১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জিএম বনাম অর্গানিক-উভয়েই বিজ্ঞানীদের দ্বারস্থ

  • লক্ষ্য সার্টিফিকেট-অর্থও ঢালছেন প্রচুর

কাওসার রহমান ॥ বিজ্ঞানীরা বারংবারই আশ্বস্ত করছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও জিএম ফুডের পালে হাওয়াটা কিছুতেই যুতসই হচ্ছে না। মাঝে মধ্যেই উল্টো হাওয়া এসে সব ওলটপালট করে দিচ্ছে। এবারও জিএম ফুডের ওপর চড়াও হয়েছে সগোত্রীয় অর্গানিক ফুড। মার্কিন মুল্লুকে এই জিএম ফুড এবং অর্গানিক ফুডের বিতর্ক রীতিমতো ‘জনসংযোগ যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে। এ যুদ্ধে অনেকটাই বিভ্রান্ত মার্কিন ক্রেতারা।

বিজ্ঞানীরা বরংবারই ক্রেতাদের আশ্বস্ত করছেন, জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। ফলে জৈব প্রযুক্তির শিল্পগুলোর ব্যবসাও তরতরিয়ে বাড়ছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জৈব প্রযুক্তি কৃষি সংস্থা মনসানটোর বীজ বিক্রি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এ অবস্থার মাঝে জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম (জিএমও) মুক্ত খাদ্য এসে জিএম খাদ্যের পুরনো বিতর্ককে আবার উস্কে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা যতই জিএম খাদ্য নিয়ে আশ্বস্ত করছেন, স্টোরগুলোতে ক্রেতারা ততই জিএম ফ্রি লেবেলযুক্ত খাদ্য পণ্যের দেখা পাচ্ছেন। ফলে জৈব প্রযুক্তির বিপরীত স্রোতকে কাজে লাগিয়েও অর্গানিক খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো নতুন ব্যবসা ধরতে চাইছে।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২ রাজ্যের ৪১০ স্টোর এবং কানাডা ও যুক্তরাজ্য ঘোষণা দিয়েছে, ২০১৮ সালের মধ্যে জৈব প্রযুক্তির কোম্পানিগুলোতে তাদের উৎপাদিত খাদ্যে জিএমও লেবেল লাগাতে হবে। ইতোমধ্যে ৬৪ দেশ জিএমও খাদ্যপণ্যের গায়ে লেবেল লাগানোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল এবং আফ্রিকার বেশকিছু দেশ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো- আফ্রিকার বহু দেশ এখনও খাদ্য সঙ্কট ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। কিন্তু ওই দেশগুলোও জিএম খাদ্য প্রত্যাখ্যান করেছে। অবশ্য আফ্রিকান দেশগুলোর জিএম বিরোধী অবস্থানের নেপথ্যে তাদের বিজ্ঞান সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান-ই কাজ করছে বলে পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে। তবে সার্বিকভাবে জিএমবিরোধী যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে তা মূলত ভবিষ্যত প্রজম্মের ঝুঁকির বিষয়কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।

তবে বাস্তবতা হলো- মানুষ গত সহস্রাব্দ ধরেই জিএমও খাদ্য খেয়ে আসছে। যুগ যুগ ধরে খেয়ে এলেও এখন পর্যন্ত এর তেমন ক্ষতিকর কোন প্রভাব পাওয়া যায়নি। আজকে যে হাইব্রিড খাদ্যশস্য আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার পুরোটাই জিএমও। জিএমও টমেটো এখন সারা দুনিয়ায় বিস্তৃত। ফলে স্বাদ বেড়ে গেছে মূলত জিএমও’র বদৌলতেই। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণেই আজ সম্ভব হচ্ছে সকল মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেয়া।

জিএমও বিষয়টি হলো- জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড অর্গানিজ। কৃত্রিমভাবে কোন জেনেটিক ইনফর্মেশন, অর্গানিজমে ঢুকিয়ে দিয়েই জিএমও তৈরি করা হয় অর্থাৎ কোন একটি অর্গানিজমে, কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্যের নিউক্লিওটাইড সিকুয়েন্স অর্থাৎ এ্যালিয়েন ডিএনএ পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে ঢুকিয়ে, অর্গানিজমকে জেনেটিক্যালি মেনিপুলেট করে কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন করা হলে ওই অর্গানিজমকে জিএমও বলে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও জিএমও নিয়ে বেশ বিতর্ক শুরু হয়েছে। জিএমও বীজ থেকে উৎপাদিত সয়াবিন তেল আমরা স্বাধীনতার পর থেকেই খেয়ে আসছি। এছাড়া আমাদের দেশে যে সবজি বিপ্লব শুরু হয়েছে তা জিএমও বীজের বদৌলতেই। এতে অবশ্য খুব একটা বিতর্ক সৃষ্টি না হলেও সম্প্রতি দেশে জিএমও বিটি বেগুন চাষ নিয়ে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ ধান বীজ গোল্ডেন রাইস উদ্ভাবন করেছে, যা ভাতপ্রধান দেশগুলোর মানুষের অন্ধত্ব নিবারণে সহায়ক হবে। গবেষণা মাঠে সফলতার পর এখন এটি মাঠে ট্রায়ালের অপেক্ষায় আছে। এর আগে বাংলাদেশ জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান বীজ মাঠে ছেড়েছে। বিটি বেগুন নিয়ে বিতর্ক উঠলেও দেশে এখন জিঙ্ক রাইস ও গোল্ডেন রাইস নিয়ে কোন বিতর্ক উঠেনি।

