২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমরা মর্মাহত

  • ড. মো. আনোয়ার হোসেন

“ঊর্ধ্বশির যদি তুমি কুল মান ধনে;

করিও না ঘৃণা তবু নিচ-শির জনে!”

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বড়ই অপমানিত বোধ করছি আমরা। গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি আপনার বাক্যবাণ আমাদের শেলের মতো বিদ্ধ করছে। এই অপমান হয়ত আমাদের প্রাপ্যই ছিল। পদে যাওয়া, তা রক্ষা করা কিংবা পদায়িত কাউকে পদ থেকে নামানো- ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের শিক্ষকদের নীতিহীন কর্মকাণ্ড, ক্ষমতাবানদের লেজুড়বৃত্তি এবং নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়া- এসবের কারণে সমাজে শিক্ষকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে- তাতে কোন সন্দেহ নেই। ধসও নেমেছে আমাদের ভাবমূর্তিতে। বোধ করি এসবের কারণে এমন অপমানজনক কথা আমাদের শুনতে হয়েছে। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শুরুতেই আপনাকে বিনীতভাবে জানিয়ে রাখি, ওপরে বর্ণিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত যে সকল শিক্ষককে সামনে রেখে আপনি কথাগুলো বলেছেন তারা সংখ্যায় মুষ্টিমেয়। আপনার সমালোচনায় আত্মশুদ্ধি নয়, আরও নতজানু এবং বশংবদ হবেন তারা। এমন শিক্ষককুল বাংলাদেশে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে কোন কাজেই আসবেন না। অপাঙক্তেয় আবর্জনা হিসেবেই বিবেচিত হবেন।

কিন্তু তাদের বাইরে শিক্ষকদের বিশাল অংশ তোষামোদি ও লেজুড়বৃত্তির উর্ধে থেকে বাংলাদেশে এক স্বপ্নের শিক্ষাব্যবস্থার অংশীদার হবেন মনে করেই এই পেশা বেছে নিয়েছেন অন্য পেশায় না গিয়ে। এই কলুষিত সমাজে (কিছু মনে করবেন না শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী, এর জন্য রাজনীতিবিদদের সৃষ্ট রাষ্ট্র এবং রাজনীতিবিদগণই মুখ্যত দায়ী) থেকেও তা থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টাটি তাদের আছে। তাই নষ্ট শিক্ষকদের কারণে শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তিতে ধস নামার পরও ছাত্র-ছাত্রী-অভিভাবকদের কাছ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষক এখনও শ্রদ্ধা-ভালবাসা পেয়ে থাকেন। জনগণের মধ্যে শিক্ষকদের প্রতি আস্থা এখনও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। শিক্ষকদের এই নিবেদিত অংশ আপনার কথায় কষ্ট তো বটেই, অপমানিতও বোধ করছেন। এমন শিক্ষকদের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন শুধু গোটা শিক্ষক সমাজকেই নয়, ছাত্র-অভিভাবক-জনতা সকলকে শেলসম বিদ্ধ করে। আপনি হয়ত এখন তা উপলব্ধি করছেন না অথবা আপনার চারপাশে থাকা বিজ্ঞজন, যারা প্রতিনিয়ত শিক্ষকদের সম্পর্কে আপনার মনকে বিষিয়ে তুলছেন, তারা তা করতে দিচ্ছেন না। ভয়টি এখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

দুই.

পরাধীন দেশে সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তবুদ্ধি সৃজনে নিয়োজিত শিক্ষদের প্রতি শাসকবর্গের দৃষ্টিভঙ্গি যেমন হওয়ার কথা, পাকিস্তান রাষ্ট্রে তেমনটাই ছিল। তাই এসব শিক্ষায়তন থেকেই দ্রোহের, প্রতিবাদের জন্ম হয়েছে। তারই হাত ধরে একটি জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা এবং মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বপ্ন পরিব্যাপ্ত হয়েছে জনগণের মধ্যে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালী জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজন অনুভব করেছেন। আমরা তাই লাভ করেছিলাম স্বায়ত্তশাসনের রক্ষাকবচ ১৯৭৩ আইন।

