২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চনমনে পুজোকেন্দ্রিক অর্থনীতি

  • আরিফুর সবুজ

শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি বাঙালীর হৃদয়ে বীণা বাজিয়ে চলেছে। শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ আয়োজন সেই বীণার সুরকে করে তুলছে আরও মধুর। ঢাকের বাদ্য, কাঁসার ঘণ্টা ও মঙ্গল শাঁখের মিষ্টি ধ্বনির মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমণের প্রতীক্ষায় হিন্দু সম্প্রদায়। এ উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আধ্যাত্মিকতার অনুভূতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এ উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন এবং শান্তির ঐতিহ্য। মুসলমানদের ঈদ-উল-ফিতর, ঈদ-উল-আজহা, খ্রীস্টানদের বড়দিনকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে অর্থনীতিতে যে গতি ব্যাপক আসে, তেমন গতি দুর্গোৎসবকে ঘিরেও আবর্তিত হয়। আর সপ্তাহখানেক বাদেই শুরু হবে সর্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব। সর্বত্রই পুরোদমে চলছে পুজো আয়জনের প্রস্তুতি। সেই সঙ্গে একে ঘিরে চনমনে হয়ে উঠছে দেশীয় অর্থনীতি।

অতীত ও বর্তমানের কিছু কথা

পনেরো শ’ শতাব্দী পর্যন্ত এ বঙ্গে কেবল কিছু উচ্চবর্ণের হিন্দুরা গৃহকোণে সাদামাটাভাবে আয়োজন করত দুর্গাপুজো। ধারণা করা হয়, পনেরো শ’ শতাব্দীর শেষের দিকে দিনাজপুরের জমিদার প্রথম ঘটা করে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। জমিদাররাই ছিলেন মূলত এ পূজার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। পুজোকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ও ছিল সীমিত। এরপর বারোজন বন্ধু মিলে সমষ্টিগতভাবে ১৭৯০ সালে হুগলী জেলায় বেশ ঘটা করে বারোয়ারী পুজো নামে এ পুজোর আয়োজন করলে দুর্গাপূজা গৃহকোণ ছাড়িয়ে সবর্ত্র উৎসবের আমেজে পালিত হতে থাকে। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকে পুজোকেন্দ্রিক অর্থনীতিও। গ্রামে ছোট বাজেটের পুজো হলেও শহরে বড় বাজেটের পুজো আয়োজিত হচ্ছে। এ কারণে গ্রামের চেয়ে শহরেই পুজোকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা- বেশি চোখে পড়ে।

ব্যস্ত প্রতিমা ও মৃৎশিল্পীরা

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পীরা। তারা সারাবছর অপেক্ষা করেন কেবল এই সময়টার জন্য। দু-তিন মাস আগ থেকেই অর্ডার অনুযায়ী কারিগররা মূর্তি বানানোর কাজ শুরু করেন। মূর্তির আকার অনুযায়ী কারিগর ও মজুরি নির্ধারিত হয়। একেকটি মূর্তির দাম পড়ে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা থেকে তিন-চার লাখ টাকা পর্যন্ত। শাঁখারীবাজারের শিমুলিয়া শিল্পালয়ের পল্টন পালের দোকানে সাজানো চল্লিশ হাজার টাকার মূূর্তিটি বানাতে চারজন কারিগর টানা আটদিন কাজ করেছেন। পল্টন পাল বলেন, সারাবছর ধরে আমরা মূর্তি বানালেও তা খুবই স্বল্প পরিমাণে। আমাদের এ সময়টার জন্যই অপেক্ষা করে থাকতে হয়। শ্রমিক, অর্থসহ অন্যান্য সামর্থ্য বিবেচনা করেই আমরা অর্ডার নেই। আমি এ বছর আটটি মূর্তি বানানোর অর্ডার নিয়েছি। কেউ কেউ বিশটিও নিয়েছেন। পল্টন পালের মতো প্রতিমাশিল্পীরা এখন ব্যস্ত মূর্তিতে শেষ তুলির আঁচড় বসাতে। পুজোকে কেন্দ্র করে প্রতিমাশিল্পীদের সঙ্গে সঙ্গে অন্য মৃৎশিল্পীরাও বেশ ব্যস্ত সময় কাাঁচ্ছেন। মাটির ঘট, হাঁড়ি, কলসির বিক্রি বেড়ে গেছে অনেক। ফলে মৃৎশিল্পীদের মুখে ফুটছে হাসি।

ঢাক ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়ী এবং ঢাকীদের মুখে হাসি

দুর্গাপূজার আয়োজন হবে, ঢাক বাজবে না তা কল্পনাও করা যায় না। পুজোকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে ঢাক ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসায়। দুই হাজার থেকে শুরু করে পনেরো হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে এক একটি ঢোল। এ সময়টায় ঢোলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও কিছুটা বেড়ে গেছে। অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ডাক পড়েছে ঢাকীদের। মজার বিষয় হলোÑ গ্রামের ঢাকীরা ছুটে আসছেন শহরে আর শহরের ঢাকীরা বেশি মজুরিতে ছুটে যাচ্ছেন গ্রামের দিকে। বাদ্য ভা-ারের নয়ন রায় বলেন, এখন কোন ঢাকীর সঙ্গে বায়না করা সম্ভব নয়। কাঠাম পুজোর সময়ই বায়না হয়ে গেছে সব ঢাকীর। পুজোর সময়ের জন্য তার দোকানের ঢাকী ত্রিশ হাজার টাকা বায়নায় টাঙ্গাইলে চলে গেছেন। পুজোকে ঘিরে ঢাকী এবং ঢাক ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়ীদের আয় বেড়ে গেছে বহুগুণ।

জমজমাট পুজোর উপকরণের ব্যবসা

আসন্ন পুজো উপলক্ষে প্রতিমা তৈরির প্রধান উপাদান যেমন মাটি, বাঁশ, কাঠ, বিচালি, পাট, ছন, খড়, শোলা, রং, গর্জন তেল ও জরি ইত্যাদির চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। ফলে এসব ব্যবসায়ীর বিক্রি-বাট্টা অন্য সময়ের তুলনায় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। প্রতিমা সাজঘরে থরে থরে সাজানো শোলার ফেস্টুন। ক্রেতার প্রচ- ভিড়। দর-দাম করতে করতেই প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার বললেন, এই সময়টাতেই আমরা আসলে ব্যবসা করি। অন্য সময় দোকানে কাস্টমারই পাই না। এ আয় দিয়েই সারাবছর চলতে হয়। শাঁখারীবাজারে পুজোর উপকরণের অন্যান্য দোকানগুলোতেও উপচেপড়া ভিড়।

শাঁখা, সিঁদুর ও গহনা, পোশাকসহ সাজসজ্জা

শাঁখারীবাজারের শাঁখার দোকানগুলোতে উপচেপড়া ভিড়। নানা বয়সী হিন্দু রমণীরা পছন্দমতো শাঁখা কিনতে ভিড় করছেন। বিধান শঙ্খ ভা-ারের ভবতোষ নন্দী বলেন, শাঁখার চাহিদা সব সময়ই আছে। তবে পুজোর সময় স্বাভাবিকভাবেই বেচাবিক্রি বেশি হয়। সিঁদুর, কসমেটিকস, স্বর্ণালঙ্কারসহ নারীদের সাজসজ্জা ও প্রসাধনের দোকানগুলোতে প্রচ- ভিড়। ক্রেতার ভিড়ে বিক্রেতারা যেন দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না। তাছাড়া জামাকাপড় ও জুতোর দোকানেও পুজো উপলক্ষে বেশ বেচাকেনা চলছে। দর্জিরা পুজো উপলক্ষে পার করছেন ব্যস্ত সময় ।

মিষ্টান্ন, ফুল, ফল, পাতাসহ অন্যান্য

খাবার ও খাদ্য উপকরণ

এখনও পুজো উপলক্ষে জমে ওঠেনি ফুল, ফল, মিষ্টান্নসহ অন্যান্য খাবারের ব্যবসা। তবে পুজোর দু-একদিন আগ থেকে এসব খাবারের ব্যবসা জমে উঠবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। পুজোর সময় মিষ্টান্নদ্রব্যের চাহিদা বাড়ে। সন্দেশ, রসগোল্লা, রাজভোগ, পানতোয়া, লেডিকেনি, মিহিদানা, আমিত্তি, জিলাপি, খাজা-গজাসহ আরও অনেক রকম মিষ্টান্ন খাবার বিক্রির ধুম পড়ে যায়। পুজোতে ফুল ও ফলের চাহিদাও ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। অন্যান্য সুস্বাদু খাবার ও খাদ্য উপকরণের চাহিদা বৃদ্ধি পায় বলে এগুলোর বিক্রি অন্য সময়ের তুলনায় বেশি হয়। তাছাড়া পুজোতে বেলপাতা, আমপাতা ও তুলসীপাতার চাহিদাও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। শাঁখারীবাজারের ফুটপাতে দোকান সাজিয়ে বসা লক্ষ্মী দেবী বলেন, পুজোতে এসব অনেক বেশি বিক্রি হয়। অন্য সময় দিনে এক থেকে দেড় শ’ টাকা আয় করলেও এ সময়টায় দিনে পাঁচ থেকে ছয় শ’ টাকা আয় হয়।

অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকা-

পুজো উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গায় চলছে মেলার প্রস্তুতি। খোলা আকাশের নিচে শামিয়ানা টাঙিয়ে সারি সারি করে বসবে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান। এসব দোকানে হরেক রকম পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসবেন দোকানিরা। প্লাস্টিকের তৈরি নানা রকম খেলনা, প্রসাধনসামগ্রী, মাটির পুতুল, কাঁচের চুড়ি, রঙ্গিন ফিতা থেকে শুরু করে ঘর-গৃহস্থালির হাজারো রকমের জিনিস বিক্রি হবে এসব মেলায়। ফলে মেলাকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মচঞ্চলতা বেড়ে যাবে বহুগুণ। তাছাড়া পুজোতে পুরোহিতদের আয় বেড়ে যায়। অনেকে ব্রাক্ষণ হওয়ার সুবাধে সাময়িক পুরোহিতের ভূমিকা পালন করে অনেক দক্ষিণা অর্জন করেন। পুজোর অর্থনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পর্যটন খাত। বিভিন্ন দেশ থেকে তীর্থস্থানগুলোতে লোকজন আসেন। যার ফলে পর্যটন খাত হয়ে ওঠে চাঙ্গা। দুর্গোৎসবকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তা কালীপূজো ও লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত চলতে থাকবে।