আশির দশক থেকে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি, রোগ-পোকামাকড় প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন, ফসলের গুণাগুণ ও স্বাদের পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে জিএম টেকনোলজি ব্যবহার হয়ে আসছে। ইতোমধ্যে জিএমের ব্যবহার সুদূরপ্রসার হয়েছে। প্রচুর গবেষণা চলছে এর পক্ষে-বিপক্ষে। আমেরিকা, ব্রিটেন, চীন প্রভৃতি দেশে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে ব্যপকভাবে। সয়াবিন, টমেটো, আলু, ভুট্টা, তুলা ও ধান এর জিএম সারাবিশ্বে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হচ্ছে।

জৈন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর থেকেই জিএমও খাদ্যের সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত খাদ্যের রেশারেশি চলে আসছে। তবে জিএমও খাদ্য যতটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাজারে আসছে, প্রাকৃতিক খাদ্য কিন্তু তার মুখোমুখি হচ্ছে না। যদিও অনেক প্রাকৃতিক খাদ্যেই বিষাক্ত উপকরণ থাকছে। শুধু বিজ্ঞানীদের ওপর ভরসা করেই যুক্তরাষ্ট্র বসে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এ্যান্ড ড্রাগ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে জিএম খাদ্য। ফলে জিএম খাদ্যে কোন বিষাক্ত উপকরণ আছে কিনা, বা তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিনা, তা দেখার জন্য উৎপাদকদের অবশ্যই জিএম খাদ্য পরীক্ষা করতে হয়। আর এতে পুষ্টির মাত্রা থাকে খুবই কম, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।

কিন্তু নন-জিএমও খাদ্যের বেলায় এ ধরনের পরীক্ষার বালাই নেই। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত অনেক খাদ্য জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তা পরীক্ষার কোন বালাই নেই। ব্রোকলি, মাশরুম কিংবা গাজরের মতো জনপ্রিয় খাদ্যেও প্রাকৃতিকভাবে বিশেষ ধরনের জৈব বিষ থাকে, যা স্বাভাবিক পরিমাণে খেলে স্বাস্থ্যের কোন ক্ষতি হয় না। আবার বাদাম, শামুক, কিছু শাক, স্ট্রবেরি খেলে মানুষ এ্যালার্জিতে আক্রান্ত হয়।

যদি প্রশ্ন করা হয় যে, জিএমও কি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যা এখনও বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেননি। এর সহজ উত্তর হচ্ছে, এই জীবনে কোন কিছুই ঝুঁকিমুক্ত নয়। তবে বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে অস্বীকার করার যথেষ্ট কারণ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সেক্ষেত্রে উল্টো প্রশ্ন উঠেছে, অর্গানিক পণ্য নিয়েও। জিএমও মুক্ত পণ্য নামে যে সকল খাদ্যপণ্য বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, তা কি সম্পূর্ণ অর্গানিক? ক্রেতারা যে জিএমও মুক্ত পণ্য নামে অর্গানিক পণ্যের প্রতি ঝুঁকছেন তা আসলেই কি প্রাকৃতিক? নাকি এসব অর্গানিক খাদ্য জিএমও বীজ থেকেই উৎপাদিত। এটা নিশ্চিত করার জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন অর্গানিক খাদ্যপণ্যের জন্য ছাড়পত্র নেয়ার বিধান করেছে। এখন অর্থের বিনিময়ে ছাড়পত্র নিয়েই কেবল অর্গানিক খাদ্যপণ্যের গায়ে লেবেল লাগাতে হবে।

তবে এ বিধানের পরও স্বস্তি পাচ্ছে না জৈব প্রযুক্তির কোম্পানিগুলো। অর্গানিক কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত আক্রমণের মুখে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তাদের জিএম খাদ্যের ভবিষ্যত নিয়ে। ফলে জৈব প্রযুক্তির কোম্পানিগুলো তাদের লবিং ও জনসংযোগ জোরদার করেছে। খ্যাতনামা জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া করেছে তাদের পণ্যের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য। শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ বাড়িয়েছে।

জৈব প্রযুক্তির কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ বিষয়ে গবেষণার জন্য অর্থায়ন করে আসছে। কিন্তু জিএম খাদ্য নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক এ কোম্পানিগুলোকে নতুন যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে। এ যুদ্ধে এখন স্টেনিফেল্ডের মতো অর্গানিক কোম্পানিগুলো মনসানটোর মতো জৈন প্রযুক্তির কোম্পানিগুলোর মুখোমুখি। উভয় পক্ষই এখন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিজ্ঞানীদের দ্বারস্থ হচ্ছে। অনুদান দিয়ে তাদের যেমন লবিংয়ে কাজে লাগানো হচ্ছে, তেমিন ক্রেতাদেরও যার যার পণ্যের পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। উভয় পক্ষের ভাড়া করা জনসংযোগ ফার্মগুলোও বেশ সক্রিয়। পত্র-পত্রিকায় ডজন ডজন নিবন্ধ প্রকাশ করা হচ্ছে, যার বেশির ভাগই কনসালটেন্টদের তৈরি। ক্রেতাদের কাছে টানতে জিএমও এবং অর্গানিক খাদ্যের এ তৎপরতা যেন এক জনসংযোগ যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।