২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এগারো সচিব অবসরে যাচ্ছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে লবিং

তপন বিশ্বাস ॥ প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার জন্য জোর লবিং চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ১১ সচিব অবসরে যাবেন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে তাদের অনেকেই জোর লবিং চালাচ্ছেন। এতে প্রশাসনে কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুদার জনকণ্ঠকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে অধস্তন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দিলে প্রশাসন গতিশীল হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়েছে। এই মেয়াদ বাড়ানোর সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এর পর থেকে আর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য কঠোরভাবে পালনও করা হচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ক্ষেত্র বিশেষ দুই-একটা ছাড়া আর কোন পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়নি। এতে সর্বত্রই কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বস্থি ফিরে এসেছে। প্রশাসনে শৃঙ্খলাও ফিরে এসেছে। এমন সময় বেশ কয়েক কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার আগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার আশায় জোর লবিং শুরু করেছে। এরা কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও তদবির করছেন। এই সকল কর্মকর্তারা সরকারকে বুঝাতে চাচ্ছে তাঁরা খুব দক্ষ। দেশের স্বার্থে তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া দরকার।

এদিকে বেশ কয়েকটি শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি অন্যান্য ক্যাডারের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। দেশের স্বার্থে বিশেষ ব্যতিক্রম ক্ষেত্র (টেকনিক্যাল) ছাড়া অন্য কোন পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিপক্ষে তারা। কর্মকর্তারা বলছেন, শীর্ষ পদের সংখ্যা সীমিত। এই সকল পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে নিচের পদগুলো ব্লক হয়ে যায়। এতে কর্মকর্তাদের উপরে উঠতে বাধাগ্রস্ত হয়। প্রশাসনের কার্যক্রম স্থিমিত হয়ে পড়ে। তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইতোপূর্বে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া বন্ধ রাখে। এতে কর্মকর্তাদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা বাড়ে। কাজের গতিও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশেও উপরে নিয়ে যাওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়লে তাদের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। তারা আরও বলেন, মানুষের যেমন চাহিদার শেষ নেই, তেমনি কিছু কর্মকর্তাদের চাহিদারও শেষ নেই। তাদের একটার পর একটা চাহিদা আসতে থাকে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এ সকল কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে নিচের কর্মকর্তারা উপরে উঠতে পারেন না। এতে তাদের কাজের স্পৃহা কমে যায়। যা ‘গুড় গর্ভান্সের’ ক্ষেত্রে ঠিক নয়। যেখানে সরকার ভীশন-মিশন বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, সেখাতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনকে স্থবির করে তুললে সরকারের এই সকল কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রতিন্ধকতা তৈরি হতে পারে। এটি সুশাসনের জন্য বাধা হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞাসহ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে অবসরে যাচ্ছেন ১১ জন সচিব। তাদের মধ্যে বুধবার শেষ কর্মদিবস ছিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. সেলিনা আফরোজার। এছাড়া অবসরে যাচ্ছেন এমন অন্য সচিবরা হচ্ছেন- অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহাবুব আহমেদ, স্বাস্থ্য সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সদস্য পরীক্ষিত দত্ত চৌধুরী, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান মোঃ শাহজাহান আলী মোল্লা, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আরাস্তু খান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদী, শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত আব্দুল মান্নান হাওলাদার এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার সচিব মোঃ নজরুল ইসলাম।

মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে যোগদান করেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের ২০তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব। মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা ১৯৮১ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারে যোগদান করেন। চাকরি জীবনে তিনি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, স্বশাসিত সংস্থা, মাঠ প্রশাসন, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশের বাংলাদেশ মিশনে কর্মরত ছিলেন।

অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ ১৯৮২ সালে বিসিএসের নিয়মিত পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ষষ্ঠ স্থান লাভ করেন। ১৯৮৩ সালের ২৭ অক্টোবর সরকারী চাকরিতে যোগ দেন। গত বছরের ৬ জুলাই অর্থ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। অবসরে যাবেন আগামী ২৯ ডিসেম্বর। স্বাস্থ্য সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম সরকারী চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। স্বাস্থ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান গত বছরের ১০ নবেম্বর। অবসরে যাবেন আগামী ১৯ অক্টোবর। প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান গত ২৩ সেপ্টেম্বর। অবসরে যাবেন আগামী ২১ অক্টোবর। আর সরকারী চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৩ সালের ১৯ জুন। শাহজাহান আলী মোল্লা সরকারী চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৩ সালের ১৯ জুন। সরকারী কর্মকমিশন সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান গত বছরের ৯ নবেম্বর। অবসরে যাবেন আগামী ৩১ অক্টোবর। আরাস্তু খান সরকারী চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান গত ২ মার্চ। অবসরে যাবেন আগামী ২০ নবেম্বর।

শফিক আলম মেহেদী সরকারী চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৩ সালের ১৯ জুন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পান গত বছর ৯ নবেম্বর। অবসরে যাবেন আগামী ৩০ নবেম্বর। নজরুল ইসলাম খান সরকারী চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৩ সালের ১৯ জুন। শিক্ষা সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান গত বছরের ২ মার্চ। অবসরে যাবেন আগামী ৩০ নবেম্বর। আব্দুল মান্নান হাওলাদার সরকারী চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮১ সালের ৩০ জানুয়ারি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই কর্মকর্তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে গত বছরের ২ মার্চ। অবসরে যাবেন আগামী ৪ ডিসেম্বর। মোঃ নজরুল ইসলাম সরকারী চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান গত ২ মার্চ। অবসরে যাবেন আগামী ১৪ ডিসেম্বর।