২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আনারসের সম্ভাবনা

  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

আনারসের বৈজ্ঞানিক নাম আনানাস কমসাস। আনারস একটি সুস্বাদু চর্বি বিযুক্ত পুষ্টিকর ফল। আনারস তাজা, রান্না করা, নির্যাসিত ও সংরক্ষিতভাবে খাওয়া যায়। খাবারের বাইরে আনারসের তন্তু দিয়ে পরিধেয় তৈরি হয়। দেশে ও বিদেশে আনারসের চাহিদা ব্যাপক। আনারস উৎপাদনের শীর্ষে ফিলিপাইন ও ব্রাজিল। আফ্রিকার ঘানাও প্রচুর আনারস উৎপাদন করে। এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে ভারত, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশে আনারস উৎপাদন হয়। পৃথিবীতে প্রায় ৯০ রকমের আনারস উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রধানত ৫ রকমের, যথা: কেলেন্ডুলা, ঘোড়াশাল, জায়েন্টকিউ, হানিকুইন ও জলডুবি আনারস উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে প্রশংসনীয়ভাবে দেশের অন্যতম পার্শ্ব-ফসল হিসেবে আনারসের উৎপাদনশীলতার ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দেশব্যাপী দৈবচয়ন ভিত্তিক জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি সঙ্কলিত হয়েছে। এই জরিপে যে সব গৃহস্থালী কমপক্ষে ৫ শতক জমি আনারস চাষে প্রযুক্ত করেছে তারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশে টাঙ্গাইল, রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রাম, বান্দরবন, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খাগড়াছড়ি, সিলেট ও মৌলভীবাজারে আনারসের চাষ হয়। আনারসের চাষে প্রযুক্ত জমির সমকালীন পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার একর। গৃহস্থালীর আনাচে-কানাচে খোরপোষের জন্য উৎপাদন হিসেবে নিলে বলা চলে, দেশে প্রায় ৮০০০০ একর জমিতে আনারস উৎপাদিত হয়। সাধারণত পাকা আনারস জনগণ খেয়ে থাকেন। কাঁচা বা আধাকাঁচা আনারস আচার হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সিরাপ, জেলী, ভিনেগার ও সাইট্রিক এসিড আনারস থেকে উৎপাদিত হয়।

জরিপে দেখা গেছে , আনারস উৎপাদনে প্রযুক্ত জমির প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ নিজস্ব মালিকানার, শতকরা ১২.৫ ভাগ ইজারায় নেয়া, শতকরা ২ ভাগ বন্ধককৃতভাবে পাওয়া এবং শতকরা ২.৫ ভাগ ভাগ-চাষের শর্তে চাষে প্রযুুক্ত। এর অর্থ, আনারস চাষে প্রযুক্ত শতকরা ৮০ ভাগ জমি ব্যক্তিগত ও নিজস্ব মালিকানাধীন থাকার ফলে যথাযথ কার্যক্রমের আওতায় তা সহজেই উন্নয়ন ও পরিবর্তনযোগ্য। জরিপে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি একর আনারস উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় চারা রোপণে দিবসের হিসেবে প্রায় ৭ জন, আগাছা পরিষ্কার করণে প্রায় ১৮ জন এবং ফসল ওঠানোয় প্রায় ১১ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। দৃশ্যত আগাছা সাফকরণ এবং ফসল তোলার প্রক্রিয়ায় যথাযথ যন্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শ্রমিকের প্রয়োজন তথা শ্রমবাবদ উৎপাদন ব্যয় অংশত কমানো এবং এ দুই কাজের নিপুণতা বাড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে ফিলিপাইন ব্রাজিল কিংবা হাওয়াই এ আগাছা পরিষ্কার করা কিংবা ফসল তোলার ক্ষেত্রে যে যন্ত্রিকীকরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা বীক্ষণ করে যথাযথ পদক্ষেপ এদেশেও নেয়া বাঞ্ছনীয়।

জরিপে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এক একর আনারসের উৎপাদনে ব্যয় হয় প্রায় ৩৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে সবচাইতে বেশি, শতকরা ৩২.২ ভাগ ব্যয় হয় সার বাবদ, শতকরা ১১.৬৩ ভাগ ব্যয় হয় আগাছা পরিষ্কারকরণে, শতকরা ২২.১০ ভাগ প্রয়োজন হয় চারা তৈরি করণে। পরিবহনে ব্যয় হয় শতকরা ১০.৫৭ ভাগ। দৃশ্যত বীজ-চারা তৈরি এবং আগাছা পরিষ্কারকরণে পদ্ধতি উন্নয়ন বা যথাযথ যন্ত্রীকীকরণ একর প্রতি উৎপাদনের ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রযুক্তকরণ সমীচীন হবে।