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর জীবনদানের পর ক্ষমতায় আসীন স্বৈর সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে আমরা শিক্ষকেরা নিগৃহীত হয়েছি। আমার শিক্ষকতার সোনালি সময়ের পাঁচটি বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছে। সামরিক আইনে পাঁচ বছর সাজা খাটার পরও ’৭৩ আইনের কারণে আমি পুনরায় শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিতে পেরেছি। আমি ক্ষুদ্র ব্যক্তি। কিন্তু আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞানী অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরীকেও কারাগারে যেতে হয়েছে, সাজা খাটতে হয়েছে জিয়ার শাসনামলে।

এরপর আরেক সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ শিক্ষাঙ্গনে সামরিক নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা চালান। ফলে ছাত্র-শিক্ষকগণ কঠিন নিপীড়নের শিকার হন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদের নয় বছরের অপশাসনের অবসান হয় ছাত্র-শিক্ষক-জনতার সম্মিলিত গণঅভ্যুত্থানের ফলে। আসে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসন। শিক্ষক সম্প্রদায়কে সামরিক শাসকের দৃষ্টিতেই তিনি দেখেছেন। সম্মান করেননি। উল্লেখ করার মতো কোন সুযোগ-সুবিধা এ সময় শিক্ষক সমাজ পাননি। সে সরকারকেও বিদায় নিতে হয় প্রবল আন্দোলনের মুখে। শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে সে আন্দোলনে। শিক্ষক সমিতির সভায় বেগম খালেদা জিয়ার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করার কারণে ফজলুল হক হলে আমার বাসায় ছাত্রদল ক্যাডাররা গুলিবর্ষণ করে।

তারপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় এলো। দুই যুগের গভীর অমানিশার পর পুনরায় আলোতে এলো বাংলাদেশ। শিক্ষকরা আপনার কাছ থেকে মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার পেলেন, যেমনটা তারা পেতেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। আপনার সরকারের সুশাসনের ফল পেল বাংলার মানুষ। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া পুনরায় ক্ষমতায় এসে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। সে সময় শামসুননাহার হলে গভীর রাতে ছাত্রীদের ওপর চড়াও হয় ছাত্রদল ক্যাডার ও পুলিশ বাহিনী। ১৮ জন ছাত্রীকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। প্রবল প্রতিবাদ হয় তার বিরুদ্ধে। আমরা শিক্ষকেরা বিপন্ন ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে দাঁড়াই। পুলিশের লাঠি ও বুটের আঘাতে আমার হাঁটু ভেঙ্গে যায়। শয্যাশায়ী থাকতে হয় প্রায় তিন মাস। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, আপনি তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টাওয়ার ভবনে আমাকে দেখতে আপনি এসেছিলেন।

এরপর ২০০৭ সালে দেশে এক দীর্ঘমেয়াদী সেনাশাসন চাপিয়ে দেয়ার নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে এলো সেনাচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। মাইনাস টু ফরমুলা কার্যকর করতে আপনাকে গ্রেফতার করল প্রথমে। আমলারা নন, কার্যকর অর্থে রাজনীতিবিদগণও নন, আমরা ক্ষুদ্রজন এই শিক্ষকেরা সেই দুঃসময়ে আপনার গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ করেছি। মনে আছে সে সময় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অপমানজনক কথা উচ্চারিত হয়েছিল শিক্ষা উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের মুখে। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে তার সমুচিত জবাব ও প্রতিবাদ আমরা করেছি। সেনাশাসকেরা এসব ভুলে যাননি। সে বছরের ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলার মাঠের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র অভ্যুত্থান হয়েছিল। অতীতের মতো আমরা শিক্ষকরা অভিভাবক হিসেবে ছাত্রদের ন্যায্য আন্দোলনে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শিক্ষকদের মুখপাত্র হয়ে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার, সেনাশাসনের অবসান, আপনার মুক্তি এবং দেশে সাধারণ নির্বাচনের দাবি করেছি। তার কারণে আমাদের ছাত্র-শিক্ষকদের রিমান্ড ও কারাগারে যেতে হয়েছে। কঠিন নিপীড়নেও আমরা ভীত হইনি। সত্য উচ্চারণ করতে পেরেছি। দেশের সেই দুঃসময়ে সত্যিকার অর্থেই জাতির বিবেক হয়ে উঠেছিলাম আমরা শিক্ষকেরা।

তিন.

