২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাতাসে পতপত্ শব্দ-ফসলের ক্ষেত ছেড়ে পালাচ্ছে ইঁদুর

বাতাসে পতপত্ শব্দ-ফসলের ক্ষেত ছেড়ে পালাচ্ছে ইঁদুর
  • কীটনাশকের বদলে পলিথিনের ঝাণ্ডা

তাহমিন হক ববি ॥ কৃষক পোকা দমনে বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করলেও ইঁদুর তাড়াতে কীটনাশক কোন কাজে আসছে না। প্রতিবছর আমন মৌসুমে ধানক্ষেতে ইঁদুরের উপদ্রবে কৃষককুল দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর আমনের ক্ষেতে ইঁদুর এসে গাছের গোঁড়া কেটে দিচ্ছে। পরদিন সেই আমনের গাছ গবাদিপশুকে খাওয়ানো ছাড়া আর উপায় থাকে না। ইঁদুর আকারে ছোট হলেও বছরে সবধরণের প্রায় ১০-১২শ’ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য নষ্ট করে থাকে, যার বাজারমূল্য ৭শ’ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ইঁদুর নষ্ট করে- গম শতকরা ৪ থেকে ১২ ভাগ, ধান শতকরা ৫ থেকে ৭ ভাগ, গোল আলু ৫-৭ ভাগ। এরা বছরে শুধু ধান ও গমের প্রায় ৫শ’ মেট্রিক টন পর্যন্ত ক্ষতি করে থাকে।

প্রতিবছরের মতো এবারও কৃষি বিভাগের উদ্যোগে জাতীয় ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু হয়েছে। ‘ইঁদুর ধরুন, ইঁদুর মারুন, ইঁদুরমুক্ত খামার গড়ুন’- এবার এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ৭ অক্টোবর থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়ে আগামী ৬ নবেম্বর পর্যন্ত চলবে। মাঠের ফসল উৎপাদন ও গুদামজাত শস্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ইঁদুর প্রধান সমস্যা।

কৃষিপ্রধান রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় এবার আমন মৌসুমে ধানক্ষেত রক্ষায় কৃষককুলের মাঝে এক নতুন পদ্ধতি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে কৃষককুল সাফল্য পেতে শুরু করেছে। এ সাফল্যে তারা ক্ষেতের আমন ধান রক্ষা করতে পেরে বড়ই উপকৃত হচ্ছেন।

কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে আমনের ধান ক্ষেতগুলো ধানের থোরে ভরে উঠেছে। দিন শেষে সন্ধ্যা নামলেই ইঁদুরের উপদ্রবও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ফলে ইঁদুরের দল ধান গাছের গোড়া কেটে গাছ ফেলে ধানের থোর নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, যা প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে শুরু করে দিনের আলো না ফোটা পর্যন্ত ধানক্ষেতে ইঁদুরের অত্যাচার চলতে থাকে। ইঁদুর তাড়াতে কাজ করে না কোন কীটনাশক। তাই এবার ইঁদুর তাড়ানোর নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে কৃষি বিভাগ। তারা আমনের ক্ষেতে পলিথিন ঝা-া ওড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমন ক্ষেতে পলিথিনের ঝা-া উড়িয়েছেন কৃষকরা। বাতাসের কারণে পলিথিন পতপত শব্দ করে উড়ে আর ইঁদুর মনে করে কেউ আসছে, তাই ভয়ে পালিয়ে যায়। এতে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা।

রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক অফিস সূত্রমতে, এবার রংপুর কৃষি অঞ্চলের ৫ জেলায় ৫ লাখ ৬১ হাজার ২৩৯ হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা হয়। এর মধ্যে নীলফামারী জেলায় ১ লাখ ১ হাজার ২২৩ হেক্টর, রংপুরে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৭৬ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৭৯ হাজার ৯৯ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৯৪৫ হেক্টর ও কুড়িগ্রামে ৮৮ হাজার ৩৯৬ হেক্টর জমিতে। এতে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ৫৬৯ মেট্রিক টন।

আমন ধানক্ষেতে ইঁদুর তাড়ানোর এই পদ্ধতিসহ ধানক্ষেতের ক্ষতিকারক পোকামাকড় তাড়ানোর জন্য বিগত সময়ে পরিবেশবান্ধব পার্চিং পদ্ধতি সাফল্য বয়ে নিয়ে এসেছে। জীবন্ত ধঞ্চে গাছ, ডালপালা ও বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ফলে জমিগুলো থাকছে নিরাপদ। ধানক্ষেতের প্রধান শক্র ক্যারেন্ট, মাজরা, গান্ধি ও চুঙ্গিসহ বাদামি ঘাস ফড়িং পোকা। এই পোকা নিধনে কীটনাশক ছাড়াই পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছে। পোকামাকড়ের মারাত্মক আক্রমণের হাত থেকে ধানের ক্ষেতগুলো নিরাপদ থাকছে, যা এখনও কৃষককুল এ পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে। কৃষি বিভাগ সূত্রমতে, ধঞ্চে গাছ আমনের চারা রোপণের সময় ধানক্ষেতে রোপণ করতে হয়। দ্রুত এই গাছ বেড়ে ওঠে। ছড়িয়ে পড়ে গাছের ডালপালা। সেখানে এসে বসে বিভিন্ন পাখি। সেই পাখি আমন ক্ষেতের পোকা ধ্বংস করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া ধঞ্চে গাছের সবুজ পাতা ঝরে ক্ষেতে পড়ে তা জৈব সার হিসেবে আমন ক্ষেতের সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। কীটনাশক ছাড়াই পোকা দমনের এ পদ্ধতির পর ইঁদুর তাড়ানোর পলিথিনের ঝা-া ব্যবহার কৃষকদের আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে।

