২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কন্থায় আঁকিল কন্যা চান সুরুজ পাহাড়, পুষ্প রাশি রাশি...

কন্থায় আঁকিল কন্যা চান সুরুজ পাহাড়, পুষ্প রাশি রাশি...
  • নক্সীকাঁথার আদিরূপ

মোরসালিন মিজান ॥ নকশিকাঁথার আলোচনা যেহেতু, ‘নক্সি কাঁথার মাঠ’ একবারটি ঘুরে আসা যেতে পারে। পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের অনন্য সাধারণ কাব্য প্রয়াস বাংলার এই লোকশিল্পকে বিশেষ ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছে। বিয়োগান্তক প্রণয় উপাখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র রূপা ও সাজুর মতোই পাঠকের মনোযোগ নিংড়ে নেয় নকশিকাঁথা। আবেগের পুরোটা ঢেলে দিয়ে কবি লেখেন- রূপা এক দিন ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে গেল দূর দেশে,/তারি আশা-পথে চাহিয়া চাহিয়া বউটি মরিল শেষে।/মরিবার কালে বলে গিয়েছিল- তাহার নক্সি-কাঁথা,/কবরের গায়ে মেলে দেয় যেন বিরহিণী তার মাতা...। অন্তিম এই আকাক্সক্ষা প্রমাণ করে, বাংলার নকশিকাঁথায় প্রিয়জনের স্পর্শ লেগে থাকে। প্রাণের মানুষটির গায়ে যে ঘ্রাণ, কাঁথার ভাঁজ খুললে পাওয়া যায়। আর প্রধান বৈশিষ্ট্যটি তো অবশ্যই শিল্পসৌন্দর্য। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশে নকশিকাঁথার আলাদা পরিচিতি। বাঙালী নারীর রুচি, নান্দনিকতার বোধ ও শিল্প চেতনার চমৎকার প্রকাশ ঘটে এখানে। নকশিকাঁথা বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে আজকের পরিবর্তিত এই সময়ে শহুরে চাকচিক্য আর নকলের চর্চা প্রধান হয়ে উঠছে। বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়লেও, নকশিকাঁথার আদি রূপটি তেমন দেখা যায় না। এভাবে সকলের চোখের সামনেই বিলুপ্তির পথ ধরেছে বাংলাদেশের মৌলিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নকশিকাঁথা সুচিশিল্প।

অনুমান করা হয়, সংস্কৃত শব্দ ‘কন্থা’ থেকে কাঁথা শব্দের উৎপত্তি। প্রাকৃত শব্দ ‘কথ্থা’ থেকেও এর উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। আঞ্চলিক উচ্চারণে নামটি সামান্য বদলে যায়। যেমন- কেতা, খেতা, কাতা। বইয়ের ভাষায় বললে, কাঁথা গায়ে জড়িয়ে শোয়ার বস্ত্রবিশেষ। শীতের পুরোটা সময় এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। শীত বিদায়ের মুহূর্তে কিংবা অসময়ের বৃষ্টিতে কাঁথা মুড়ি দেয়া ঘুমের কোন তুলনা হয় না। সাধারণ এই কাঁথাতে যখন সুঁই সুতোয় নকশা করা হয় তখন তা নকশিকাঁথার মর্যাদা লাভ করে। ঠিক কবে থেকে এই নকশা করা শুরু বলা মুশকিল। তবে, নকশিকাঁথা নিয়ে লম্বা সময় ধরে পড়ালেখা, কাজ ও গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে প্রায় সকলেই একমত যে, বাঙালীর এটি অতি প্রাচীন ঐতিহ্য। বৌদ্ধধর্ম প্রচার শুরুর সময়টাতে নকশিকাঁথা শিল্পের বিশেষ প্রসার ঘটে। তখন ধর্ম প্রচারকগণ তত্ত্বকথা শোনাতে নানা ধরনের প্রতীকের আশ্রয় নিতেন। এসব প্রতীক ও ছবি ক্রমশ স্থান করে নিতে থাকে নকশিকাঁথায়। একইভাবে কাঁথায় ফুটে ওঠে মহাভারত। আসে বেদ-উপনিষদের বাণী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রভাব কাঁথায় এসে পরে। এভাবে সময়কে ধারণ করে করেই বর্তমানে এসে পৌঁছেছে নকশিকাঁথা।

এক সময় বাংলাদেশের প্রায় সব গ্রামের সব ঘরেই নকশিকাঁথা হতো। রমণীরা গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে ফাঁকে মনোযোগ দিয়ে সুঁই সুতোর কাব্য করতেন। সারা বছরই কাজ হতো। বিশেষ করে বর্ষাকালে। গৃহবন্দী সময়টির সর্বোত্তম ব্যবহার করতেন মেয়েরা, মায়েরা। পরিবারে বৌ-ঝিদের সুচিশিল্পের জ্ঞানকে বিশেষ মূল্যায়ন করা হতো। প্রথম বাঙালী মহিলা কবি চন্দ্রাবতী তাঁর রামায়ণ কাব্যে সীতার এই গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। কবি লিখেছেন- সীতার গুণের কথা কি কহিব আর,/কন্থায় আঁকিল কন্যা চান সুরুজ পাহাড়।/ আরও যে আঁকিল কন্যা হাসা আর হাসি।/চাইরো পাইড়ে আঁকে কন্যা পুষ্প রাশি রাশি...।

গবেষকদের মতে, নিজেদের ব্যবহারের জন্যই শৌখিন বধূরা, কন্যারা নকশিকাঁথার কাজ করতেন। একইসঙ্গে তা প্রিয় ও পছন্দের মানুষকে উপহার দেয়া হতো। মূলত তখন নকশিকাঁথাকে সবচেয়ে বেশি নান্দনিক ও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করতেন নারীরা। গাঁয়ে বিয়েতে নকশিকাঁথা উপহার দেয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। আত্মীয়স্বজনকে কাঁথা উপহার দেয়া হতো। মা প্রিয় সন্তানের জন্য যতœ করে নকশিকাঁথা গড়তেন। স্বামীর জন্য গড়তেন স্ত্রী। নবজাতকের জন্য খুব যতœ করে নকশিকাঁথা করতেন নানি, দাদি, খালারা, ফুফুরা। নতুন অতিথির আগমনের আগেই দূরদূরান্ত থেকে কাঁথা তৈরি করে নিয়ে আসতেন আত্মীয়রা। এভাবে ঐতিহ্যের উপাদান হয়ে ওঠে নকশিকাঁথা।

নকশিকাঁথার মূল উপাদান পর্যাপ্ত ব্যবহারে জীর্ণ ও নরম হয়ে যাওয়া শাড়ি। লুঙ্গি, ধুতি ইত্যাদিও ব্যবহার করা হতো। প্রথমে একাধিক শাড়ি কয়েক পরত করে মেঝেতে বিছিয়ে বড় বড় ফোঁড়ের সাহায্যে আটকানো হতো। বাজার থেকে কেনা সাধারণ সুতোর ব্যবহার তেমন দেখা যেত না। বরং শাড়ির অপেক্ষাকৃত ভারি পাড় থেকে সংগ্রহ করা হতো বিভিন্ন রঙের সুতো। এ সুতো লম্বা। শাড়ির দৈর্ঘের সমান। সুতো সুঁইয়ে গেঁথে নিয়ে নকশা তৈরির কাজ করতেন রমণীরা।

জাতিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ধারায় নকশিকাঁথায় তিন ধরনের মোটিফ পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, মানুষ ও পশু পাখি। দ্বিতীয়ত, ফুল লতা পাতা গাছের মোটিফ। তৃতীয়ত, নানা প্রকার জ্যামিতিক নকশা। নকশিকাঁথাকে বিষয় করে প্রচুর কাজ করেছেন পারভীন আহমেদ। তাঁর মতে, খুব চেনা জগৎ থেকে ফর্ম সংগ্রহ করে তা সুঁই সুতোয় বুনে নিতেন নারীরা। উঠোনের ফুল গাছ, লতা, পাতা, পাখিকে সুতোয় বুনতেন। নদীর মাছ, পালতোলা নৌকো, দৌড়ের ঘোড়া, হাতি, বাইসাইকেল, এরোপ্লেন- কিছুই বাদ যেত না। এমনকি আকাশের চাঁদটিও নেমে আসত তারা সমেত! লোক মুখে শোনা গল্প কিচ্ছা কাহিনীর নানা চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা হতো। রূপকথার পরীকে রঙিন সুতোয় মূর্ত করা হতো। নারীর মনের কল্পনা প্রেম বিরহ বিয়োগ ব্যথার গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে উঠত নকশিকাঁথা। এখানে বিস্তার ঘটত লোকায়ত ভাবনার। সমকালীন সমাজ সভ্যতা সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত এখান থেকে। বিস্ময়কর শোনালেও সত্য যে, আগে ড্রইং করে নেয়ার কোন বিষয় শিল্পীদের মাথায় ছিল না। চোখের দেখা আর মনের খেয়াল কল্পনা কাঁথার গায়ে ফুটিয়ে তুলতেন শৌখিন নারীরা। ফলে একটি কাঁথার সঙ্গে অন্যটির নকশা হুবহু মিলে যেত না। প্রতিটি কাঁথাই স্বতন্ত্র শিল্পকর্মের রূপ লাভ করত। পুরনো কাপড়ে গড়া প্রকৃত নকশিকাঁথার রং হতো অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল। তবে সরল সৌন্দর্যটা দারুণ আকৃষ্ট করে রাখত।

গবেষক নিয়াজ জামান জানান, নকশিকাঁথার ফোঁড় পাইড় নকশা ও ব্যবহার অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন নাম হয়। ফোঁড় অনুযায়ী নামগুলো এরম- বরকা ফোঁড়, তেরসি ফোঁড়, বাঁশপাতা ফোঁড়, কইতা ফোঁড় ও বিছা ফোঁড়। পাইড়ের নামে নকশিকাঁথার নাম রাখা হয়েছে তোলো পাইড়, তাস পাইড়, নয়নলতা, নারিকেল পাতা ও নৌকাবিলাস। অধ্যাপক নিয়াজ জামানও কাঁথার পাইড়ের কিছু নাম সংগ্রহ করেছিলেন। এসব নামের মধ্যে রয়েছে ধানের শীষ বা খেজুর ছড়ি, বিজে, মকী, চোখ, তাবিজ মাছ, পিঁপড়ার সার, তাগা, মই, গোট, চিক, নোলক, বিছা, আনাজ ও শামুক। ব্যবহারও বহুবিধ। শীতে ব্যবহার করা হতো লেপ কাঁথা। বালিশের উপর বিছানো হতো বয়তন। জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য জায়নামাজ কাঁথা। বসার জন্য আসন কাঁথা। আয়না চিরুনি রাখার জন্য আর্শিলতা, পান-সুপারি রাখার জন্য পান কাঁথা। মূল্যবান জিনিসপত্র ও কাপড় বেঁধে রাখার জন্য বোচা কাঁথা। কোরআন শরীফ রাখার জন্য গিলাফ কাঁথার ব্যবহার হতো। গালিচা, দেয়ালচিত্র, মাফলার, চাঁদোয়া ইত্যাদিতেও নকশিকাঁথার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এমনকি ১৯৭২ সালে হাতে লেখা বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে নকশিকাঁথার মোটিফ ব্যবহার করা হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নকশিকাঁথার সৌন্দর্যগুণের কারণেই এই কদর। এত মর্যাদা।

