইন।

বাংলাদেশে সাধারণ হিসেবে ২০ লাখ গৃহকর্মী থাকার কথা বলা হয়? এর বড় একটি অংশ নারী এবং শিশু? গত ১০ বছরে ৮৯৯ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে তথ্য রয়েছে? ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের হিসাব মতে, গত বছর ৫১ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ঢাকায় নির্যাতনের শিকার হয় ৩৪ জন?

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিস (বিলস) এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শতকরা ৫০ ভাগ গৃহপরিচারিকা তাদের নিয়োগকর্তার দ্বারা নির্যাতিত হয়। নির্যাতিতদের ৫০ শতাংশই শিশু। গবেষণায় বলা হয়, চুক্তি ছাড়া গৃহশ্রমিকদের নিয়োগ, ন্যূনতম মজুরি প্রদান না করা, অনিয়মিত মজুরি, অল্প মজুরিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো, কথায় কথায় শারীরিক নির্যাতন এমনকি হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, গৃহশ্রমিকদের নিয়োগ চুক্তি নেই। তাদের মাসিক গড় মজুরি ৫০৯ দশমিক ৬ টাকা। এরমধ্যে নিয়মিত মজুরি পায় ৬০ শতাংশ এবং অনিয়মিত মজুরি পায় ৪০ শতাংশ। এত অল্প মজুরিতেও নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে তারা। এর মধ্যে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ শিক্ষার সুযোগ এবং ৫৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ চিত্তবিনোদনের সুযোগ পায় না। বকাঝকার শিকার হয় ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সামর্থ্যরে অতিরিক্ত কাজ করে ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যৌন নিপীড়ন সহ্য করে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, মানসিক হতাশায় ভোগে ৬৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ গৃহশ্রমিক।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব মতে, ২০১৩ সালে অন্তত ১০০ জন গৃহকর্মী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন? এঁদের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন? যাঁদের মধ্যে আবার ২০ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। শারীরিক নির্যাতনের পর মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের? অন্যান্য নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের ? ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিনজন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে আরও তিনজনকে ? এছাড়া আত্মহত্যা করেছেন আটজন এবং গর্ভপাতকালে মৃত্যু হয় একজনের? পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের শেষ চার মাসে ১০৭ জন গৃহকর্মী আত্মহত্যা করেছেন?

‘ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস নেটওয়ার্ক’-এর হিসাব অনুযায়ী ২০০১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই ৫৬৭ জন গৃহকর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে? বলাবাহুল্য, বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের মধ্যে প্রায় ৩০ ভাগের বয়স ৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে? এই শিশুদের মধ্যে ১৭ ভাগই কোন না কোন ধরনের নির্যাতনের শিকার?

এ সব তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকতে পারে? কারণ গৃহকর্মী নিবন্ধন এবং তাঁদের নির্যাতনের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে কোন তথ্য-ভা-ার নেই? নানা সংগঠন বিচ্ছিন্নভাবে কিছু জরিপ এবং তথ্য সংগ্রহ করেছে মাত্র? তবে তথ্যগত অসঙ্গতি থাকলেও এইসব জরিপে গৃহকর্মী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট? আর এটাও পূর্ণাঙ্গ চিত্র না? কারণ যেসব তথ্য দেয়া হয়েছে, তা সংগ্রহ করা হয়েছে থানায় দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে? অধিকাংশ ঘটনাতেই অবশ্য থানায় অভিযোগ করা হয় না? নির্যাতনের পর চাপের মুখে বা টাকার বিনিময়ে সমঝোতা করা হয় মাত্র?

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালে আটজন গৃহকর্মী আত্মহত্যা করেছেন ? আর ২০১৪ সালের শেষ চার মাসে ১০৭ জন গৃহকর্মী আত্মহত্যা করেছেন? তাছাড়া ১২ বছরে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৫৬৭ জন গৃহকর্মীর? কেন? কেউ কি তলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন এত বিপুল সংখ্যায় কেন গৃহকর্মীরা আত্মহত্যা করেছেন? তাঁরা আত্মহত্যা করেছেন না তাঁদের আত্মহত্যায় বাধ্য করা হচ্ছে? অথবা হত্যাকেই কি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে?

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০১২ সালে সরকারের কাছে গৃহকর্মীদের জন্য ‘ডোমেস্টিক ওয়ার্কার রেজিস্ট্রেশন এ্যান্ড প্রোটেকশন এ্যাক্ট’ নামে একটি আইনের খসড়া প্রস্তাব করে? দেশের সর্বোচ্চ আদালত একটি সুরক্ষা আইন করার নির্দেশ দিয়েছে? কিন্তু এখনও সরকার সেই আইন করেনি? প্রস্তাবিত আইনে গৃহশ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, বেতন কাঠামো, সুরক্ষা সব কিছুর কথাই বলা আছে ? ২০০৮ সালে শুরু হওয়া গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ আচরণ বিধিমালার খসড়াটি শ্রম মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করলেও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে এর অনুমোদন প্রক্রিয়া।

