২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুর্গাপুর সীমান্তে আতঙ্ক ॥ খোলা আকাশের নিচে গ্রামবাসীর রাত্রিযাপন

  • বিএসএফের ফের হামলা

নিজস্ব সংবাদদাতা, লালমনিরহাট, ১১ অক্টোবর ॥ ঘুমন্ত শিশুকে কোলে নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে এক কাপড়ে ছুটে পালিয়েছে চওড়াবাড়ি গ্রামের নারী-পুরুষ। মুখে চিৎকার বিএসএফ ঘরবাড়িতে হামলা করেছে। পরপর পাঁচ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে মেরেছে। তাদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। যে যেদিকে পেরেছে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। কোন কোন পরিবার রাতের খাবারও খেতে পারেনি। রান্না করা ভাত রেখে পালিয়ে এসেছে। ঘরবাড়ি রয়েছে অরক্ষিত। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিশু, নারী বয়োবৃদ্ধরা। সীমান্তের মানুষ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়নি। কথাগুলো বললেন, ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা দুর্গাপুরের চওড়াবাড়ি গ্রামের আছিরন বেওয়া (৬৫), নাজমা বেগম (৩৪), কুলসুম (৩২), শিউলী বেগম (২৩), ওলেমা বেগম (৩৮), তার এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ে রুবিনা (১৬), মাহাবুব (৩০) মুরগির খামারি ও লৎফর রহমান (৫৫)।

শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় ভারতীয় কোচবিহার জেলার ২১ বিএসএফের সিঙ্গীমারী ক্যাম্পের শতাধিক বিএসএফ সদস্যর দ্বিতীয় দফায় জেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের চওড়াবাড়ি গ্রামে হামলা করে। এই ঘটনায় সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করে। বিএসএফ সীমান্তে রাতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে। ভারি অস্ত্র ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে অবস্থান নেয়। দুর্গাপুর বিজিবি ক্যাম্পের সামনে মাত্র এক শত গজ দূরে চলে আসে। এ সময় বিজিবি দুর্গাপুর বিওপি ক্যাম্পের সদস্যরা নিজেদের নিরাপত্তায় ক্যাম্পের চার পাশে অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয়। পরে রাত ১১টার একটু পরে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ক্যাম্পের অধিনায়কের নেতৃত্বে এক প্লাটুন বিজিবি সদস্য সীমান্তে মোতায়েন করা হয়। সারারাত ধরে নানা গুজব ছড়াতে থাকে। শতশত গ্রামবাসী ঘুমন্ত শিশুদের নিয়ে রাস্তায়, স্কুলের মাঠে, বারান্দায় আশ্রয় নেয়। অনেকে বিজিবির সঙ্গে লাঠি নিয়ে সারারাত ধরে পাহারা দেয়। পরে রাত দুইটায় হাল্কা বৃষ্টি হলে ভারতীয় বিএসএফ সদস্যরা তাদের মোতায়েন করা সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে ভোর রাতে বিজিবিও এক প্লাটুন বিজিবি সদস্যকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এখনও সীমান্তে নানা গুজব ছড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে বিজিবি বলছে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

গরু চোরাচালানীর অযুহাতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতীয় কোচবিহার বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশের প্রায় এক মাইল ভেতরে জেলার আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের চওড়াবাড়ি গ্রামে অনুপ্রবেশ করে। এই সময় বিএসএফ এলোপাতাড়ি গুলি করে। এই ঘটনায় নারীসহ পাঁচজন গুরুতর আহত হয়। এদের মধ্যে আব্দুর রহিম (৩৪) নামে একজন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

এই ঘটনায় শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়। সেখানে বিজিবি ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। ভারতীয় বিএসএফ সদস্যরা এই ঘটনায় পৃথক পৃথক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান। সেই সঙ্গে বিজিবিকে তদন্ত রিপোর্টের ফলাফল জানাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেয়।

কিন্তু এই পতাকা বৈঠকের একদিন পরে শনিবার পুনরায় সীমান্তের একই গ্রামে ভারতীয় বিএসএফ পাঁচ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। সেই সঙ্গে সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে ভারি অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে অবস্থান নেয়। এমনকি তারা দুর্গাপুর সীমান্তের বিজিবি বিওপি ক্যাম্পে হামলা চালাতে অবস্থান নেয়।

সারারাত ধরে নানা গুজবের ডালপালা ছড়ায়। সীমান্ত গ্রামের কয়েক শ’ মানুষ শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নেয়। রাতে হাল্কা বৃষ্টি হওয়ায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। তবে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি ও বিএসএফ পাঁচ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লেও কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

সীমান্ত গ্রামটির বৃদ্ধারা বলেন, ভারত সীমান্ত ঘেঁষা গ্রাম হওয়ায় তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিল সুরক্ষিত। তখন ভারতীয় এই বিএসএফ সদস্যরা নানাভাবে সহায়তা করেছে। তারা কখনও ভাবেনি এমন করুণ দশায় তাদের পড়তে হবে। শনিবার রাতে আকস্মিক তাদের সেই করুণ দশায় পড়তে হয়েছে।

এদিকে লালমনিরহাট জেলার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট আশরাফ হোসেন বাদল জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্তও ছিটমহল নিয়ে বিরোধ স্থল সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে মিটে গেছে। আগামী ১৫ অক্টোবর লালমনিরহাট সীমান্তের পাশে মাত্র ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে কুড়িগ্রাম জেলার দাসিয়ার ছড়া সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আগমন উপলক্ষে লালমনিরহাটের ভেতরে থাকা সদ্য বিলুপ্ত ভারতীয় ৫৯টি ছিটমহলে আনন্দের বন্যা বইছে। ছিটমহলবাসীরা প্রধানমন্ত্রীকে বরণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। তার মধ্যে হঠাৎ করে সীমান্তে উত্তেজনা পরিস্থিত লজ্জায় ফেলেছে।

রবিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ১৫ বিজিবির দরবার হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা করেন ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল আহমেদ বজলুর রহমান হায়াতী। সেখানে উপঅধিনায়ক মেজর মাসুদ উপস্থিত ছিলেন। এই মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের জানানো হয়, সীমান্ত পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে। সীমান্তে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। রাতের ঘটনাটিকে ভুল বোঝাবুঝি বলে জানান। গ্রামবাসীকে রাতেই সীমান্তের নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। রাতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে গ্রামবাসীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনার কথা জানান। এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিএসএফর উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে পত্র দেয়া হয়েছে বলে জানান।