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অন্য কোন রাজনীতিবিদ নন, একমাত্র আপনার সাহস, অনমনীয় দৃঢ়তা এবং আপনার পাশে ছাত্র-শিক্ষকদের সাহসী অবস্থানের কারণে পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে এক দীর্ঘমেয়াদী সেনাশাসন পুনরায় চাপিয়ে দেয়ার নীলনকশা ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৯৭০ সালের মতো আর এক নির্ধারক নির্বাচনী লড়াইয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আপনি সরকার গঠন করেন। এ কথা সত্য, সেনাশাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষক সম্প্রদায়ের গৌরবময় ভূমিকার কথা আপনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে আপনার নিকট জিজ্ঞাসা, কি পেয়েছি আমরা?

বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন স্বায়ত্তশাসন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নীত করতে চেয়েছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঘাতকের হাতে জীবন দিতে না হলে শিক্ষকেরা স্বতন্ত্র বেতন স্কেলও পেতেন। খুব আশা ছিল, শিক্ষকদের ঋণের কথা মনে করে হলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তার মর্যাদার আসনটি দেবেন। শিক্ষকেরা পাবেন স্বতন্ত্র বেতন স্কেল, যেমনটা পেয়েছেন ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং এমনকি পাকিস্তানের শিক্ষকেরা। আমরা কোনটাই পাইনি। অন্যদিকে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র তাদের ক্ষমতার পরিধি বিস্তৃত করেছে ক্রমাগত। কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেমন সরকারী কর্মকমিশন, সায়েন্স ল্যাবরেটরি (বিসিএসআইআর)সহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে পদায়িত হতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য শিক্ষকেরা। সে পদগুলোতে বসানো হলো আমলাদের। শিক্ষা ও গবেষণা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সবচেয়ে লাভজনক- পৃথিবীব্যাপী গৃহীত এই সত্যটির কথা বাংলাদেশের নীতিপ্রণেতাগণ মুখে বললেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে এই খাতে বিনিয়োগ জিডিপির শতকরা হারে সবচেয়ে কম।

ভারত, শ্রীলঙ্কা বা এমনকি পাকিস্তানে শিক্ষকদের গবেষণায় সরকারী অর্থ বরাদ্দের কথা ভাবলেই মনে পড়ে আমাদের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির’ কথা। বছরে যার বাজেট তিন কোটি টাকার সামান্য ওপরে। যেখানে তা হওয়া উচিত অন্ততপক্ষে তিন শ’ কোটি টাকা। হাতেগোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী আছেন। পরিচালকের হাত-পা বাঁধা। তেমন ব্যবস্থাই করে রাখা হয়েছে। সচিব মহোদয়গণ সভা করেন। পরপর যে সচিবেরা দায়িত্ব পালন করে গেছেন এবং এখনও করছেন, তারা কেউ বিজ্ঞানের কোন শাখায় পড়াশোনা করেননি। এদের ভাল কিছু করবার ইচ্ছে যে নেই তা নয়; কিন্তু কথা হচ্ছে উন্নত গবেষণার এসব প্রতিষ্ঠানকে আমলাতন্ত্রের বেড়াজালে কেন আটকে থাকতে হবে? ভারতে সেই ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধীর সময়ে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণাকে আমলাতন্ত্রের খপ্পর থেকে মুক্ত করা হয়েছিল। দেয়া হয়েছিল পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও অর্থ বরাদ্দ। ফল মিলেছে তাতে। যেমনটা মিলছে পাকিস্তানে। আর কতদিন গেলে আমাদের নীতি প্রণেতাদের এসব বিষয়ে বোধোদয় হবে? অর্থমন্ত্রী মহোদয় তার ভাষায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফদের নিয়ন্ত্রণের’ কথা না বলে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির সপক্ষে আপনাকে কবে পরামর্শ দেবেন?

চার.

