২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

শৈশবের স্মৃতি

(১০ অক্টোবরের পর)

তিনি তার নাতনিদের অর্থাৎ আবদুর রাজ্জাক সাহেবের মেয়েদের ইংরেজী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন এবং তারা অনেকেই কলেজে পড়াশোনা করেন। স্থানীয় লোকের ওজর-আপত্তি তিনি কানে নিতেন না এবং মেয়েদের বাসে উঠিয়ে দেয়ার জন্য দা হাতে নিয়ে তাদের বাসস্টপে নিয়ে যেতেন। আবদুর রাজ্জাক সাহেব পরের দিন সকালে আমাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন। আমার ভাইকেও নিয়ে গেলেন ভর্তি করানোর জন্য। সম্ভবত এটি ১৯৪১ সালের মার্চ মাসের ৭ তারিখ। প্রধান শিক্ষক আমাকে তার দফতরে একটি চেয়ারে বসতে এবং মুন্সী সাহেবকে বাইরে অপেক্ষা করতে বললেন। প্রধান শিক্ষকের দফতরটি এখনও ৭০ বছর আগে যেমন ছিল তেমনই আছে। যদিও স্কুলটির দফতর যে বিল্ডিংয়ে আছে সেইটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দস্যুরা জ্বালিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বিল্ডিংটি স্থানীয় জনগণের দাবির মুখে হুবহু আগের মতো নির্মাণ করা হয়। এই তথ্যটি আমি পাই ১৯৯৩ সালে এই স্কুলের একটি পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে। যাহোক, প্রধান শিক্ষক আমাকে একটি প্রশ্ন করেন। তাকে বলা হয়েছিল যে, আমি ইংরেজী একটু ভাল জানি। তার প্রশ্ন ছিল ‘ডযধঃ রং ুড়ঁৎ হধসব ধহফ যিধঃ রং ুড়ঁৎ ভধঃযবৎ?’ আমি উত্তর দিলাম- ‘গু হধসব রং অ. গ. অ গঁযরঃয ধহফ সু ভধঃযবৎ রং ধ ঢ়ষবধফবৎ’। প্রধান শিক্ষক স্কুলের হেড ক্লার্ক এবং মুন্সী সাহেবকে একসঙ্গে ডেকে বললেন যে, এই ছেলেটিকে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করে নেন।

শৈশবের তিনটি স্মৃতি আমার ভাল মনে আছে। প্রথমটি হলো স্কুলে যাওয়ার আগে ১৯৪০ সালে। সে বছর সিলেটের ছাত্রসমাজ একটি সম্মেলনের আয়োজন করে সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত সারদা হলে। এই আয়োজনের পুরোটাই আমাদের বাড়িতে হয় এবং আমার আব্বা ছিলেন এই ছাত্রগোষ্ঠীর অভিভাবক। ২১ ডিসেম্বরে সারদা হলে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে দু’জনের উপস্থিতি আমার বেশ মনে আছে। আমরা গোটা পরিবার সেই সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলাম। সম্ভবত তখন বাংলার প্রতিনিধি পরিষদের স্পীকার অথবা ডেপুটি স্পীকার সৈয়দ বদরুদ্দোজা এই সম্মেলনে বক্তৃতা দেন এবং এই সম্মেলনে আর একজন অতিথি ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ গায়ক আব্বাসউদ্দিন। সৈয়দ বদরুদ্দোজা সাহেবের খ্যাতি ছিল বাগ্মী হিসেবে এবং আমি তার বক্তৃতা শুনে শুনেই খানিকটা মুখস্থ করে ফেলি। প্রায়ই এই বক্তৃতার অংশ বন্ধু-বান্ধবদের শোনাতাম। গানে আমার কোনই দক্ষতা ছিল না। সুতরাং আব্বাসউদ্দিন সাহেবকে অনুকরণের কোন প্রচেষ্টাই নিইনি। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ১৯৪১ সালের ঘটনা। সেই বছর আমাদের প্রতিবেশী সুপানিঘাটের একজন উকিলের কন্যা কনক পুরকায়স্থ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে (এখনও অটুট) প্রথম মহিলা প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হন। আমরা মহানন্দে এই কৃতিত্ব উদ্্যাপন করি এবং স্কুলে একদিনের ছুটিও উপভোগ করি। দুঃখের বিষয় হলো যে, কনক পুরকায়স্থ দু’বছর পর ২৪ মার্চে মৃত্যুবরণ করেন। আমরা সেই উপলক্ষেও স্কুলে শোকসভা এবং ছুটি উপভোগ করি। নিকট প্রতিবেশী এই কৃতী ছাত্রীকে কিন্তু দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আর তৃতীয় বিষয় ছিল ১৯৪১ সালের ৭ আগস্টে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ। আমরা ইতোমধ্যে কবিগুরুর ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর’ মুখস্থ করে নিয়েছি এবং তার শ্মশ্রুম-িত ছবির সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত। কবিগুরুর মৃত্যুতেও স্কুলে ছুটি হয়।

