২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্রামে উন্নত সড়ক দ্রুত এগিয়ে নেবে এসডিজি

  • বাড়বে প্রবৃদ্ধিও

সমুদ্র হক ॥ পল্লী সড়ক উন্নয়নের সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ায় দারিদ্র্যর হার দ্রুত কমছে। গ্রামের অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের আয় বেড়েছে। সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) নির্ধারিত সময়ের আগে অর্জনের পর জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) দ্রুত পূরণ হবে, গ্রামের চিত্র তাই বলে দেয়। সারাদেশে এ পর্যন্ত তিন লাখ কিলোমিটারেরও বেশি পল্লী সড়ক নির্মিত হয়েছে। ২০২১ সালের আগেই দেশের প্রতিটি এলাকায় পাকা সড়ক নির্মিত হয়ে সব নগর-মহানগরের সঙ্গে যুক্ত হবে, প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে, এমনটি আশা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের গ্রামীণ সড়কের অবস্থা সবচেয়ে ভালো। গ্রামাঞ্চলে প্রতি এক শ’ বর্গকিলোমিটার এলাকায় উন্নত সড়ক আছে ২শ’ ৩০ কিলোমিটার। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একই আয়তনে উন্নত সড়ক ১শ’ ৪৬ কিলোমিটার, পাকিস্তানে এবং নেপালে যথাক্রমে ৩৫ ও ১৪ কিলোমিটার। এ জরিপ বিশ্বব্যাংকের। দেশে গত শতকের ৮০’র দশকের মধ্যভাগ থেকে গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। ওই সময়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের পাশাপাশি পল্লী সড়ক উন্নয়নের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরকে (এলজিইডি) যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। লক্ষ্য থাকে গ্রামীণ দারিদ্র্য কমানো। পাকা সড়ক হয়ে যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে মানুষ উন্নয়নের পথ খুঁজে পাবে। বিশেষ করে সব ধরনের ফসল ফলানোর উপকরণ নাগালের মধ্যে প্রাপ্তি এবং কৃষিপণ্য বিপণনের সুবিধা সৃষ্টি হলে কৃষক আপন গতিতেই মাঠে নামবে। সম্পূরক উৎপাদনের পথ তৈরি হবে। পল্লী সড়ক উন্নয়নে প্রাথমিক অবস্থায় চারটি ভাগ করা হয়। উপজেলা সড়ক, ইউনিয়ন সড়ক, গ্রাম সড়ক-১ ও গ্রাম সড়ক-২। এর মধ্যে সামান্য কিছু সড়ক মাটির রাস্তা, তবে তাও উন্নত। মাটির সড়ক পাকা হচ্ছে। পল্লীর সড়ক ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় দেশের যে কোন জেলা শহর থেকে উপজেলা সদর এবং সেখান থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে এখন অতি অল্প সময়ে সরাসরি পৌঁছা যায়। জেলা থেকে উপজেলা যেতে যে গ্রামগুলো পড়ে সেগুলোও যথেষ্ট উন্নত হয়েছে। পাকা সড়কের ক্রসিংয়ে ও মোড়ে শহরের মতোই বিপণি কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। শহরে যেসব পণ্য পাওয়া যায় গ্রামেও এখন তাই মেলে। প্রতিটি গ্রামের সঙ্গে যন্ত্রচালিত যানবাহন বাস, মিনিবাস, হিউমেন হলার, সিএনজি চালিত অটোরিক্সা, ব্যাটারি চালিত থ্রি হুইলার এমনকি মোটর চালিত রিক্সাভ্যান, শ্যালো ইঞ্জিন চালিত ভটভটি লসিমন চলাচল করে। গ্রামীণ যানবাহন প্রকারন্তরে দারিদ্র্য কমিয়েছে। একজন ভ্যানচালক দিনমান যে রোজগার করে তা দিয়ে তার সংসার খুব ভলভাবে চলে এবং বাড়তি রোজগারে সে ঘর-গৃহস্থালিকেও এগিয়ে নিতে পারছে। গ্রামে দারিদ্র্য কমে যাওয়ায় তাদের বসতভিটাতেও উন্নয়নের রেশ পড়েছে। একটা সময় গ্রামের সংজ্ঞা ছিল মেঠোপথ ও কুঁড়েঘর। একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগে সেদিনের সেই চিহ্ন এখন বিরল। মাটির রাস্তা বা মেঠোপথ কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে তবে কুঁড়েঘর (বেড়ায় ঘেরা খড়ের বা ছনের চালা) দর্শন কঠিন। প্রায় সব বাড়ি টিনের চালা এবং আধাপাকা। তবে কোন এলাকায় যেমন বগুড়ার পশ্চিমাংশ, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও দিনাজপুরের গ্রামে মাটির একতলা ও দোতলাঘর দেখা যাবে, সঙ্গে পাকা ঘর নির্মিত হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি গ্রামে সেদিনের সেই গোয়ালঘর নেই। পাকা সড়ক ধরে কৃষির যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকা-ের যন্ত্রপাতি পৌঁছে যায়। যেমন পাওয়ার টিলার, সেচযন্ত্র, ধান কাটা ও মাড়াই যন্ত্র সবই পৌঁছে গেছে গ্রামে। কৃষক গরু-ছাগল, হাস-মুরগি পালন করে ক্ষুদে ডেইরি ও পোল্ট্রি ফার্মের আদলে।