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে হয়ত বোঝানো হয়েছে, শিক্ষকদের কাজ খুবই সামান্য। আর নিজ দায়িত্বে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতেই তারা ব্যস্ত থাকেন। সে কারণেই হয়ত আপনি শিক্ষকদের লিস্টের কথা বলেছেন। আপনার হাতের সে লিস্টে শিক্ষকদের শতকরা কতভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান সে তথ্যও নিশ্চয়ই আপনি জানেন। সে সংখ্যা খুব বড় নয়। এ বিষয়ে নিজের কথা বলি। বিভাগে তিনটি কোর্সের ক্লাস নেই আমি। সন্ধ্যার পর আমার নিজ সময়ে নিতান্ত সংসারযাত্রার জন্য বাধ্য হয়েই বছরে কখনও কখনও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিষয়ে আমি পাঠদান করে থাকি অবশ্যই আমার বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি-বিধান মেনে। তাও করি সেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে, যার সিলেবাস প্রণয়নে আমি কাজ করেছি এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা সেখানে দেয়া হয় বলে। তা থেকে যৎসামান্য যে রোজগার হয় তার জন্য ট্যাক্স প্রদান করি। উল্লেখ করি, প্রাণবিজ্ঞান বিষয়ে বেশি ছাত্র পাওয়া যায় না বলে হাতেগোনা ভাল কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোথাও এমন বিভাগ খোলা হয়নি। সত্য হলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে আয় বাড়াবার সুযোগ সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষকদের নেই। দয়া করে আপনার গোয়েন্দা সংস্থাকে বলুন আমলাদের সেই তালিকাও আপনার হাতে দিতে যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে নানা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে কাজ করেন। তাদের বাড়ি-গাড়ি ও অর্থবিত্তের কিছুটা খবর নিতে বলুন।

এখনও দেশে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের সংখ্যা বিশাল। বস্তুতপক্ষে শহরের মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষক ছাড়া গ্রামবাংলায় প্রাইমারী, মাধ্যমিক এবং কলেজগুলোতে শিক্ষকেরা অত্যন্ত দুঃস্থ জীবনযাপন করেও নিষ্ঠার সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন। রাষ্ট্র-সরকার-সমাজ দেখেও তা দেখে না। আমি সুযোগ পেলেই ছুটির দিনে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাই। গত ৩১ আগস্ট নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর ওপর মাসব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ দিনে উপাচার্য কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। তার পরদিন লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার মিরপুর হাইস্কুলে যাই। সকাল থেকেই বৃষ্টি। তার মধ্যেও প্রতিটি শ্রেণীকক্ষ ছাত্র-ছাত্রীতে পরিপূর্ণ। শিক্ষকেরা নিবিষ্টচিত্তে পাঠদান করে যাচ্ছেন। ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যায়তন থেকে বিভিন্ন সময়ে পাস করা প্রাক্তন ছাত্ররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন এই সংবাদ জানাবার সময় স্কুলের হেডমাস্টার সাহেবের চেহারায় পরিতৃপ্তির যে আলো আমি দেখেছি তা কি করে ভুলব? জানলাম এমপিওভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানে সরকারী বেতনের বাইরে স্কুলের পক্ষ থেকে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা শিক্ষকেরা পেয়ে থাকেন। তারপরও এই স্কুলকে ও তার ছাত্র-ছাত্রীদের ভালবেসে শিক্ষকেরা বছরের পর বছর প্রত্যন্ত এই গ্রামে শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন। এসব শিক্ষক কি বার্তা পাবেন আপনার বক্তব্যে? এমন শিক্ষকেরা কোন্্ মুখে তাদের স্বপ্নকে ছড়িয়ে দেবেন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে?

পাঁচ.