আমন ক্ষেতে ইঁদুর তাড়ানোর পলিথিনের ঝা-া ব্যবহার সম্পর্কে নীলফামারী সদর উপজেলার ইটাখোলা ইউনিয়নের ময়দানেরপাড় গ্রামের কৃষক ইউনুছ আলী জানান, ইঁদুরের উপদ্রব থেকে বাঁচাতে আমন ক্ষেতে পলিথিনের নিশান উড়িয়ে উপকার পাচ্ছেন। ইঁদুর ধানগাছ কাটার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ অনুভব করে। সন্ধ্যা শুরু হলেই ইঁদুরের ধানগাছ কাটা শুরু হয়। তিনি বলেন, নদী-নালা ও ফসলি জমিতে মূলত ইঁদুরের উপদ্রব সবচেয়ে বেশি।

সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হোমায়রা ম-ল বলেন, এ বছর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে প্রায় সাড়ে সাত হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আবাদ হয়েছে আরও বেশি জমিতে। ক্ষেতের পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব থেকে ফসল রক্ষার জন্য মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। উপজেলায় কী পরিমাণ জমিতে ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে, তার জন্য কাজ করছেন কৃষি বিভাগের লোকজন বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে ব্রি ধানের অনেক জাত উদ্ভাবনের পর এখন ধানের আর কোন মৌসুম নেই। কৃষক সুবিধামতো সময়ে ধানের আবাদ করতে পারে এমন জাতের ধানই উদ্ভাবন হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। চলতি আমন আবাদের আগে পারিজা ও জিরাশাইল জাতের ধান কৃষকের ঘরে উঠেছে। একটা সময় আমন ধান ঘরে উঠার আগে আশ্বিন-কার্তিক মাসে তীব্র অভাব দেখা দিত। বিশেষ করে উত্তরের নীলফামারীসহ রংপুর এলাকায় এ অভাবের নাম ছিল মঙ্গা। নবান্নের আমন ঘরে ওঠার আগেই দুই-তিন জাতের ধান তাদের ঘরে উঠে। এ ধান কৃষকদের অভাব ঘুচিয়ে দিয়েছে।

কৃষি বিভাগ জানায়, ইঁদুর নিধন কার্যক্রমকে জোরদার করার মাধ্যমে ফসলের একটা বড় অংশ রক্ষা সম্ভব। ইঁদুর মাঠের দানাজাতীয় শাকসবজি, মাটির নিচের আলু, মুলা, গাঁজর, ওলকপি জাতীয় সবজি নষ্ট করে। ইঁদুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সেচনালায় গর্ত করে। এতে বাঁধ ও সেচনালা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি কেটে অগ্নিকা-ের সূত্রপাত ঘটায়। এ কারণে ইঁদুর দমন অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করছেন সংশিষ্টরা।

তথ্যমতে, ইঁদুরের বংশ বৃদ্ধির হার অত্যন্ত বেশি। সুষ্ঠু পরিবেশে একজোড়া ইঁদুর থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার ইঁদুর জন্মলাভ করতে পারে। জন্মদানের দুই দিনের মধ্যেই এরা পুনরায় গর্ভধারণে সক্ষম হয়। জন্মদানের তিন মাসের মধ্যে বাচ্চা দিতে সক্ষম হয়। ইঁদুরের জীবনকাল ২ থেকে ৩ বছর। ইঁদুর ধান, গম, ভুট্টা, বাদাম, ফলমূল বিশেষ করে শাকসবজি, নারিকেল, পেয়ারা, সফেদা, লিচু, আম, লাউ, মিষ্টি আলু ইত্যাদি কৃষিজ ফসল খেয়ে ক্ষতি করে। ধান ও গমের শীষ আসার সময় ৪৫ ডিগ্রী কোণ করে কেটে গর্তের ভেতর নিয়ে বাসা তৈরি করে এবং খায়। ইঁদুর যতটা না খায় তার চেয়ে ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি নষ্ট করে।

যেহেতু ইঁদুর নোংরা স্থান পছন্দ করে, তাই বাড়িঘর, ক্ষেত-খামার, পুকুরপাড়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, নদীরপাড় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। খাদ্যগুদাম ও খড়ের গাদা মাটির সঙ্গে তৈরি না করে উঁচু মাচা তৈরি করে তার উপর করতে হবে। ইঁদুর যাতে গর্ত করতে না পারে সেজন্য ক্ষেতের আইল ছেঁটে চিকন করতে হবে। নারিকেল ও সুপারি গাছে মাটির ৫ থেকে ৬ ফুট উঁচুতে ও আড়াই ফুট চরড়া মসৃণ টিনের পাত লাগিয়ে ইঁদুর প্রতিরোধ করা যায়। মানুষের মাথার চুল নেটের মাধ্যমে নারিকেল গাছে ব্যান্ডেজ করে রাখলে ইঁদুর ও কাঠবিড়ালি কম ক্ষতি করে।

প্যাঁচা, গুঁইশাপ, বেজি, শিয়াল, বিড়াল জাতীয় প্রাণীর প্রধান খাদ্য হচ্ছে ইঁদুর। এ প্রাণীগুলোকে সংরক্ষণ করলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ ইঁদুর সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ইঁদুর নিধন অভিযান কর্মসূূচী চলবে শীতের মৌসুমের দুই মাস সময় পর্যন্ত। যদিও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনে সব প্রাণীরই বেঁচে থাকার দরকার রয়েছে। তবুও ইঁদুরের ক্ষতিকর দিকগুলো বেশি হওয়ার কারণে নিধন না করেও উপায় নেই।