২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আনন্দ-উচ্ছ্বাসে নাট্য কেন্দ্রের রজতজয়ন্তী উদ্যাপন

আনন্দ-উচ্ছ্বাসে নাট্য কেন্দ্রের রজতজয়ন্তী উদ্যাপন
  • সংস্কৃতি সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ শরতের পড়ন্ত বিকেল। শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলের লবিতে নাট্যকর্মীদের সরব কলরব। চলছে জমজমাট আড্ডা ও পারস্পরিক ভাব বিনিময়। কেউ বা আবার ব্যস্ত সেলফি তোলায়। কিছুক্ষণের মাঝে ঘনিয়ে এলো সন্ধ্যা। বদলে গেল দৃশ্যপট। বিক্ষিপ্তভাবে আড্ডাবাজিতে ব্যস্ত নাট্যকর্মীরা জড়ো হলেন খোলা আঙিনার এক কোনায়। সেখানে গাঁদা ও গোলাপের পাপড়িতে দৃশ্যমান নাট্যদল নাট্যকেন্দ্রের সুদৃশ্য লোগোটি। আর লোগোর পাশে একইভাবে ফুলের পাপড়িতে লেখা ২৫ এবং পাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ছোট ছোট প্রদীপ। দলের কর্মীদের সঙ্গে অতিথিরা এলেন সেখানে। নাট্যকেন্দ্রের প্রধান সম্পাদক তারিক আনাম খান ও প্রধান নির্বাহী ঝুনা চৌধুরীর সঙ্গে অতিথি হিসেবে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করলেন নাট্যজন আতাউর রহমান, খ্যাতিমান নাট্য নির্দেশক ও চলচ্চিত্র পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফ, অভিনেত্রী সারা যাকের ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। এ সময় দলের সকল কর্মীর কণ্ঠে গীতি হচ্ছিল ‘নাট্যকেন্দ্রের ২৫ বছর আজ আনন্দ ধরে না’। আর এই প্রদীপ জ্বলে ওঠার মধ্য দিয়েই নাট্যকেন্দ্রের রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানের সূচনা হয় রবিবার।

বহিরাঙ্গনে প্রাথমিক সূচনার পর দলের ২৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানটি চলে যায় স্টুডিও থিয়েটার হলে। সেখানেই অনুষ্ঠিত হয় মূল আয়োজন। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতার সূচনা হয়। এরপর উপস্থাপন করা হয় দলের ২৫ বছরের পথচলার ইতিহাস। মঞ্চে ডেকে নেয়া হয় ১৯৯০ থেকে শুরু এ বছর পর্যন্ত দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়া দশটি ব্যাচের ১২০ নাট্যকর্মীকে। তাদের পরিচয় পর্ব শেষে পরিবেশিত হয় সমবেত সঙ্গীত। প্রথমেই গাওয়া হয়- আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর...। এ গানের পর গাওয়া হয় দলের তিনটি প্রযোজনা হয়বদন, আরজ চরিতামৃত ও ডালিম কুমার নাটকের বেশকিছু গান। সব শেষে মঞ্চস্থ হয় নাট্যকেন্দ্রের নতুন দুই নাটক বন্দুকযুদ্ধ ও গাধারহাট। আর এভাবেই অনাড়ম্বর আয়োজনটি হয়ে ওঠে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ।

১৯৯০ সালের ১১ অক্টোবর জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গ্যেটে ইনস্টিটিউটে এক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে নাট্যকেন্দ্র। সেই ইতিহাস তুলে ধরেন দলেন প্রতিষ্ঠাতা তিন সদস্য তারিক আনাম খান, ঝুনা চৌধুরী ও তৌকীর আহমেদ।

শুরুর ইতিহাসটা তুলে ধরে তারিক আনাম খান বলেন, ২৫ বছর আগে যে মঞ্চ প্রদীপ জ্বালিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজ আবার প্রজ্জ্বলিত হলো। নিজেদের ইচ্ছে, ভাললাগা ও মতবিশ্বাসের মেলবন্ধনে থিয়েটার করার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল আমাদের। শুরুটা করেছিলাম আমি, ঝুনা চৌধুরী, তৌকীর আহমেদ ও নাহিদ ফেরদৌস মেঘনা। ১৯৯০ সালের সেই সময়টা ছিল উত্তাল। আমাদের জীবনটাও ছিল সংগ্রামের। কিন্তু আমাদের বুকে ছিল প্রত্যয়। স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। তবে আমরা একা ছিলাম না। আমাদের সঙ্গী হয়েছে হাজার বছরের শিল্পের ঐতিহ্য। নিজস্ব নাট্যভাবনা নিয়ে সমাজ, রাজনীতি ও ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে গড়ে তুলি তারুণ্যনির্ভর একটি নাট্যদল। বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে দলের কর্মীদের গড়ে তুলি দক্ষ নাট্যকর্মী হিসেবে। স্বতন্ত্র ও বৈচিত্র্যময় বিষয়কে উপজীব্য করে এ পর্যন্ত মঞ্চে এনেছি ১৪টি প্রযোজনা। এসব নাটকে দেশের শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে আন্তর্জাতিকতা।

উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতার আগে কথা হয় ঝুনা চৌধুরী সঙ্গে। এই খ্যাতিমান অভিনেতা ও সংগঠক বলেন, আমার পরিচিতি দিয়ে নাট্যকেন্দ্র। শুধু তাই নয়, এই দলের মাধ্যমেই একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছি। এখানকার নাট্যচর্চা সাহায্য করেছে একজন ভাল ও সুন্দর মানুষ হতে। আমার মতো অসংখ্য নাট্যকর্মী তৈরি করেছে এই দলটি। দেশের নাট্যাঙ্গনে শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করে বহির্বিশ্বেও মঞ্চস্থ হওয়ার পাশাপাশি সমাদৃত হয়েছে নাট্যকেন্দ্রের নাটক।

তৌকীর আহমেদ বলেন, থিয়েটার ছেড়ে দিয়ে নতুন স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯০ সালে গড়ে তুলি নাট্যকেন্দ্র। এখন মনে হচ্ছে যেন চোখের পলকে চলে গেছে দীর্ঘ সময়। দলের পাশাপাশি আজকে নিজের যে ব্যক্তিগত অবস্থানটা তৈরি হয়েছে সেখানে বিশাল ভূমিকা রেখেছে নাট্যকেন্দ্র অর্জিত শিক্ষা। আমার জীবনের বেড়ে ওঠায় স্কুল হিসেবে কাজ করেছে এই দলটি।

নাট্যকেন্দ্র প্রসঙ্গে জনপ্রিয় ও বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পী মোশাররফ করিম বলেন, একজন অভিনেতা হিসেবে আমি তৈরি হয়েছি এই দলের মাধ্যমে। অভিনয়ের ব্যাকরণটুকুও জেনেছি এখান থেকে। সেইসঙ্গে নিজের ভেতরের সৃজনশীল বোধটিও জাগিয়ে তুলেছে নাট্যকেন্দ্র। সব মিলিয়ে আমার আজকের অবস্থানে পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে এই দলটি।

আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা জাহিদ হাসান বলেন, এখানে এসে মনে হচ্ছে যেন কোন মিলনমেলায় এসেছি। মনে পড়ছে পুরনো স্মৃতি সেই নব্বইয়ের দশকের কথা। একটা ভিন্ন ধরনের অনুভব হচ্ছে মনের ভেতরে। আর এমন অনুভবের মূল কারণ হচ্ছে, এই দলটির মাধ্যমেই তৈরি হয়েছে আমার আজকের অবস্থানটি।

আলোচনা ও সঙ্গীতানুষ্ঠান শেষে মঞ্চস্থ হয় নাট্যকেন্দ্রের সাম্প্রতিক দুই প্রযোজনা বন্দুকযুদ্ধ ও গাধারহাট। আলফ্রেড ফারাগের দ্য ট্র্যাপ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বন্দযুদ্ধ। আর তৌফিক আল হাকিমের ডঙ্কি মার্কেট অবলম্বনে নির্মিত নাটক গাধারহাট। দু’টি প্রযোজনাই রূপান্তরের পাশাপাশি নির্দেশনা দিয়েছেন তারিক আনাম খান। বন্দুকযুদ্ধ নাটকে অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান, শরীফ হোসেন, মুজিবুল হাসান, সঙ্গীতা চৌধুরী, আলাউদ্দিন হোসেন প্রমুখ। গাধারহাট প্রযোজনাটির বিভিন্ন চরিত্রে রূপ দিয়েছেন নোমান আহমেদ, খান আতিক, সাইফ আহমেদ, ইয়ামিন হোসেন, কুমার প্রাঙ্গণ প্রমুখ।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন ॥ বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান গবেষক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তার ১৪৪তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে রবিবার বিকেলে বাংলা একাডেমি একক বক্তৃতানুষ্ঠানের আয়োজন করে। একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ : ঐতিহ্যপ্রেমী অগ্রপথিক শীর্ষক একক বক্তৃতা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম মুস্তাফা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

একক বক্তৃতায় গোলাম মুস্তাফা বলেন, প্রাচীন পুঁথি সংগৃহীত না হলে আমাদের সাহিত্যের ইতিহাস রচনা সম্ভবই হতো না। সাহিত্যবিশারদের আর্থিক সঙ্গতি ছিল না, কিন্তু স্বদেশের ভাষা-সাহিত্য এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। পুঁথি সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি অসম্মানজক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন বহুবার। তার সংগ্রহ পরিকল্পনা ছিল সম্প্রদায় নিরপেক্ষ। মুসলমান ও হিন্দু-উভয় সম্প্রদায়ের পুঁথিই তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। তার এই সংগ্রহ-উদ্যোগের ফলে বাঙালীর সাহিত্য ইতিহাস পূর্ণতা পেল। বাঙালী জানলো, মধ্যযুগের সাহিত্য সাধনা মুসলমান ও হিন্দু লেখকদের মিলিত প্রয়াসে সমৃদ্ধ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সাহিত্যবিশারদ সাহিত্যে মনুষ্যত্বের প্রতিফলন চেয়েছিলেন। বহুবিভাজিত বঙ্গীয় সমাজের মধ্যে চেয়েছিলেন সমন্বয়ধর্মিতা। সকল বৈচিত্র্য নিয়েই এই বাঙালী এক জাতিতে পরিণত হবে- এই স্বপ্ন ছিল তার।