২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নবজাতক ফাইজারের বিজয়িনী হয়ে ওঠার কাহিনী-

নবজাতক ফাইজারের বিজয়িনী হয়ে ওঠার কাহিনী-

শর্মী চক্রবর্তী ॥ এ এক ফাইজার বেঁচে ওঠার কাহিনী। জন্মের পরই যার জায়গা হয়েছিল সিমেন্টের বস্তার ভেতরে। তখনও শিশুটির নাড়ি কাটা হয়নি। সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখতে না দেখতে কুকুরের মুখের খাবার হয়ে গিয়েছিল সেদিন। কুকুরের দল সেই বস্তার ভেতর থেকে নবজাতকটিকে টেনে-হেঁচড়ে বের করে। সেদিন এই নবজাতকটিকে কয়েক নারী কুকুরের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। আজ সেই শিশু সুস্থ হয়ে উঠেছে। পেয়েছে নতুন ঠিকানা। পেয়েছে নতুন নাম। সবাই তাকে এখন ফাইজা নামে ডাকছে। ফাইজা নামের অর্থ ‘বিজয়িনী’। কুকুরের মুখ থেকে বেঁচে আসার কারণে সবাই তার এই নাম রেখেছে। ২৭ দিন পর এখন ফাইজা পুরোপুরি সুস্থ। তবে এখনও মুখের ক্ষত স্থানগুলো ভরাট হয়নি। এই ক্ষত স্থানগুলো দেখলেই বোঝা যায় সেদিন কি বীভৎস অবস্থা করেছিল এই শিশুটিকে। শিশুকে দেখার পর অনেকে ধারণা করেছিল তাকে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু সবার ধারণা উড়িয়ে জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে উঠল ফাইজা। রবিবার থেকে তার নতুন ঠিকানা হয়েছে সমাজসেবা অধিফতরের আজিমপুরের ‘ছোটমণি নিবাসে।’ এখন থেকে সেখানেই বেড়ে উঠবে ফাইজা সোনামণি।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর পূর্ব শেওড়াপাড়ার পুরনো বিমানবন্দর এলাকায় একটি মাঠে সিমেন্টের বস্তায় ভরে কোন এক নরপিশাচ ফেলে গিয়েছিল এই নবজাতককে। কুকুরের হাত থেকে কয়েক নারী এই নবজাতকটিকে উদ্ধার করে। প্রথমে নবজাতকটিকে রাজধানীর শিশু হাসপাতাল নেয়া হয় পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই শিশুটি চিকিৎসকদের গভীর পর্যবেক্ষণে ছিল। তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য চিকিৎসক-নার্স সবাই মিলে চেষ্টা চালান। এর ফলেই আজ শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠেছে।

রবিবার দুপুরে ঝোপ ঝাড় থেকে মুখম-ল ক্ষত অবস্থায় পাওয়া সেই শিশুটিকে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজসেবা অধিদফতরের আওতাধীন শিশুনিবাসে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুপুর ১টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে এ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-তত্ত্বাবধায়ক সেলিনা আক্তারের কাছে শিশুটিকে হস্তান্তর করেন। এ সময় এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান জানান, শিশুটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। সরকারী খরচে আগামী তিন মাস পর শিশুটির মুখের ক্ষত ঠিক করতে প্লাস্টিক সার্জারি করা হবে। তিনি জানান, শিশুটিকে দত্তক নিতে ইতোমধ্যে অনেকেই আগ্রহ দেখিয়েছেন। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা না থাকায় তাদের কাউকেই শিশুটিকে দেয়া হয়নি। হাসপাতালের পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, শিশুটিকে যদি কেউ নিতে চান তাহলে তাকে আদালতের মাধ্যমে নিতে হবে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যার তত্ত্বাবধায়নে শিশুটি সুস্থ হয়েছেন তিনি হলেন ঢামেক হাসপাতালে নবজাতক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ আবিদ হোসেন মোল্লা। তিনি জানান, শিশুটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তার নাক ও মুখের ক্ষত শুকিয়ে গেছে। এখন সে ফিডারে দুধ খেতে পারে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবজাতকের বিশেষায়িত সেবার কেন্দ্র স্ক্যাবু বা স্পেশাল কেয়ার বেবি ইউনিট থেকে সে গেল আজিমপুরে তার নতুন ঠিকানায়। এ ক’দিনে নবজাতক এই শিশুটি চিকিৎসক ও নার্সদের আপনজনে পরিণত হয়েছিল। শিশুটি একটু কান্না করলেই চিকিৎসক ও নার্সরা কোলে নিয়ে শিশুটিকে শান্ত করার চেষ্টা করত। শিশুটির প্রতি সবার একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসক ও নার্সদের এই মায়া ছেড়ে শিশুটিকে পাঠানো হলো ছোটমণি নিবাসে।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর পূর্ব শেওড়াপাড়ার পুরনো বিমানবন্দর এলাকায় একটি মাঠে কয়েকটি কুকুরের সামনে শিশুটিকে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, জন্মের পর পরই ওর মা, বাবা বা আপনজন মাঠে সিমেন্টের বস্তায় ভরে ফেলে গিয়েছিল। শিশুটিকে উদ্ধারকারী নারী জাহানারা বেগম বলেন, মানুষ এত পাষ- কিভাবে হতে পারে। এমন ফুটফুটে একটা শিশুকে এভাবে যে ফেলে গিয়েছে সে মানুষ না। তিনি বলেন, আমার ছেলে মেয়ে আছে। তার পরও আমি তাকে নিতে চাই। কিন্তু আইনী জটিলতার কারণে অনেকেই শিশুটিকে দত্তক নিতে চাইলেও পারেনি।