২০১৩ সালের ঘটনা আদুরীর বয়স সবে ১১ বছর। মা-বাবা অনেক শখ করে সন্তানের নাম রেখেছিলেন আদুরী। কিন্তু তার ভাগ্যে কখনও যেন আদরের ছোঁয়াই লাগেনি। লেগেছে গরম খুনতির ছ্যাঁকা, ধারালো ছুরি ও ব্লেডের আঁচড়। আর দিনের পর দিন না-খাওয়ার যন্ত্রণা। কঙ্কালসার দেহ নিয়েই বাঁচার তাগিদে করে যাচ্ছিল গৃহকর্মীর কাজ। এক মাস বা আরও কিছু বেশি হবে, তাদের গ্রামের এক ব্যক্তি তাকে ঢাকায় একটি বাড়িতে কাজে দিয়ে যায়। বাড়িতে গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী ছাড়া কেউ ছিলেন না। কিন্তু কাজের একটু ব্যাঘাত ঘটলেই আদুরীর ওপর নেমে আসত গৃহকর্ত্রীর নির্যাতন। একদিন গৃহকর্ত্রীর একটি ইমিটেশনের কানের দুল চুরি করার অপরাধে তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। তাকে খুনতি গরম করে ছ্যাঁকা দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতও করা হয়েছিল। নির্যাতনের একপর্যায়ে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট বেড়িবাঁধ এলাকায় ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হয় তাকে। পরে এক মহিলা আদুরীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

সাতক্ষীরায় দেবহাটা আদালতের বিচারিক হাকিম নুরুল ইসলামের বাসা থেকে নির্যাতিত ১০ বছর বয়সী কাজের শিশু বিথীকে মারাত্মক আহত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। ১৯ আগস্ট বুধবার দুপুরে এই ঘটনা ঘটে। ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলার বড় আমিয়ান গ্রামে বিথীর বাড়ি। তার মা মারা গেছেন। বাবা একাধিক বিয়ে করেছেন। তার চাচা চীফ জুডিশিয়াল আদালতের কর্মচারী সোহরাব হোসেন তাকে ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল ইসলামের বাড়িতে দেন।

নোয়াখালীর চৌমুহনীতে এক বিদ্যুত কর্মকর্তার বাসায় থেকে নির্যাতনের শিকার হয় আমেনা নামে এক শিশু গৃহকর্মী। আমেনার ওপর প্রায়ই নির্যাতন চালাত পল্লী-বিদ্যুতের হিসাব রক্ষক সাইফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী। গত ১৬ আগস্ট নূপুর চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে দুইদিন বাথরুমে আটকে রাখে তারা। এমনকি তার হাত-পা বেঁধে খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দেয় সাইফুল ও তার স্ত্রী। এক পর্যায়ে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আমেনা পালিয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

প্রায় প্রতিনিয়ত এমন ঘটনা ঘটলেও বিচার হয়নি অনেক ঘটনার। ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্ট্যাডিজ’ও বলছে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের বিচার হওয়ার কোন নজির পাওয়া যায়নি। আর কেন বিচার হচ্ছে না এর উত্তরে তারা জানান, যাঁরা গৃহকর্মী তাঁরা সবচেয়ে দরিদ্র? আর যাঁরা গৃহকর্মী রাখেন, তাঁরা কম-বেশি সম্পদশালী, ক্ষমতাবান? মামলা করলেও সেই মামলা চালানোর মতো আর্থিক ক্ষমতা থাকে না নির্যাতিত বা নিহতের পরিবারের ? তাই তাঁরা শেষ পর্যন্ত সমঝোতা করেন বা মামলা চালাতে পারেন না?

শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুস শহীদ মাহমুদ বলেন, গৃহকর্মী নির্যাতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো আইনের ব্যবস্থাপনা নেই। এছাড়া এই শ্রমকে এখনও স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। গৃহকর্মীদের শ্রমিকের মর্যাদা প্রদান করে ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় গৃহকর্মকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার এখনই। এসব কারণে গৃহকর্মীরা নির্যাতিত হচ্ছে এবং বিচারও পাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, গৃহকত্রীরা যখন গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন করে তখন তাদের মাথায় তাকে এ বিষয়ে কেউ জানবে না। আর জানলেও কিছু করতে পারবে না। কারণ তারা দরিদ্র প্রশাসনের কাছে যাওয়া বা মামলা করার ক্ষমতা তাদের কাছে নেই। সুতরাং তাদের টাকা আছে তাই টাকা পয়সা দিয়ে তা সমাধান করে ফেলবেন। এই সব প্রবণতা থেকে তারা বের হতে না পারায় গৃহকর্মীর ওপর এখনও নির্যাতন হচ্ছে। এই নির্যাতন বন্ধ করতে হলে আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এবং শুধু আইন করলেই হবে না এর বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। এই কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কিনা এর মনিটরিং করতে হবে তাহলে গৃহকর্মী ওপর নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

নির্বাচিত সংবাদ