২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাকৃবি ক্যাম্পাসে প্রকৃতির ছোঁয়া

  • মোঃ আব্দুর রহমান

দেশের কৃষি শিক্ষার অন্যতম প্রাঙ্গণ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। বাংলাদেশর কৃষি খাতের আধুনিকায়নে বাকৃবির অবদান অনেক। ১৯৬১ সাল থেকে শুরু করে আজ অবধি বিভিন্ন গবেষণায় বাকৃবি পেয়েছে সাফল্য। যার ফলে দেশের গ-ি পেরিয়ে বিশ্বের কাছে একটি পরিচিত নাম, পরিচিত শিক্ষাঙ্গন, পরিচিত গবেষণাগার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বাকৃবির ক্যাম্পাসের শিক্ষাদীক্ষা ও গবেষণায় যেমন সুনাম রয়েছে, সেই সুনামকে আরও ব্যতিক্রমধর্মী করেছে এর বেশকিছু স্থাপনা, যেগুলো দেশসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বেও প্রায় বিরল। এগুলো হচ্ছে কৃষি মিউজিয়াম, মৎস্য মিউজিয়াম, জার্মপ্লাজম সেন্টার এবং আন্তর্জাতিক মানের বোটানিক্যাল গার্ডেন।

কৃষি জাদুঘর

বাংলাদেশের একমাত্র সমৃদ্ধ কৃষি জাদুঘর বাকৃবি ক্যাম্পাসে অবস্থিত, যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই। এখানে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য সম্পন্ন বিভিন্ন নিদর্শন মমি করে রাখা হয়েছে। সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি পর্যন্ত ব্যবহারিত আধুনিক কৃষি যন্ত্রসামগ্রী। আরও সংরক্ষণ করা হয়েছে বিভিন্ন ফসলের বীজ এবং কৃষি খেতের বিভিন্ন কীটপতঙ্গ। এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গ্রামবাংলার চিরাচরিত বৈচিত্র্য, পরিবেশ, যেখানে গিয়ে আপনি ক্ষণিকের জন্য হলেও হারিয়ে যাবেন গ্রাম্য পরিবেশের স্মৃতিতে।

মৎস্য জাদুঘর

বাংলাদেশের একমাত্র এবং দক্ষিণ-এশিয়ার সর্ববৃহৎ মৎস্য জাদুঘর অবস্থিত প্রকৃৃতি কন্যা খ্যাত এই বাকৃবি ক্যাম্পাসের গ-িতেই। দ্বিতল ভবন বিশিষ্ট মিউজিয়ামটিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে দেশীয় স্বাদু পানির এবং সামুদ্রিক মাছ। বাংলাদেশের ২৯৩ প্রজাতির মাছের মধ্যে প্রায় ২৪৫ প্রজাতি সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বাকিগুলো সংগ্রহের কাজ চলছে। মাছের নমুনাগুলো বিভিন্ন আকৃতির কাঁচের সিলিন্ডারে ফরমালিনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে এবং মাছ সম্পর্কিত সকল তথ্য সিরিন্ডারের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

এছাড়া হাঙ্গর, ডলফিন ও কুমিরের কঙ্কালসহ বিভিন্ন প্রকার কচ্ছপ ও কাঁকড়ার নমুনও রয়েছে এখানে। রয়েছে ক্যাটফিস, ঘুড়ামোখা, পুটাকাস্তি জাতীয় বিলুপ্ত মাছ। অন্য একটি কক্ষে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে থ্রিডি অডিও-ভিজুয়াল সুবিধা। জাদুঘরটিতে প্রায় ৪০টি জীবাশ্ম ও কঙ্কাল সংগৃহীত রয়েছে। এছাড়া ৪৫৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ সংগ্রহের কাজ চলছে। এ্যাকুরিয়ামে রাখা হয়েছে দুষ্প্রাপ্য ও সৌন্দর্যবর্ধক মাছ। জাদুঘরটির করিডরে রাখা হয়েছে, আবহমানকাল ধরে চলে আসা জেলেদের মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ ও যন্ত্র সামগ্রী।

জার্মপ্লাজম সেন্টার

বাংলাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জার্মপ্লাজম সেন্টার অবস্থিত এই শ্যামল ক্যাম্পাসেই। এ যেন এক জীবন্ত ফল ঘর। ২২ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা এই জার্মপ্লাজম সেন্টারে রয়েছে ১৬৩ প্রজাতির ১০ হাজার দেশী বিদেশী ফলের মাতৃগাছ।

এর মধ্যে ১৬২ রকমের আম, ৪৪ রকমের পেয়ারা, ৪৮ রকমের লেবু, ২৩ রকমের লিচু, ৯৪ রকমের কাঁঠাল, ৬৭ প্রজাতির বিলুপ্ত প্রায় ফল, ৬৮ প্রজাতির ঔষধি ও ১৯টি দেশ থেকে সংগৃহীত ৪২ প্রজাতির ফল। বাংলাদেশের উদ্ভাবিত নতুন নতুন প্রজাতির ফলের সিংহভাগ আবিষ্কৃত হয়েছে এই জার্মপ্লাজম সেন্টারেই। জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক ড. আবদুর রহিম স্যারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২২ বছরের ইতিহাসে ৬৭ জাতের নতুন ফলের জাত আবিষ্কৃত হয়েছে থাইল্যান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত বাকৃবির এই জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে।

বোটানিক্যাল গার্ডেন

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন একটি আন্তর্জাতিক মানের বোটানিক্যাল গার্ডেন। কৃষি অনুষদের ক্রপ-বোটানি বিভাগের আন্ডারে পরিচালিত গার্ডেনটির আয়তন প্রায় ২৫ একর। এখানে সুন্দরবন, ক্যাকটাস ও ঔষধি জোনসহ মোট ৫৩ জোনের অধীনে প্রায় ৫৫৮টি উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। বোটানিক্যাল গার্ডেনটির একটি অন্যতম সংরক্ষণ হচ্ছে তালিপাম নামক উদ্ভিদ। এখানে রয়েছে ৭টি তালিপাম চারা গাছ, যা বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বোটানিক্যাল গার্ডেনের সহকারী কিউরেটর জানান, প্রজাতির দিক দিয়ে এটি দেশের এক নম্বর বোটানিক্যাল গার্ডেন।

এই স্থাপনাগুলো ছাড়াও ক্যাম্পাস চত্বরে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান শাখা, বাংলাদেশ স্বাদু পানির মৎস্য ইনস্টিটিউট। দেশের একমাত্র নদ ব্রহ্মপুত্র, যা বয়ে গেছে ক্যাম্পাস চত্বরকে ঘেঁষেই। তাছাড়া স্বাধীনতার স্মারক বিজয় ৭১, মরণসাগরসহ বিভিন্ন ভাস্কর্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে অসাধারণ সাজে সজ্জিত করেছে। ক্যাম্পাসের বিশালতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিরল স্থাপনার অধিকারী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে, ক্যাম্পাসের পাশাপাশি দর্শনীয় স্থান বললেও ভুল বলা হবে না। সত্যিই, নিজের চোখে না দেখলে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যাবে না।