আমরা যখন স্কুলে ভর্তি হলাম তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এ বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং তার শেষ হয় ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট। বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে আমরা তেমন কিছুই অনুভব করিনি এবং বলতে দ্বিধা নেই যে, এত বড় একটা মহাকা- যে পৃথিবীতে হচ্ছে সে ব্যাপারে আমরা মোটেই অবহিত ছিলাম না। প্রতিবেশীদের মধ্যে যুদ্ধ পুরনো ব্যাপার এবং দিগি¦জয়ী বীরেরা বিভিন্ন দেশ আক্রমণ করে রাজত্ব বিস্তার করেন সেটাও একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে গৃহীত ছিল। ইউরোপে বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ খুব বেশি ছিল এবং তাতে বিভিন্ন দেশ জোটবদ্ধ হয়ে যেত। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালের আগে কখনও হয়নি।

১৮৯৮ সালে স্পেন ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ বাধে। দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনের উপনিবেশ কিউবা স্বাধীন হতে চায় এবং তাতে স্পেন বাদ সাধে; অন্যদিকে আমেরিকা কিউবাকে সমর্থন জানায়। মূলত এই কারণেই যুদ্ধটি বাধে। মাত্র সাড়ে ৩ মাসের যুদ্ধে স্পেনের সমূহ ক্ষতি হয়। তারা দক্ষিণ আমেরিকায় কিউবা, পুয়ের্টোরিকো এবং গুয়ামে কর্তৃত্ব ছেড়ে দেয়। কিউবা হয় স্বাধীন আর গুয়াম নেয় আমেরিকা। পুয়ের্টোরিকো আমেরিকার তত্ত্বাবধানে আসে এবং আজ পর্যন্ত এই এলাকার চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারিত হয়নি। একই যুদ্ধের ফলে স্পেন এশিয়ায় ফিলিপাইনে তাদের ৩৩৩ বছরের দখল আমেরিকার কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। স্পেন-মার্কিন যুদ্ধটি তিনটি মহাদেশে বিস্তৃত হয়। কিন্তু সেটাও ঠিক বিশ্বযুদ্ধ ছিল না। যুদ্ধে লিপ্ত দল ছিল দু’টিÑ স্পেন এবং আমেরিকা এবং আরেকটি দল ছিল স্পেনের উপনিবেশ কিউবা। বিশ্বের অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্র এতে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

বিংশ শতাব্দীতে বলতে গেলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয় ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত। ইউরোপ তখন দুটি দলে বিভক্ত। এক দলে ছিল ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ও তাদের সহযাত্রী ছিল রাশিয়া ও রোমানিয়া। অন্যদিকে ছিল অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, জার্মানি, ইতালি এবং অটোমান তুর্কী। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই সেরাজেবোতে অস্ট্রো হাঙ্গেরিয়ান আততায়ীর গুলিতে নিহত হন অস্ট্রিয়া হাঙ্গেরির যুবরাজ আর্কডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড (অৎপযফঁশব ঋৎধহু ঋবৎফরহধহফ)। সার্বিয়াকে এই হত্যার জন্য দায়ী করে অস্ট্রো হাঙ্গেরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সার্বিয়ার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক ছিল রাশিয়ার। তাই রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষে যুদ্ধে নেমে পড়ে। এ থেকেই হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা। ইউরোপে বিভক্ত শক্তিগুলো দুই মোর্চায় একে অন্যের সম্মুখীন হয়। জার্মানি সে সময় ছিল সবচেয়ে প্রাগ্রসর শক্তি এবং তাদের যুদ্ধাস্ত্র ছিল সবচেয়ে আধুনিক। তারা ইউরোপ দখলে ব্যস্ত হয়ে গেল। ইতালি ১৯১৫ সালে ও রোমানিয়া ১৯১৬ সালে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লো এবং ১৯১৭ সালে আমেরিকা হয়ে গেল মিত্রশক্তির নেতা। অন্যদিকে রইলো অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, জার্মানি এবং অটোমান তুর্কী। এই যুদ্ধে সৈন্যসংখ্যা ছিল ৭ কোটি। ৩৮ মাসের যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৬০ লাখ। এভাবেই প্রথমবারের মতো একটি যুদ্ধে যত সৈন্য মারা গেল প্রায় তত নিরস্ত্র লোকও নিহত হলো। নিহতদের মধ্যে ৯০ লাখ ছিল সৈন্য আর ৭০ লাখ নিরস্ত্র জনগণ। এই যুদ্ধটি পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশে বিস্তৃত হয় এবং যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে কোন নির্দিষ্ট এলাকা ছিল না।

চলবে...

নির্বাচিত সংবাদ