২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চোরাচালান ও মাদক কারবারই এখানে পেশা

  • হায়রে সীমান্তের মানুষ-১

জাহাঙ্গীর আলম শাহীন, লালমনিরহাট থেকে ॥ বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা সীমান্ত গ্রামগুলোতে নেই। চোরাচালান, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা- সীমান্তের মানুষ পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। আইন শৃঙখলাবাহিনীর একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী সীমান্তে মাদকসহ নানা অপরাধ দমনের চাইতে মাসোহারা নিতে বেশি ব্যস্ত। অপারেশনের নামে চলে চোর- পুলিশের খেলা। বৃহত্তর রংপুর হতে মঙ্গা স্থায়ীভাবে উধাও হয়েছে। কিন্তু সীমান্ত অঞ্চলের গ্রামগুলোতে দারিদ্র্য জেঁকে বসেছে।

জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুয়ায়ী সীমান্ত বরাবর দুই দেশের দেড়শ’ ফুট করে বাদ নিয়ে নিজ নিজ দেশের সীমান্তের সীমানা ধরা হয়। দুই দেশের সীমান্তের ফাঁকা তিন শ’ ফুট ভূখ-কে বলা হয় নোম্যান্সল্যান্ড। নোম্যান্সল্যা-ের ভূখ- যখনতখন জাতিসংঘ ব্যবহার করতে পারে। তবে নোম্যান্সল্যান্ডের কৃষিজমি দখলি শর্তে দুই দেশের সীমান্তবাসী বছরের পর বছর বংশ পরম্পরায় ভোগ করে আসছে। কখন কোন জটিলতা দেখা দিলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীবাহিনী তাৎক্ষণিক সৌজন্য বৈঠক করে সমস্যার সমাধান করে। এই প্রথা যুগ যুগ ধরে চালু আছে। সীমান্তগ্রামগুলো শহর, নগর, বন্দর হতে অনেক দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে হয়ে থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থাও খুবই নাজুক। এই কারণে সীমান্ত গ্রামে কৃষির তেমন উন্নয়ন ঘটেনি। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণেও রয়েছে সমস্যা। কৃষক তাই সাধারণ অর্থে ন্যায্যমূল্য হতে বঞ্চিত হয়ে আসছে। সীমান্তের কৃষক আধুনিক চাযাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে তেমন অবগত নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় সরকারী সেবাও দ্রুত পৌঁছে দেয়া যায় না। কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারী চাকরিজীবীদের সীমান্তের প্রত্যন্ত গ্রামে যাওয়াতেও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এমন উদাহরণও আছে যে, জেলা প্রশাসককে সীমান্ত গ্রাম পরিদর্শন করতে গিয়ে বিএসএফের হাতে আটক হতে হয়েছে। দুই বছর আগে কুড়িগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসককে বন্যার্তদের সহায়তা করতে গিয়ে এমন ন্যক্কারজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। এই নিয়ে মিডিয়ায় তোলপাড় চলে। কয়েক ঘণ্টা পর দুই দেশের সীমান্তরক্ষীবাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক করে জেলা প্রশাসককে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

সীমান্ত গ্রামের মানুষ প্রায় সকলেই কোন না কোনভাবে চোরাচালন, মাদক পাচার, মানবপাচার, স্বর্ণপাচার, পশু পাচার ও হুন্ডিসহ নানা অপরাধে জড়িত। কেউ সরাসরি জড়িত। কেউবা মদদদাতা হিসেবে জড়িত। পৃথিবী ব্যাপক হারে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের সমৃদ্ধি নিয়ে এসেছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে লালমনিরহাট সীমান্তের মানুষ অনেক অনেক পিছিয়ে। তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ করতে। সীমান্ত গ্রাম কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কেউ শষ্য ফলায়। কেউ শষ্য ফলাতে দিনমজুরি করে। দিনমজুরশ্রেণীর জনসংখ্যাই এখানে অনেক বেশি। তাই প্রত্যহ কৃষক পরিবারে দিনমজুরের কাজ থাকে না। নিয়মিত দিনমজুরি না থাকায় দারিদ্র্য গ্রাস করেছে সীমান্ত গ্রামগুলোকে। সীমান্তে যেসব ধনাঢ্য পরিবার দেখা যায় তাদের অধিকাংশই কোন না কোন সময় অবৈধ চোরাচালানি করে অর্থ উপার্জন করেছে। মানুষ ঠকিয়েছে। তাদের কাছে সীমান্তে দরিদ্র মানুষের তেমন মানবিক মূল্য নেই। বরং নিজেদের ক্ষমতা, প্রভাব ও অবৈধ ব্যবসার বিস্তার ঘটাতে এরা সীমান্তের দরিদ্র মানুষকে ব্যবহার করে।

জেলার সীমান্ত গ্রামগুলো কুলাঘাট, মোগলহাট,দুর্গাপুর, চলবলা, লোহাখুচি, বানিয়াটারী, জাওরানী, দৈই খাওয়া, পানবাড়ি, সিন্দুর্না, জগৎবেড়, রসুলগঞ্জ, ঠ্যাং ঝাড়া, আমঝোলসহ প্রায় দেড় শতাধিক গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা চোরাচালানি। দুই দেশের যখন যেখানে প্রচলিত পণ্য হোক অথবা অপ্রচলিত পণ্য হোক দাম পেলে সেটা চোরাচালানিদের তালিকায় স্থান পায়। এতে দেশের ও দেশের মানুষের ক্ষতির কথা তারা চিন্তা করে না। তারা এটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। বৃহত্তর রংপুরের মানুষ পরিশ্রম, মেধা, বিকল্প কৃষি ফলন দিয়ে আশ্বিন-কার্তিকের মৌসুমী অভাব (মঙ্গা ) স্থায়ীভাবে দূর করেছে। সরকারও নানাভাবে মঙ্গা দূর করতে সহায়তা করেছে। কিন্তু সীমান্তের মানুষের কল্যাণে ও মঙ্গা দূর করতে চোখে পড়ার মতো তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

এদিকে পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা, বিজিবিসহ নানা বাহিনী সীমান্তে মাদক পাচার ও চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত । কিন্তু এসব বাহিনীর ভেতরে একশ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ও চোরাকারবারীদের সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে রয়েছে তাদের দারুণ সখ্য। সীমান্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এই সখ্যের কথা প্রচার হয়ে ফিরছে। কোন কোন সময় তথাকথিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্সরা চোরাকারবারি ও মাদক পাচারকারীকে বাঁচাতে নিরীহ গ্রামবাসীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি ও অর্থ আদায় করছে। আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর প্রতি সীমান্তের মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। মোগলহাট, দুর্গাপুর, কর্ণপুর, বানিয়াটারীসহ কয়েকটি সীমান্তগ্রামে মাদক ব্যবসার শতাধিক স্পট রয়েছে। প্রতিদিন শতশত মাদকসেবী এসব স্পর্টে যায়। সকলে জানে শুধু জানে না আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মোজাহেদুল ইসলাম জানান, মাদক বিরোধী অভিযান পুলিশের রুটিন ডিউটি। গত বছরের চেয়ে এ বছর পুলিশ অনেক বেশি মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে।

মাদক ব্যবসা নিরুৎসাহিত করতে কি কি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে জানান, দু’একজন মাদক ব্যবসায়ীকে সংশোধনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে শহরের আদর্শ পাড়ার এরশাদুল নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করেন।