‘কুসুমেও কীট থাকে’- এ কথাও সত্য। ২০০৮ সালে বন্দী অবস্থায় সেনা চালিত সরকারের উদ্দেশ্য সিএমএম কোর্টে বলেছি, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষকেরা নৈতিকভাবে অধঃপতিত হয়েছেন, দুর্নীতি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে মলিন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বারবার দাবি করেছি। তারা তো সবাই স্বপদে বহাল আছেন শুধু নয়, তাদের সঙ্গেই আপনাদের দেনদরবার।” সে অবস্থার কোন পরিবর্তন তো এখনও হয়নি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। দুর্নীতির জন্য কোন শিক্ষককে সাজা পেতে হয়নি। দুষ্টের দমনে রাষ্ট্রের এমন অনীহার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষায়তনে। তার সুযোগ নিচ্ছে আবার আমলাতন্ত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের ওপর আমলাতন্ত্রের হন্তক্ষেপ বেড়েছে ক্রমাগত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য থাকাকালে আমি তা প্রত্যক্ষ করেছি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কঠিন সময় পার করছি আমরা। যখন আপনার নেতৃত্বে সর্বক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে; যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয়েছে, তখনই বাংলাদেশে দু’জন বিদেশী নাগরিকের হত্যাকাণ্ড; আমাদের দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও কানাডার নাগরিকদের জন্য রেড এ্যালার্ট জারি; অস্ট্রেলীয় ও সাউথ আফ্রিকার ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর বাতিল; আমাদের ‘বাংলাদেশ সোসাইটি ফর বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি’র আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য ওয়ার্কশপে কয়েকজন বিদেশী বিজ্ঞানীর নিরাপত্তার অজুহাতে না আসার সিদ্ধান্ত; খ্রীস্টান চার্চের ফাদারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা; বিশ্ববিদ্যালয় এবং সর্বত্র নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়িত জামায়াত ও সংশ্লিষ্টদের সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টাÑ এমন একটা সময়ে দেশের বিশাল শিক্ষক সমাজকে অপমানে দগ্ধ করার আত্মঘাতী পরামর্শ আপনাকে যারাই দিক তারা যে ঘরের শত্রু বিভীষণ, এই নিখাদ সত্য কথাটি আপনি গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এদের কারণে বঙ্গবন্ধুকে ঘাতকের হাতে জীবন দিতে হয়েছে সপরিবারে। দেশের এই দুঃসময়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে আপনাকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় এরা। আপনি তা হতে কেন দেবেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একটি স্বাধীন দেশে দক্ষ ও জনবান্ধব এবং স্বাধীন আমলাতন্ত্র বড়ই প্রয়োজন। তার জন্য তাদের উচ্চ বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো হোক আমাদের তাতে কোন আপত্তি নেই। সচিব কিংবা অন্য কারও সমান হবার জন্য নয়, গত পাঁচ মাস ধরে শিক্ষক হিসেবে আপন পদমর্যাদা ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের জন্য নীতিনিষ্ঠ শিক্ষকগণই তাদের ন্যায্য আন্দোলনটি করছেন নিতান্ত বাধ্য হয়ে। সমাজের কাছে, ছাত্র-অভিভাবকদের কাছে এই শিক্ষকদের উপহাসের পাত্র করে আলোকিত বাংলাদেশ কখনই গড়া যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে এই বোধ আসতেই হবে যে, দরিদ্র দেশের সাধারণ মানুষের অর্থে লেখাপড়া করেই আমরা শিক্ষক হয়েছি। দেশের মানুষের কাছে আমাদের দায় অনেক। আমরা আইনের উর্ধে নই, জবাবদিহিতারও উর্ধে নই। আমাদের স্বায়ত্তশাসনের ১৯৭৩ আইনে সে আলোকে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সংসদে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাই। আমরা তাতে সাহায্যের হাত বাড়াব।

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘রসাল ও স্বর্ণ লতিকা’ কবিতার দু’টো চরণ শুরুতে উদ্ধৃত করেছি। পুরো কবিতাটির মর্মবাণী গভীর। সবাই, বিশেষ করে রাজনীতিবিদগণ যদি কবিতাটি পাঠ করেন, স্মরণে রাখেন তবেই দেশের মঙ্গল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা তো আপনার ওপর ভরসা করেছি, নির্ভর করেছি। দেশের কথা ভেবে, আমাদের নিজেদের কথা ভেবেই তা করেছি। তা থেকে আমরা সরে আসতে চাই না। সে ভুলও আমরা করব না। যেমনটা করে থাকেন আমাদের দেশের তথাকথিত বিপ্লবীরা। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে বাংলাদেশ ডুবে গিয়েছিল গভীর অন্ধকারে। আপনাকে হারালে সে অবস্থাই হবে। আমরা তা চাইতে পারি না। সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও রাজনীতিবিদের ভাবতে হবে, তারা বারবার ভুল করবেন- দেশকে ডোবাবেন, নিজেরা ডুববেন আর দীনহীন আমরা তাদের উদ্ধারে বারবার এগিয়ে আসব এই জেনে যে, আমরা বঞ্চনা ও অবজ্ঞার পাত্র হতেই থাকব, তা আর কতদিন?

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট