২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আজ শুভ মহালয়া

আজ শুভ মহালয়া

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রতিমা তৈরি শেষ। মাটির শেষ প্রলেপটুকুও শুকিয়ে এসেছে অনেকটা। আজকালের মধ্যেই বাহারি রঙ চড়বে প্রতিমার গায়। নিপুণ শিল্পী তার তুলির আলতো ছোঁয়ায় জাগিয়ে তুলবেন মা দুর্গাকে। জেগে উঠবেন সরস্বতী। গণেশের গায় উঠবে নক্সিদার কুচির দুধ-সাদা ধুতি। মা লক্ষ্মীর হাসি ঝরে পড়বে। আর বোধনের মধ্য দিয়ে খুলে যাবে মা দুর্গার সিগ্ধ শান্ত চোখ। জেগে উঠবেন দশভুজা। আশীর্বাদ দেবেন মনোবাঞ্ছা নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পূজারীকে।

আজ শুভ মহালয়া। চ-ীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আবাহনই মহালয়া হিসেবে পরিচিত। আর এই চন্ডীতেই আছে কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে দেবী দুর্গার। বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপুজোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ মহালয়া। আজ ভোরে চ-ীপাঠের মধ্য দিয়ে আবাহন ঘটবে দেবী দুর্গার। দেবীকে আমন্ত্রণ জানানো হবে মর্ত্যলোকে। আগামী সোমবার ষষ্ঠীপুজোর মাধ্যমে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও মূলত আজ থেকেই পূজার্থীরা দুর্গাপুজোর আগমনধ্বনি শুনতে পাবেন।

শাস্ত্রীয় বিধান মতে, মহালয়ার অর্থ হচ্ছে, মহান আলোয় দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে আবাহন। দুটি পক্ষ রয়েছে- একটি হলো পিতৃপক্ষ, অন্যটি দেবীপক্ষ। অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের শেষ হয় আর প্রতিপদ তিথিতে শুরু হয় দেবীপক্ষের। আজ মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হচ্ছে সেই দেবীপক্ষ।

ধর্মমতে, এই দিনে দেব-দেবীকুল দুর্গাপুজোর জন্য নিজেদের জাগ্রত করেন। মহালয়ার দিন ভোরে মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খের ধ্বনি ও শ্রীশ্রী চ-ীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আবাহন জানানো হয়। এদিন গঙ্গাতীরে প্রার্থনা করে ভক্তরা মৃত আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপুরুষদের আত্মার মঙ্গল কামনা করেন। তাই মহালয়া দুর্গোৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেবীর আরাধনা সূচিত হয় মহালয়ার মাধ্যমে। মহালয়া থেকেই দেবীপক্ষের শুরু।

পুরাণ মতে, রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। বসন্তে তিনি এই পুজোর আয়োজন করায় দেবীর এ পুজোকে বাসন্তী পুজোও বলা হয়। কিন্তু রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে যাওয়ার আগে শ্রী রামচন্দ্র দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন। তাই শরতকালের এই পুজোকে হিন্দুমতে অকালবোধনও বলা হয়। সনাতম পঞ্জিকা মতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসবেন, যার ফল হচ্ছে ফসল ও শস্যহানি। আর বিদায় নেবেন (গমন) দোলায় (পালকি) চড়ে, যার ফল হচ্ছে মড়ক।

শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে নানা আয়োজনে ব্যস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে সব ধর্ম ও শ্রেণীর বাঙালীদের মধ্যেও। পুজোর আনন্দে মাতোয়ারা বাঙালী জাতি। মন্দিরে মন্দিরে চলছে প্রতিমা সাজসজ্জার কাজ। দেবী মূর্তি নির্মাণ শেষ, গায় এখন রঙ ছোঁয়ানোর অপেক্ষায় দক্ষ ভাস্কর, নিপুণ শিল্পী। ধুলোবালি লেগে নষ্ট হয়, তাই কাপড়ের পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে প্রতিমাগুলোকে।

আয়োজকরা ছুটছেন দর্জিপাড়ায়। মা দুর্গার লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ির জরির কাজ, গণেশের ধুতিতে নক্সাদার পাড় বসানো, আর মহিষাসুরের জমকালো পোশাক তৈরির কাজে কেউবা ছুটছেন কামারপাড়ায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে বানিয়ে নিচ্ছেন দেবীর হাতের চক্র, গদা, তীর-ধনুক ও খড়গ-ত্রিশুল। আর ঘষা-মাজায় মিস্ত্রিরা ব্যস্ত ম-পগুলোকে নতুন করে তুলতে। ডেকোরেটরদের ঘুম নেই। আয়োজকদের ফরমায়েস ও ডিজাইন অনুযায়ী গড়ে তুলছেন দৃষ্টিনন্দন অস্থায়ী পুজোম-প। চলছে সংস্কারের শেষ কাজটুকুনও।

আজ দুর্গাদেবীর আবাহন বা মহালয়া। আজ থেকে ৭ দিন পর ১৯ অক্টোবর ষষ্ঠীতে দশভুজা দেবীদুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পুজোর আনুষ্ঠানিকতা। ২০ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ২১ অক্টোবর মহাষ্টমী ও কুমারী পুজো অনুষ্ঠিত হবে। সনাতম পঞ্জিকা মতে, এবার ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার একই দিনে মহানবমী এবং বিজয়া দশমী পড়ায় ওই দিন দর্পণ বিসর্জন হবে। তবে সারাদেশে ২৩ অক্টোবরই বিজয়া শোভাযাত্রা সহকারে প্রতিমা বিসর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

আজ সোমবার মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে ভোরে মহালয়ার ঘট স্থাপন, বিশেষ পুজো এবং মহালয়ার বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদ বনানী পুজোম-পেও মহালয়া উপলক্ষে নেয়া হয়েছে নানা অনুষ্ঠানমালা।

এদিকে এবার দুর্গাপুজো উপলক্ষে সারাদেশেই ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় নেয়া হয়েছে দেশব্যাপী কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। হাজার হাজার র‌্যাব-পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নসহ সারাদেশেই পুজোম-পগুলোর আশপাশে থাকবে বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটিও দুর্গোৎসবকে ব্যাপক উৎসবমুখর করে তুলতে প্রতিদিনই প্রস্তুতিমূলক সভা করছে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, এবার সারাদেশে প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার পুজোম-পে শারদীয় দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হবে। সরকারী হিসাবে অবশ্য ২৮ হাজার ৩৪৫টি ম-পে পুজো হচ্ছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির হিসাব অনুযায়ী এবার ঢাকা মহানগরীতে পুজোম-পের সংখ্যা ২২৫টি, যা গতবারের তুলনায় ৫টি বেশি। সারাদেশের বিভিন্ন মন্দির, ক্লাব, সংগঠন, স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে এসব পুজো। সুষ্ঠুভাবে দুর্গাপুজো সম্পন্ন করতে সরকারী তরফেও নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।