২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে কৃষিযন্ত্রের মান নিয়ন্ত্রণে টেস্টিং ল্যাব

  • চীনে চালু হয় ১৯৫১ সালে ;###;এ ল্যাবের সুফল পাবে নিম্ন আয়ের কৃষক;###;ভোগান্তি হ্রাস হবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকের

এমদাদুল হক তুহিন ॥ দেশে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাচ্ছে কৃষি যন্ত্রপাতির গুণগতমান নিয়ন্ত্রণে কৃষি যন্ত্রপাতি টেস্টিং ল্যাব। যন্ত্রের স্থায়িত্ব ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গাজীপুরের নুরবাগ হর্টিকালচার সেন্টারের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের নিজস্ব জমিতে ল্যাবটি নির্মিত হবে। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকের দোরগোড়ায় নিম্নমানের কৃষি যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর আশঙ্কা হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে গুণগত যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে জ্বালানি ব্যয় হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন নিম্ন আয়ের কৃষক। অন্যদিকে কৃষি যন্ত্রের মান নিয়ন্ত্রণে দ্য এশিয়ান এ্যান্ড প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ফর টেস্টিং অব এগ্রিকালচারাল মেশিনারি (এনটাম) কতৃক প্রবর্তিত সাধারণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হবে, যা এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে অনুসৃত হচ্ছে।

জানা গেছে, কৃষি যন্ত্রপাতির মান নিয়ন্ত্রণে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে নানা পদ্ধতি থাকলেও স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছরেও বাংলাদেশে চালু হয়নি টেস্টিং ল্যাব। এ সুযোগে সরকারী-বেসরকারী উভয় পর্যায়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানহীন যন্ত্র সরবরাহের সুযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে যান্ত্রিকীকরণে পিছিয়ে থাকায় মান নিয়ন্ত্রণে কোন পন্থাও অবলম্বন করেনি বাংলাদেশ। চীনে ১৯৫১ সাল থেকে চালু রয়েছে চায়না এগ্রিকালচারাল মেশিনারি টেস্টিং সেন্টার (সিএএমটিসি)। ভারতের মধ্য প্রদেশের বুডনিতেও কৃষি যন্ত্রের মান নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ফার্ম মেশিনারি ট্রেনিং এ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট। এমনকি এগিয়ে আছে পাকিস্তানও! ফলে যান্ত্রিকীকরণে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাচ্ছে কৃষি যন্ত্রপাতি টেস্টিং ল্যাব। ধারণা মতে, ল্যাব নির্মিত হওয়ার পর যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের কৃষকের ভোগান্তি হ্রাস পাবে।

এ প্রসঙ্গে কৃষি যন্ত্রপাতি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলী সুরজিৎ সরকার জনকণ্ঠকে বলেন, কৃষি যন্ত্র পরীক্ষাগার স্থাপন একটি মাইলফলক। এর মাধ্যমে কৃষকের কাছে মানসম্পন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ নিশ্চিত হতে পারে। ল্যাব ব্যবহারের ফলে দেশের বাজারে প্রচলিত কৃষি যন্ত্রপাতির প্রমাণিত মান নির্ধারণ করা সম্ভব হবে, যা কৃষকের জ্বালানি সাশ্রয়ী ও অধিক টেকসই যন্ত্র প্রাপ্তিতে সহায়তা করে দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

জানা গেছে, বিশ্বের ১৮টি দেশের কৃষি যন্ত্রপাতির মান নিয়ন্ত্রণে দ্য এশিয়ান এ্যান্ড প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ফর টেস্টিং অব এগ্রিকালচারাল মেশিনারি (এনটাম) কর্তক প্রণীত একটি সাধারণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। পার্শ¦বর্তী কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশও এর সদস্য। ল্যাবের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশেও এনটাম কতৃক প্রণীত পদ্ধতি ব্যবহার করবে। এ ছাড়া মান নিয়ন্ত্রণে উত্তীর্ণ যন্ত্রপাতিই কেবল সরকার ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রাপ্ত বিভিন্ন সুবিধাদি ভোগ করতে পারবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের চন্দ্রা সড়কের পার্শ্ববর্তী নুরবাগ হর্টিকালচার সেন্টারের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের নিজস্ব দেড় একর জমির ওপর নির্মিত হবে হবে এ ল্যাব। চলতি বছরের শেষ নাগাদ টেস্টিং ল্যাব ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ল্যবরেটরিী, অফিস ভবন ও ল্যাবরেটরি শেড তৈরিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

কৃষিবিীদদের ধারণা মতে, চলমান যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রমকে টেকসই রূপ দিতে গুণগত মানসম্পন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুত ও আমদানী একটি প্রধান শর্ত। বর্তমানে দেশে বাৎসরিক প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার কৃষি যন্ত্রপাতি ও ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ প্রস্তুত কিংবা আমদানি হয়। তবে দীর্ঘ এতো বছরেও যন্ত্রের স্থায়িত্ব ও সক্ষমতা পরীক্ষায় কেন ল্যাব বা কেন্দ্র তৈরি হয়নি। আর এ সুযোগে যন্ত্রের গুণগত ও দক্ষতা নিরূপণ ছাড়াই কৃষকের কাছে যন্ত্র সরবরাহ হচ্ছে। ফলে নিম্নমানের যন্ত্র বাজারতাকরণ হওয়ায় কৃষকরা পড়েন নানা রকম ভোগান্তিতে। জানা গেছে, এর ফলে যান্ত্রিকীকরণেও পড়ছে বিরূপ প্রভাব!

যন্ত্র ক্রয়ের পর কৃষক নানা ভোগান্তিতে থাকেন। কোন কোন ক্ষেত্রে যন্ত্রের স্থায়িত্বকাল এক বছরও হয় না। এমন অভিযোগ রয়েছে কৃষকের। এ প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার হরশি গ্রামের কৃষক হিমেল জনকণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি কলের লাঙ্গল কেনার অল্প দিনেই তা নষ্ট হয়ে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রথম বছর ঠিক থাকলেও পরের বছর থেকে মেরামতের পেছনে শুরু হয় নানা ধরনের ব্যয়। যন্ত্রের মান ঠিক থাকলে আমরা উপকৃত হব। ল্যাব নির্মাণের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়।

এ প্রসঙ্গে খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি-২য় পর্যায়ের প্রকল্প পরিচালক শেখ মোঃ নাজিম উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, দেশে তৈরিকৃত যন্ত্রপাতি ও আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি মানসম্পন্ন কিনা তা পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে ভালমানের যন্ত্রের পাশাপাশি নিম্ন মানের যন্ত্রও কৃষকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। যন্ত্র টেকসই না হওয়ায় যন্ত্রের আয়ুষ্কাল নিয়ে কৃষকরা পড়ছেন নানা ভোগান্তিতে। এমনকি যান্ত্রিকীরকণের প্রতিও মানুষের নেতিবাচক ধারণাও তৈরি হচ্ছে। ফলে কৃষি যন্ত্রের মান নিয়ন্ত্রণ সরকারের দায় হয়ে দাঁড়ায়। ল্যাব নির্মিত হলে কৃষকরাই বেশি উপকৃত হবেন। আর্থিকভাবেও তাদের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পাবে।