পারভীন আহমেদের মতে, নকশিকাঁথা পেইন্টিংয়ের মতোই একটি স্বতন্ত্র আর্ট ফর্ম। ৭০ রকমের ফোঁড় ব্যবহারে অনন্য সাধারণ শিল্পকর্ম গড়েন তাঁরা। এ জন্য তাঁরাও শিল্পী। শিল্পকর্ম করতেন বলেই প্রচুর সময় লাগত। এক বা দুই বৈঠকে শেষ করার সুযোগ ছিল না। সূক্ষ্ম কাজ। একটু একটু করে কাজ এগিয়ে নেয়া হতো। একা এবং কয়েকজন মিলে দীর্ঘদিন ধরে একটি কাঁথা সেলাই করতেন। এমনও হতো যে, বছরের পর বছর ধরে এক কাঁথা সেলাই করা হচ্ছে। তবু শেষ হচ্ছে না। মা যে কাঁথায় সেলাই শুরু করেছিলেন, মৃত্যুর পর মেয়ে তা শেষ করেছেন। এমন ইতিহাস থেকে পরিষ্কার যে, নকশিকাঁথার প্রতি বাংলার নারীদের আবেদন ছিল অকল্পনীয়। গবেষক নিয়াজ জামানও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন কাঁথার সঙ্গে মিশে থাকা প্রেম ও ভালবাসার বোধটুকুর উপর। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, কাঁথার গায়ে বাংলার নারীদের সরল চিন্তা ও সৌন্দর্য চেতনার পাশাপাশি যে প্রেমস্পর্শ লেগে থাকে তার কোন তুলনা হয় না।

তবে আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। বহুবিধ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথ ধরছে নকশিকাঁথা সুচিশিল্প। বাঙালী সংস্কৃতির মৌলিক উপাদানটি কোন রকমে টিকে আছে। পরিস্থিতিটা ক্ষোভের সঙ্গেই বর্ণনা করেন নিয়াজ জামান। বলেন, এখন তো বুড়ো মহিলারাও তো সালোয়ার কামিজ পরে। টিনেজ মেয়েরা তরুণীরা অভ্যস্ত হচ্ছে জিন্স টি-শার্টে। এ অবস্থায় শাড়িই তো থাকবে কিনা, সন্দেহ। আর শাড়ি না থাকলে নকশিকাঁথা আসবে কোথা থেকে? তিনি যোগ করেন, এখন গ্রামের নারীদেরও ব্যস্ততা বেড়েছে। নকশিকাঁথা তৈরি করার মতো সময় ও ধৈর্য্য সবার নেই। পাশাপাশি, অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল হতে থাকায় অনেকেই কাঁথা ব্যবহারকে লজ্জার জ্ঞান করে। মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ শ্রমিকটিও ছুটিতে দেশে ফেরার সময় একটি কম্পল হাতে নিয়ে ফেরে। শহুরে শিক্ষিত মানুষও নিজস্ব কৃষ্টির প্রতি উদাসীনতা। নকল চর্চায় অভ্যস্ত। এসবের বাইরে, নকশিকাঁথা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই। এমন নানা বাস্তবতায় নকশিকাঁথা হারাতে বসেছে বলে জানান তিনি।

কেউ কেউ অবশ্য দ্বিমত করে বলে বসতে পারেন দেশের বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার নারী নকশিকাঁথা তৈরি করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। মার্কেটে শোরুমে এমনকি অলিতে গলিতে নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে নকশিকাঁথা। তাহলে কী করে হারালো? হ্যাঁ, এমন বোকা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন পারভীন আহমেদ। তার বলাটি এরকম- শহরে হরহামেশা যা পাওয়া যাচ্ছে তা আদৌ নকশিকাঁথা নয়। নকশিকাঁথার আদি রূপ এসব কাঁথায় অনুপস্থিত। এগুলো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব প্রোডাক্ট। ম্যাস প্রোডাক্ট করতে গিয়ে তাঁরা ট্রেসিংয়ের প্রবর্তন করেছে। এর ফলে এক ডিজাইনের শত শত পিস কাঁথা তৈরি হয়ে যাচ্ছে নিমিষেই। নকশিকাঁথার মূল বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এটি যায় না। সৌন্দর্য রক্ষিত হয় না। বানিণজ্যিকভাবে তৈরি এসব কাঁথা হয় নতুন কাপড়ে। উজ্জ্বল রঙের কাপড় ও নতুন সুতোয় সেলাই করা হয়। এভাবে নকশিকাঁথা আর নকশিকাঁথা হয়ে নেই। খুবই বেদনার যে, নকশিকাঁথা আর নকশিকাঁথা হয়ে থাকছে না!