জরিপে দেখা গেছে, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষরত সকল গৃহস্থালীর শতকরা প্রায় ৩৪ ভাগ ব্যাংক থেকে, শতকরা ১৮ ভাগ বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বা এনজিও থেকে এবং ১৭.৫ ভাগ গৃহস্থালী মহাজন থেকে এবং ১৮ ভাগ গৃহস্থালী ফড়িয়া বা পাইকার থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকেন। এ সকল উৎস থেকে প্রাপ্ত বাৎসরিক ঋণের পরিমাণ ৯ কোটি ৭৮ লক্ষ টাকা, যার শতকরা ৫৬ ভাগ ব্যাংক থেকে দেয়া হয়। বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শতকরা ১২ ভাগের চাইতে বেশি ঋণ দেয়া হয় না। মহাজন ও ফড়িয়া থেকে প্রাপ্ত ঋণের পরিমাণ বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সামান্য বেশি। ব্যাংক থেকে প্রদত্ত ঋণের শতকরা প্রায় ৯৩ ভাগ বছর শেষে পরিশোধিত হয়। সার্বিকভাবে ব্যাংক থেকে প্রদত্ত কৃষি ঋণের পরিশোধন হারের চেয়ে আনারস চাষে প্রদত্ত ঋণ পরিশোধনের হার উৎসাহজনকভাবে বেশি। তাই ব্যাংক ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস উৎপাদনে প্রদানীয় ঋণের পরিমাণ বাড়াতে হবে।

জরিপে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী, দেশের আনারসের সার্বিক বা একর প্রতি উৎপাদন বাড়াতে হলে পাঁচটি পদক্ষেপ নেয়া জরুরী :

* পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনার গাড়ো পাহাড় এলাকা, দিনাজপুর, শেরপুর জেলার উপজাতীয় এবং পাহাড়ী এবং ধান ও গম চাষে অপ্রযুক্ত জমিতে আনারসের চাষ প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রমের আওতায় বাড়ানো যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে যথার্থ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে দেয়া যেতে পারে।

* কৃষি গবেষণা প্রযুক্ত করে বিভিন্ন প্রজাতির আনারসের উচ্চ ফলনশীল চারা বা গাছ উদ্ভাবিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে ১৯৭০-এর দশকে হাওয়াইতে উদ্ভাবিত শংকর জাতীয় আনারসের এদেশে প্রয়োগ যোগ্যতা নিরিখ করা উত্তম হবে বলে মনে হয়। বলা প্রয়োজন হাওয়াই কিংবা ফিলিপাইনের আনারসের তুলনায় বাংলাদেশে রোপিত আনারসের ফলন গাছপ্রতি তাৎপর্যমূলক মাত্রায় বেশ কম।

* ফিলিপাইন ও হাওয়াই এ প্রযুক্ত আনারস চাষের প্রণালী পর্যবেক্ষণ করে তা ক্ষেত্র বিশেষে বাংলাদেশে গ্রহণ ও বিস্তৃতকরণ বাঞ্ছনীয় হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ সারথীর ভূমিকা নিতে পারে।

* আনারসের প্রক্রিয়াজাতকরণ, নির্যাস বা রস আহরন ও ব্যবহার করা ও এসবের যথাযথ সংরক্ষণমূলক শিল্প গড়ে তুলতে হবে।এবং

* বিশেষ ব্যবস্থাধীনে আনারস ও এর প্রক্রিয়াজাত উৎপাদিত পণ্য রফতানিকরণে প্রণোদনা ও বাজারিকরণে সহায়তা দিতে হবে। ইউরোপের ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশসমূহে আনারস ও আনারস জাত পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।

বাংলাদেশ সাম্প্রতিককালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর প্রয়োগশীলতায় শর্করা জাতীয় খাদ্য (যথা: ধান, গম, আলু ও ভুট্টা) উৎপাদনে তাৎপর্যমূলক সফলতা অর্জন করেছে। এসব ক্ষেত্রে অর্জিত সফলতাকে উন্নততর স্তরে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনারস ও অন্যান্য লাগসই ফসল উৎপাদনে এখন থেকে অধিক নজর দেয়া উচিত হবে।