২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শান্তিতে নোবেল

ধরিত্রী ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে; চারদিকে হিংসা আর হানাহানি! মানবজীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে স্বস্তি। গুম হচ্ছে শান্তি। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির দ্বন্দ্বে, গোষ্ঠীর সঙ্গে অপর গোত্রের রেষারেষিতে, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের লড়াইয়ে অশান্তির মেঘ ও কুয়াশার বিস্তার ঘটছে। যদিও চূড়ান্ত অন্ধকার গ্রাস করার আগে কেউ না কেউ শান্তির বারতা নিয়ে জনতার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। এমন শুভ উদ্যোগ সফল হচ্ছে বলেই সবকিছু হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ছে না। খাদের কিনারে পৌঁছেও রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে মানবতা। শান্তি প্রস্তাবনায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী সেনারা প্রশংসিত হচ্ছেন, স্বীকৃতি পাচ্ছেন। এই প্রশংসা ও স্বীকৃতি বৃহত্তর মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে জীবনের ইতিবাচকতায়; অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে শান্তির মসৃণ পথ অবলম্বন ও পরিক্রমায়।

বিশ্বের বহু দেশেই বিপন্ন অবস্থার ভেতর রয়েছে শান্তি নামক চিরবাঞ্ছিত সোনার হরিণ। লাঞ্ছিত হচ্ছে মানবতা। মুখথুবড়ে পড়ে আছে গণতন্ত্র। শাসকের হাতে নির্মমভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছে জনতার বড় অংশ। আবার অন্ধকারে আলোকধারার মতো প্রকাশিত হয়ে চলেছে শুভবোধ, কল্যাণচিন্তা। কোথাও সে ভূমিকা নিচ্ছে এক বা একাধিক সংগঠন, কোথাওবা রাজনৈতিক দল, কোথাওবা সুশীল সমাজ। ফলে স্বৈরশাসন থেকে উত্তরণ ঘটছে সুশাসনে, বিবাদ থেকে সম্প্রীতিতে, ঘৃণা থেকে ভালবাসায়। সাম্প্রতিক বিশ্বইতিহাসে তিউনিসিয়া সৃষ্টি করেছে উজ্জ্বল উদাহরণ। ২০১৩ সালে সামাজিক অস্থিরতা আর রাজনৈতিক হত্যার ঘটনায় তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়া প- হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল। দেশটি তখন গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। এমন ক্রান্তিলগ্নে সুশীল সমাজের পক্ষে চারটি সংগঠন বিকল্প একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করতে পেরেছিল। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিউনিসিয়ায় একটি সাংবিধানিক সরকারও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, যে সরকার ধর্ম, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সবার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। এককথায় বলা চলে, তিউনিসিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় সেক্যুলার গণতন্ত্র। ‘জেসমিন বিপ্লবের’ পর গৃহযুদ্ধের দুয়ারে থাকা তিউনিসিয়াকে শান্তিপূর্ণ জাতীয় সংলাপের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেয়ার স্বীকৃতি হিসেবে এবার শান্তির নোবেল পুরস্কার পেল আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী জোটবদ্ধ ওই চার সংগঠন। তিউনিসিয়ার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী এই চার সংগঠন হলো- তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়ন (ইউজিআইটি); দ্য তিউনিসিয়ান কনফেডারেশন অব ইন্ডাস্ট্রি, ট্রেড এ্যান্ড হ্যান্ডিক্র্যাফটস (ইউটিআইসিএ), তিউনিসিয়ান হিউম্যান রাইটস লিগ (এলটিডিএইচ) এবং তিউনিসিয়ান অর্ডার অব ল’ইয়ারস। নোবেল কমিটির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত এবং পুরস্কার লাভকারী চার সংগঠনকে অভিনন্দন জানানো অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নে ২০৫ ব্যক্তি ও ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল। জাতিসংঘের মুখপাত্র তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যথার্থ মন্তব্য করেন- ‘শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টায় সুশীল সমাজের সহযোগিতা আমাদের দরকার।’

তিউনিসিয়ায় সেক্যুলার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ওই শুভ উদ্যোগ বিশ্বের উগ্রপন্থী সমাজে পরিবর্তনের প্রেরণা হলে এবারকার নোবেল শান্তি পুরস্কার যে আরও মহিমান্বিত হয়ে উঠবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা আশা করব, তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র সুসংহত করায় এ পুরস্কার প্রাপ্তি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। সেই সঙ্গে কোন সমাজে বা রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ উপায়ে যে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব, তার দৃষ্টান্ত সৃষ্টির জন্য তিউনিসিয়ার পুরস্কারপ্রাপ্ত চার সংগঠন বিশ্বব্যাপী প্রেরণা যোগাবে।