উন্নত সড়ক নদী তীরবর্তী এলাকা এবং চরেও হচ্ছে। ভাঙ্গনকবলিত এলাকা বগুড়ার সারিয়াকান্দির অনেক চরে এখন পাকা সড়ক নির্মিত হয়েছে। যন্ত্রচাালিত হালকা যান সেই চরেও পৌঁছেছে। এসব চরে গেলে বোঝাই যায় না নদীর মধ্যে কোন গ্রাম। পাকা সড়কের সঙ্গে বিদ্যুত পৌঁছে চরের জীবনমান পাল্টে গিয়েছে। যমুনা তীরের গ্রাম ও চরগ্রামে যত উন্নয়ন গত প্রায় ৬ বছরে হয়েছে তার এক কানিও আগে হয়নি। লোকজন এ উন্নয়নের সরাসরি ক্রেডিট দেয় সেই আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নানকে। তিনি সড়ক পাকা করেই ক্ষান্ত হননি উন্নয়নের সকল ছোঁয়া লাগাতে বিদ্যুতও পৌঁছে দিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছেন আগামী দুই বছরের মধ্যে সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার (আসন-১) প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুত পৌঁছবে এবং সকল সড়ক পাকা হবে।

গ্রামের সড়ক উন্নয়নের সঙ্গেই মানুষ তার নিজের গরজেই রোজগারের বাড়তি পথ খুঁজে নিয়েছে। গ্রামের নারী স্বাবলম্বী হতে কেউ বেছে নিয়েছে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন, কেউ সেলাই মেশিনে কাজ করে উপজেলা ও জেলা শহরে পৌঁছে দিয়ে মিনি গার্মেন্টসের নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। বগুড়া শহরের কাছাকাছি গ্রামের নারী মেয়েদের পোশাকে পাথর চুমকি বসানোর কাজ করছে। এসবই সম্ভব হয়েছে গ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে। তারা এখন অতি স্বল্প সময়ে জেলা ও উপজেলা শহরে গিয়ে কাজের সন্ধান করে অর্ডার নেয় এবং সময়মতো সরবরাহ করে। এক জরিপে দেখা গেছে, যেসব এলাকার সড়ক উন্নত হয়েছে সেখানে ৯৬ ভাগ পরিবারের আয় বেড়েছে নানাভাবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মের সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিভাগ, রাজশাহী বিভাগের বগুড়ায় এবং সিলেট বিভাগে এই হার বেশি। খুলনা বিভাগে এ হার ৮৫ শতাংশ, চট্টগ্রামের ৮০ শতাংশ। বরিশাল ও রংপুর বিভাগে এ হার যথাক্রমে ৭০ ও ৬৫ শতাংশ। তবে সড়ক উন্নয়নের চলমান প্রক্রিয়া থাকায় এ হারও বাড়ছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকা-ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নত সড়ক যোগাযোগের আগে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৭ শতাংশ, সড়ক নির্মিত হওয়ার বছর তিনেকের মধ্যে তা নেমে আসে ২০ শতাংশে। আবার যেখানে পাকা সড়ক হয়নি শহরের ও উপজেলার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলা যায়নি সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। কাছের উন্নত গ্রামের কাছে সেই গ্রাম আলোর নিচে অন্ধকারের মতোই। বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলে তা লক্ষ্য করা যায়। আবার দক্ষিণাঞ্চলের মাগুরা, ঝিনাইদহ জেলার যে গ্রামগুলো বছর দশেক আগেও ছিল ঘোর পল্লী, পাকা সড়ক হওয়ায় তা এখন অনেক উন্নত। গ্রামে পাকা সড়ক নির্মিত হওয়ার সঙ্গেই উন্নয়নের ধারায় বিদ্যুত পৌঁছেছে। কৃষিসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পথও তৈরি হয়েছে। উৎপাদিত পণ্য দ্রুত সরবরাহ করতে পারায় গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা এতটাই সচল হয়েছে যার প্রভাব পড়েছে প্রবৃদ্ধির হারে। গ্রামীণ চাঙ্গা অর্থনীতির সঙ্গে রেমিটেন্সও যোগ হয়েছে। অর্থাৎ প্রবাসে যাঁরা থাকেন তাঁরাও পাকা উন্নত সড়কের পথ ধরেই গ্রামে কিছু একটা করতে পারছেন।